প্রযুক্তি কোম্পানি ঘিরে হুমকি, প্রেসিডেন্টদের মুখে যুদ্ধ বন্ধের সুর, বাজার চাঙ্গা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ৫ প্রযুক্তি কোম্পানির লোগো ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কোলাজ
তথ্যসূত্র: এএফপি
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৪৯ | আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:৫৭
অ্যাপল, গুগল ও মেটার মতো মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি লক্ষ্য করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হামলার হুমকি দেয় মঙ্গলবার। যা দেশটির স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৮টা থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে কথা বলেছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে।
আইআরজিসি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছিল, আর কোনো ইরানি নেতাকে হত্যার লক্ষ্যবস্তু বানালে তারা অ্যাপল, গুগল ও মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। বিবৃতিতে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, এগুলো ইরানি কর্মকর্তাদের অবস্থান শনাক্তের সঙ্গে জড়িত।
বিবৃতিতে তেহরানের স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৮টা থেকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ইউনিটে হামলা চালানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। কর্মীদেরকে জীবন বাঁচাতে অবিলম্বে কর্মস্থল ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছে আইআরজিসি।
১৮টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও আছে- ইন্টেল, মাইক্রোসফট, ওরাকল, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা, অ্যানালিটিক্স ফার্ম প্যালান্টিয়ার এবং চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এনভিডিয়া। আইআরজিসি এসব প্রতিষ্ঠানের কোন কার্যালয়ে হামলা করবে তা বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চলের সব দেশে এসব সন্ত্রাসী কোম্পানির আশপাশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের নিজ অবস্থান থেকে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বাইরে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
চলতি মাসের শুরুর দিকে আমাজন জানিয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের দুটি ডেটা সেন্টার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। বাহরাইনে তাদের একটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংঘাত নিরসনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর দাবি এবং একইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার হুমকির মুখে প্রযুক্তি কোম্পানি ঘিরে হামলার সতর্কবার্তা এলো।
দুই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, মার্কিন বাহিনী খুব শিগগিরই ইরানে তাদের অভিযান শেষ করবে। তিনি দুই থেকে তিন সপ্তাহের একটি সময়সীমার কথাও উল্লেখ করেছেন।
হোয়াইট হাউসের একটি অনুষ্ঠানে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাকে যা করতে হবে তা হলো ইরান ত্যাগ করা, আমরা খুব শিগগিরই তা করতে যাচ্ছি। তখন জ্বালানির দাম হু হু করে কমে যাবে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা কাজ শেষ করছি। আমি মনে করি সম্ভবত দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো তার চেয়ে আরও দু-একদিন বেশি সময় লাগতে পারে, তারপরই মার্কিন বাহিনী ইরান ত্যাগ করবে।’
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের কাছাকাছি সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও মঙ্গলবার জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তাঁর দেশের ‘প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা’ আছে। তবে এর বিনিময়ে তিনি সংঘাতের পুনরাবৃত্তি না ঘটার নিশ্চয়তা চান।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতি অনুযায়ী, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে পেজেশকিয়ান তেহরানের এই দাবির কথা পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, যদি অপরিহার্য শর্তগুলো পূরণ করা হয় তবে সংঘাত শেষ করার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা আছে। বিশেষ করে আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফার একটি পরিকল্পনার জবাবে ইরান ৫ দফার একটি পাল্টা প্রস্তাব পেশ করেছে। সেখানেও আগ্রাসন বন্ধ করা এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে; যা ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা না করা নিশ্চিত করবে।
শেয়ারবাজারে বড় উত্থান
বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওই বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। প্রযুক্তি খাতনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট ইনডেক্স ৩ দশমিক ৬ শতাংশ লাফিয়ে ২১ হাজার ৫৩৩ দশমিক ১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বি. রাইলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাজার বিশ্লেষক আর্ট হোগান বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম সুনির্দিষ্ট বার্তা যেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে। গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে বাজার পতনের পর সবাই একটি ভালো খবরের অপেক্ষায় ছিল।
এএফপি লিখেছে, বিনিয়োগকারীরা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত মন্তব্যগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। নেতানিয়াহু বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে মাসব্যাপী সামরিক অভিযান এখনও শেষ হয়নি এবং তিনি ইরানের ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা’ গুঁড়িয়ে দেবেন।
পেজেশকিয়ানের মন্তব্যের প্রভাব তেলের বাজারেও পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ফিউচার ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৩ দশমিক ৯৭ ডলারে নেমেছে। তবে বাজার কিছুটা চাঙ্গা হলেও তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। মেরিটাইম অ্যানালিস্ট গ্রুপ কেপলারের প্রেসিডেন্ট জিন মেনিয়ার এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এই যুদ্ধের ফলে এশিয়া সবচাইতে বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।’
