ট্রাম্প আশাবাদী, ইরান সন্দিহান, তবু সমঝোতার অপেক্ষায় বিশ্ব
ইরানের প্রয়াত ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার ছবির সামনে দিয়ে হেঁটে যান এক ব্যক্তি। বুধবার তেহরানে। ছবি: এএফপি
এএফপি, রয়টার্স ও আলজাজিরা
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৯:০৩ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১৯:২৪
যুদ্ধের অবসান ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে ইরানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হচ্ছে, বৃহস্পতিবারই তেহরান এর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ইতিবাচক সাড়া পেলে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর করার কথা।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর বৃহস্পতিবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। অপরিশোধিত তেলের দামও কমেছে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, মার্কিন প্রস্তাবটি এখনো ‘পর্যালোচনার’ পর্যায়ে আছে। নিজেদের মতামত চূড়ান্ত করার পর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানকে তেহরান নিজেদের অবস্থানের কথা জানাবে।
তবে আলজাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সীমা না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে আজই (বৃহস্পতিবার) পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের জবাব পাঠাবে তেহরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। গত মাসে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ঘিরে নৌ অবরোধ শুরু করে। ফলে সামরিক সংঘাত না চললেও গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ আছে। যা এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে, বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের উৎপাদনমুখী শিল্পের সংকটকে প্রকট করার শঙ্কা তৈরি করেছে।
তবে বিবাদমান দেশগুলো সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতায় পৌঁছানোর দ্বারপ্রান্তে থাকার কথা বলায় জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে সবকিছু এখনো নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে তেহরান কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটির ওপর।
চুক্তির কতদিন পর প্রণালি খুলবে?
ওয়াশিংটনের সবশেষ প্রস্তাবে নতুন কী কী শর্ত আছে তা বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, দুইপক্ষ ১৪ দফার একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘খুব কাছাকাছি’ আছে। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান অন্তত ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে সম্মত হবে।

এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং বিভিন্ন দেশে জব্দকৃত কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেবে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশ যে পাল্টাপাল্টি অবরোধ দিয়ে রেখেছে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করার ৩০ দিনের মধ্যে তা খুলে দেওয়া হবে।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান গত কয়েক দশক ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আওতায় কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে করা সেই ঐতিহাসিক চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। ফলে নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে।
নতুন সমঝোতা স্মারকটি গত সপ্তাহে ইরানের প্রস্তাবিত ১৪ দফা পরিকল্পনা থেকে ঠিক কতটা আলাদা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, মধ্যস্থতা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনার। যদি উভয়পক্ষ প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়, তবে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৩০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
ট্রাম্প আশাবাদী, ইরান সন্দিহান
যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এটি সম্ভব। খুব দ্রুতই সব শেষ হয়ে যাবে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবিগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এদিকে, লেবাননে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার দেশটি জানিয়েছে, বুধবার বৈরুতে এক বিমান হামলায় তারা হিজবুল্লাহর এক কমান্ডারকে হত্যা করেছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা। এই প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান যথাসময়ে এই প্রস্তাবের জবাব দেবে।
পার্লামেন্টের সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি ওয়াশিংটনের প্রস্তাবকে ‘আকাশকুসুম কল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অপরদিকে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দুই পক্ষের সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছানোর খবরে উপহাস করেছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি এটিকে ‘অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ফেইলড’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন, হরমুজ খুলে দিতে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটন এখন আলোচনার নামে কেবল ধোঁয়াশা তৈরি করছে।
তেলের দামের পতন
কিছু বিপরীতমুখী কিছু বক্তব্য থাকলেও সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় বৃহস্পতিবার অপরিশোধিত তেলের দাম আরো কমেছে। এদিন দাম কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। যা নিয়ে গত দুইদিনে প্রায় ১০ শতাংশ দরপতন হলো। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, টোকিওর নিক্কেই ইনডেক্সসহ এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতেও বৃহস্পতিবার চাঙা ভাব দেখা গেছে।

জ্বালানির দাম এখনো যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট- উভয় ধরনের তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা মূলত হরমুজ প্রণালি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এবং সারের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই নৌপথটি নিয়ে কোনো ইতিবাচক সমঝোতা বাজারের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
