ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নাকবা থেকে গাজার ধ্বংসস্তূপ: আবদেল মাহদির জীবনব্যাপী বাস্তুচ্যুতি

নাকবা থেকে গাজার ধ্বংসস্তূপ: আবদেল মাহদির জীবনব্যাপী বাস্তুচ্যুতি
×

আবদেল মাহদি আল-ওয়াহিদি। ছবি: আল-জাজিরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ১৬:০৮ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ২১:২৬

৮৫ বছর বয়সী আবদেল মাহদি আল-ওয়াহিদি উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত নিজের বাড়ির ভেতরে বসে কফি তৈরি করছেন। কাজ করতে করতে চারপাশের ধ্বংসস্তূপের মাঝে নিজের জীবনের অবশিষ্ট যা কিছু আছে, যেন তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

তার পাশেই বসে আছেন তার স্ত্রী আজিজা, যার বয়সও আশির কোঠায়। প্রায় ছয় দশক আগে বিয়ে করেছিলেন নিঃসন্তান এই দম্পতি।

প্রয়াত ভাইয়ের পাঁচ ছেলের সঙ্গে বাস করেন আবদেল মাহদি। তাদের বাবার মৃত্যুর সময় তারা শিশু ছিলেন। আবদেল মাহদিই তাদের বড় করেছেন। বিয়ে দিয়ে নিজেদের পরিবার শুরু করতে সাহায্য করেছেন।

১৯৪৮ সালে ‘নাকবা’ বা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় নিজেদের বাড়ি থেকে সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া আবদেল মাহদি তখন নিছকই এক শিশু ছিলেন। তবুও, সেই ব্যথা ও মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার পরও তার কাছে বর্তমানে ইসরায়েল যা করছে, তাকে বেশি ‘ভয়াবহ’ বলে মনে হয়। আবদেল মাহদি জানান, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনিরা আজ যা সহ্য করছে, তা তার দেখা যেকোনো কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে।

ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা বীর আল-সাবা [বেয়ারশেবা] থেকে এসেছি... সেটাই ছিল আমাদের মাতৃভূমি।’ বীর আল-সাবা হলো নাকাভ মরুভূমির বৃহত্তম শহর। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলি বাহিনী এটি দখল করে নেয়। এর ফলে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বাস্তুচ্যুত হন।

আদি নাকবা

আবদেল মাহদির প্রখর স্মৃতিশক্তি তাকে সবকিছু পাল্টে যাওয়ার আগের একটি স্বাভাবিক শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি তখন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে নিজেদের জমিতে, নিজেদের গবাদিপশু ও বাড়িতে বাস করতেন।

আবদেল মাহদি বলেন, বীর আল-সাবার পরিবারগুলোর মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনাগুলোর কথা তার এখনও মনে আছে, যখন প্রথম খবর ছড়িয়ে পড়ে যে জায়নবাদী হাগানাহ মিলিশিয়ারা (সশস্ত্র গোষ্ঠী) এগিয়ে আসছে; তখন কেউ কেউ পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, আবার অন্যরা থেকে যাওয়ার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসার আশায় পশ্চিম দিকে গাজায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

আর তাই আবদেল মাহদি, তার বাবা-মা, তিন ভাইবোন এবং বাকি পরিবারের সদস্যরা যৎসামান্য গবাদিপশু, অর্থ ও জিনিসপত্র নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই চলে এসেছিলাম... আমরা দিনের পর দিন হেঁটেছিলাম। আমরা বিশ্রাম নিতাম, তারপর আবার হাঁটা শুরু করতাম। আমরা আমাদের কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমরা কখনই কল্পনা করিনি, এটি একটি স্থায়ী নির্বাসনে পরিণত হবে।’

পরিবারটি শুরুতে গাজা শহরের জেইতুন পাড়ায় বসতি স্থাপন করে, পরে তারা উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে চলে যায়। সেখানেই শরণার্থী জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা।

তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁবুতে থাকতাম। বৃষ্টি এবং বাতাসে সেগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত, তীব্র শীত ছিল অসহনীয়, তারপর আসত প্রচণ্ড গরম।’ ‘সেখানে ছিল ক্ষুধা, ক্লান্তি, খাবার ও পানির জন্য দীর্ঘ সারি, শেয়ার করা টয়লেট, উকুন, খারাপ স্যানিটেশন (পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা)... সব বেদনাদায়ক স্মৃতি।’

ফিরে আসার অধিকার

আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমার মনে আছে, আমার বাবা এবং দাদা সবসময় বলতেন, আমরা ফিরে যাব। তারা তাদের ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-নাতনিদের ফিরে আসার অধিকার আঁকড়ে ধরে রাখতে বলতেন।’

কিন্তু সেই ফেরা আর কখনোই আসেনি। এর বদলে, কয়েক দশকের নির্বাসন, যুদ্ধ এবং বারবার জীবন পুনর্গঠনের চেষ্টা চলতে থাকে।

আবদেল মাহদি বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের ভেতরে নির্মাণকাজে কাজ করেছেন।

ভাইদের সঙ্গে মিলে তিনি বাড়ি তৈরি এবং জমি কিনতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ সবকিছু আবার মুছে দিয়েছে।

‘আমরা কাজ করেছি, বাড়ি বানিয়েছি এবং জমি কিনেছি,’ তিনি বলেন। ‘আমরা ভেবেছিলাম, বাস্তুচ্যুতির কারণে আমাদের পরিবার এবং জীবন ধ্বংস হওয়ার পর অবশেষে আমরা কিছুটা ক্ষতিপূরণ করতে পেরেছি।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘কিন্তু এই যুদ্ধ সবকিছু পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এটি আমাদের সবাইকে আবার শূন্যে ফিরিয়ে এনেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই—না কোনো পাথর, না কোনো গাছ।’

আবদেল মাহদি স্বীকার করেন, বেশ কয়েকটি ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং বছরের পর বছর ধরে চলা অবরোধের কারণে গাজার জীবন কখনোই সত্যিকারে স্থিতিশীল ছিল না। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের সময় ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা নজিরবিহীন।

চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের শুরুতে একটা নাকবা... আর এর শেষ প্রান্তে এসে আরেকটা নাকবা। আমরা আর কী-ই বা বলতে পারি?’ সূত্র: আল-জাজিরা। 

আরও পড়ুন

×