সংঘাত ও সংকটের তেহরান, এক শহরে দুই বাস্তবতা
সরাসরি যুদ্ধ আর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আতঙ্ক
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ২৩:২০
তেহরানের একটি ব্যস্ত সড়ক। সন্ধ্যার আবছা আলোয় রাস্তার ধারে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন এক হকার। ফুটপাতে বিছিয়ে রাখা কাপড়ের ওপর গুছিয়ে রাখছেন টুকটাক ঘরের জিনিস। পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে চলা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো আর হর্নের শব্দের মাঝে নিচু স্বরে বিড়বিড় করছিলেন তিনি। যেন কারও সঙ্গে কথা নয়, নিজের ভাগ্যকেই দুষছেন। আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘দেখুন, এই হলো এখন আমাদের জীবন।’
পথচারীরা তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন। কেউ একটু থমকে দাঁড়াচ্ছেন, কেউবা ভ্রুক্ষেপহীন। অথচ ঠিক কয়েক মিটার দূরে রাস্তার অন্য পাশে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। সেখানে লাউডস্পিকারে বাজছে গান, স্লোগানে মুখর একদল মানুষ। উত্তোলিত পতাকার নিচে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে তারা। দেশাত্মবোধক গানের সুরে মেতে ওঠা সেই ভিড়ের উপস্থিতি যেন জানান দিচ্ছে এক অন্য তেহরানকে।
একই সময়ে, একই রাজপথে এই দুই দৃশ্য এখন তেহরানের প্রতিদিনের বাস্তবতা। যুদ্ধ শুরুর পর দ্রুত পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এই চিত্র শহরটির দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রূপ ফুটিয়ে তুলেছে যা মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংঘাত ও অস্থিরতার ক্ষত
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে ইরান, যেখানে পরবর্তী সময়ে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রও। দশকের পর দশক ধরে চলা উত্তেজনার মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে সরাসরি এবং বড় আকারের সংঘাত। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই জানুয়ারিতে দেশজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ, যা দমনে কঠোর অবস্থান নেয় সরকার। প্রায় এক মাস বন্ধ রাখা হয় ইন্টারনেট। এই সংকটের রেশ কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ।
দীর্ঘকাল ধরে ইরানিদের প্রধান উদ্বেগ ছিল ধীরগতির অর্থনৈতিক মন্দা আর সামাজিক বিধিনিষেধ। কিন্তু এখন তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সরাসরি যুদ্ধ আর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আতঙ্ক। এই পরিস্থিতি কেবল মানুষের দৈনন্দিন জীবনই বদলে দেয়নি, বরং আগামীর অনিশ্চয়তা সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারার সীমাও পাল্টে দিয়েছে।
তেহরানের এক ভাষা শিক্ষক নাফিসেহ বলেন, ‘যুদ্ধ আর ধ্বংসলীলা দেখার আগে আমরা ভাবতাম আমাদের লড়াইটা শুধু দ্রব্যমূল্য আর অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে। জীবন আগে থেকেই কঠিন ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি যে এতদূর গড়াবে বা আরও খারাপ হবে, তা কখনও ভাবিনি।’
গত মাসে যুদ্ধবিরতি বা সামরিক উত্তেজনায় সাময়িক বিরতি এলেও তার অর্থনৈতিক ক্ষত এখনও দগদগে। শিল্পকারখানা ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলার প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বেকারত্ব। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কারণে, আবার কেউ কেউ ধুঁকছে দীর্ঘ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে।
অন্যদিকে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত সভা-সমাবেশগুলোয় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন মেজাজ। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এই কষ্ট সাময়িক এবং জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এটি একটি পরীক্ষা। অংশগ্রহণকারীর মতে, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের চাপের কাছে মাথা নত করব না। এটা শুধু রাজনীতি নয়, এটা আমাদের দেশ আর বিশ্বাস রক্ষার লড়াই।’
তবুও এগিয়ে চলা
সংকট আর উত্তেজনার মধ্যেও তেহরানের জীবন থেমে নেই। উত্তর তেহরানের শপিং মলগুলোয় মানুষের আনাগোনা আছে, রেস্তোরাঁগুলোও খোলা। তবে কেনাকাটার প্রবণতা আগের মতো নেই। মার্কেটের এক দোকানদারের মতে, ‘মানুষ এখন দোকানে আসে, পণ্য দেখে, কিন্তু আগের মতো কেনে না।’
এত হতাশার মাঝেও হামিদ নামের এক উদ্যোক্তার মতো অনেকেই আশাবাদী হতে চান। তিনি বলেন, ‘উদ্বেগ কোনো সমাধান নয়। আমাদের কাজ করে যেতে হবে।’
এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টাই এখন তেহরানের মানুষের রুটিন। একই রাস্তা কোথাও কষ্টের প্রতিচ্ছবি, কোথাও আবার প্রতিরোধের প্রতীক। তেহরান এখন এমন এক শহর, যেখানে একই জায়গায় প্রতিদিন দুটি ভিন্ন বাস্তবতা পাশাপাশি হেঁটে চলে।
- বিষয় :
- ইরান
- সংঘাত
- ইরান যুদ্ধ
- অর্থনীতি
