আমিও রাষ্ট্রদূত হতে চাই: সামাজিক মাধ্যমে কেন এমন বার্তা দিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ছবি: সংগৃহীত
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই তিনি এমন কৌশল অবলম্বন করছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিতর্কিত অধ্যাদেশ, উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীন মানুষের দুর্দশা এবং জাতীয় বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অবহেলা নিয়ে সরকার যখন সমালোচনার মুখে, তখন প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড জনআলোচনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছে।
গত শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শাহ লেখেন, ‘আমিও রাষ্ট্রদূত হতে চাই। কারও কাছে প্রধানমন্ত্রীর নম্বর থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন কি?’ রহস্যময় এ পোস্টটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের নানা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের জন্ম দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অসীম শাহ মন্তব্য করেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলে দেব।’ শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখারেল লেখেন, ‘আমি কি তাকে মেসেজ করব?’ সংসদ সদস্য টিকা সাংগ্রৌলা বলেন, ‘আমার কাছে আছে; কিন্তু আপনাকে দেব না।’ অন্যদিকে তরুণ নেত্রী রঞ্জু দর্শনা মন্তব্য করেন, ‘একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত হওয়া যায় না। আগে যেকোনো একটি বেছে নিন।’
যদিও সমর্থকেরা বিষয়টিকে সাধারণ অনলাইন সম্পৃক্ততা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, সমালোচকদের মতে, এ ধরনের আচরণ রাষ্ট্রীয় পদ ও দায়িত্বের মর্যাদাকে খাটো করে। তাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি করে জনমনোযোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জেন-জি নেত্রী তনুজা পান্ডে কান্তিপুরকে বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত বিনোদনের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, কূটনৈতিক নিয়োগের মতো সংবেদনশীল সাংবিধানিক বিষয়কে হালকাভাবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী যাদব দেবকোটা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ আচরণ নির্বাহী পদের মর্যাদাকে উপহাস করেছে। একইভাবে সারিতা তিওয়ারি প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে।
এ বিতর্কের কয়েক দিন আগেই আরেকটি ঘটনা আলোচনায় আসে। গত ৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশে সচিব কৃষ্ণ হরি পুষ্করকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত স্বার্থে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
সাবেক জ্যেষ্ঠ আমলাদের মতে, একটি ইলেকট্রনিক বার্তার জেরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা বিপজ্জনক নজির। এতে প্রশাসনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী মজিদ আনসারি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইনের শাসন অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে, কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা বা মেজাজের ভিত্তিতে নয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শাহ প্রশাসনের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। নীতিগত ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক বিতর্কের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকীয় উপস্থিতির মাধ্যমে জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের চেষ্টা আগেও দেখা গেছে।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে তারা গত ২৭ এপ্রিলের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সে সময় সাংবিধানিক পরিষদ ও সমবায় জালিয়াতি-সংক্রান্ত বিতর্কিত অধ্যাদেশ পাসের উদ্দেশ্যে সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকলে ৯ মে প্রধানমন্ত্রী নিজের একটি স্টাইলাইজড ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। ছবিটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি অসংখ্য সংস্করণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সংসদীয় সংকটের আলোচনা অনেকটাই আড়ালে চলে যায় বলে সমালোচকদের দাবি।