সিএনএনের বিশ্লেষণ
হরমুজের বিকল্প তৈরি করছে ইরানের প্রতিবেশীরা
হরমুজ প্রণালি। ছবি:রয়টার্স
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০২:১৯
যুদ্ধের পরিণতি অনেক সময় তার শুরুর লক্ষ্য থেকে ভিন্ন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। শুরুতে এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল কখনও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, কখনও আবার ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর যুদ্ধটি ভিন্ন এক রূপ নিয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখন দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের নির্ধারিত শর্তে চলাচল না করলে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে।
বর্তমান বাস্তবতায় মূল প্রশ্ন একটাই– হরমুজ প্রণালি কি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই থাকবে, নাকি কে কখন এবং কী শর্তে এই পথ ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানের হাতে চলে যাবে? যদি এমনটি ঘটে, তাহলে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ইরানের হাতে চলে যেতে পারে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের প্রায় সব জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ ছিল এটি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানিরও গুরুত্বপূর্ণ রুট ছিল হরমুজ। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এমন একটি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে, যেখানে হরমুজ নিয়মিত বন্ধ থাকতে পারে অথবা বাণিজ্যিকভাবে অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাই একক একটি প্রণালির ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিকল্প রপ্তানি পথ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরব তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত দেশের ভেতর দিয়ে একটি পূর্ব-পশ্চিম (ইস্ট-ওয়েস্ট) পাইপলাইন নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক সংকটের সময় এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছে। সৌদি আরব ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ পাইপলাইনটির সক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
হরমুজের দক্ষিণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দর ও পাইপলাইন রয়েছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮ লাখ ব্যারেল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। দেশটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এই সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার জন্য সম্প্রসারণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউস সফর করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। সিরিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাইপলাইন পুনরায় চালু করা এবং নতুন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে ইরাক ও কুয়েতের তেল ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হবে।
ইরাকের পরিকল্পনার মধ্যে কিরকুক থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহান পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইনটির সংস্কারও রয়েছে। জর্ডানে নতুন একটি তেল পাইপলাইন নির্মাণ পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে ইরাক সরকার। এই পাইপলাইন বসরা থেকে পশ্চিম ইরাকের হাদিথা পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে একটি শাখা লাইন জর্ডানের আকাবা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর পর লোহিত সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা হবে।
বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিদ্যমান এবং নির্মাণাধীন বিকল্প রুটগুলো ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ দিয়ে সাধারণত যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হবে।
- বিষয় :
- যুদ্ধ
- ইরান
- হরমুজ প্রণালি