ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরেজমিন

নেপালিরা এখন বন্যায় বিধ্বস্ত, মরদেহে বিপর্যস্ত

নেপালিরা এখন বন্যায় বিধ্বস্ত, মরদেহে বিপর্যস্ত
×

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে চাদর, তোষক বের করে আনেন দেবীঘাটের এক বাসিন্দা। রোববার নেপালে। ছবি: আহমের খান/দ্য গার্ডিয়ান

দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:০২ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:১৭

নদী দিয়ে এখনো মরদেহ ভেসে আসছে। আশপাশে জমে থাকা কাদার স্তূপ আলকাতরার মতো ঘন আকার ধারণ করেছে। সেখানেও লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালের মর্গগুলোতে আর জায়গা খালি নেই। যেসব দেহ উদ্ধার হয়েছে, সেগুলোর পরিচয় দ্রুত শনাক্তের জন্য স্বজনদেরকে পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডশোর মাধ্যমে ছবি দেখানো হচ্ছে।

বন্যায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর নেপালিরা এখন মরদেহ নিয়ে এক বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়েছে। অনেক মরদেহ এমনভাবে বিকৃত হয়ে গেছে যে চেনার উপায় নেই। সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে বসতবাড়ি থেকে বহু দূরের এলাকাতে। নিরাপদে সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে আসায় ভারতপুর জেলায় ইতোমধ্যে গণকবর দেওয়া শুরু হয়েছে।

প্রতিটি মরদেহে ট্যাগ ও একটি অবস্থান নম্বর লাগানোর আগে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর মরদেহগুলো প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে গণকবরে রাখা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য, পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বজনরা এসব দেহ শনাক্ত করতে পারবেন। 

দেশটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে নদীর তীরজুড়ে ২৫০টির বেশি দেহ পাওয়া গেছে। বিকৃত হওয়ার কারণে মাত্র নয়টির পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এই জেলার জঙ্গলেও গণকবর তৈরি করা হয়েছে। 

চিতওয়ানের একটি জঙ্গলে গণকবর তৈরি করেছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবি: এএফপি

মরদেহ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে স্থানীয় কর্মকর্তারা এক ‘মর্মান্তিক’ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। তারা স্বজনদেরকে মরদেহগুলোর ছবি দেখতে বলছেন। শনাক্ত করার মতো বৈশিষ্ট্য খুঁজে দেখতে বলা হচ্ছে। যেমন- গলার হার, বিয়ের আংটি, উল্কি বা শরীরের কোনো ক্ষতচিহ্ন। 

উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ছবি পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডশোতে সাজানো হয়েছে। স্বজনদেরকে ধৈর্য নিয়ে একটির পর আরেকটি ছবি দেখতে হচ্ছে। ছবিগুলো নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটেও আপলোড করা হয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি মর্গের বাইরের দেয়ালেও ভেতরে থাকা মরদেহগুলোর ছবি টানানো হয়েছে।

নেপাল ও তিব্বতে এখনো ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ আছেন বলে জানা যাচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া গ্রামগুলোতে কেবল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার পৌঁছাতে পারছে। রোববার নেপালের পররাষ্ট্রসচিব অমৃত বাহাদুর রাই বলেন, নিহতদের মরদেহ নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য সরকার ১ হাজারের বেশি ফ্রিজার ইউনিট চেয়েছে।

নদী উপত্যকার কিছু নিচু এলাকায় এখনো সড়কপথে যাওয়া যাচ্ছে। সেখানে কাদার নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছেন অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারীরা। 

ত্রিশূলী নদীর তীরের শহর দেবীঘাটে পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট আমাবাদুত্ত ভট্ট বলেন, ‘এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। এখান থেকে আমরা ১০টি মরদেহ উদ্ধার করেছি। বেশিরভাগ বাড়ির প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ধ্বংস হয়ে গেছে। সব কাদা সরাতে অনেকদিন লাগবে। তখন মরদেহের আর কী অবশিষ্ট থাকবে, কে জানে।’

দেবীঘাটে একটি বাড়ির ভেতর অবশিষ্ট সামগ্রী খোঁজেন কয়েক বাসিন্দা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

দেবীঘাটে বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরবাড়ির জায়গায় ফিরছেন। সেখানে অনেক বাড়িই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ৪৯ বছর বয়সী উষা নেপালির বাড়িতে অবশিষ্ট বলতে আছে শুধু কয়েকটি কংক্রিটের ব্লক ও বেঁকে যাওয়া ধাতব কাঠামো। এই বাড়িতেই তিনি চার সন্তান ও তিন নাতি-নাতনিকে বড় করেছেন।

কাঁদতে কাঁদতে উষা নেপালি বলেন, ‘এখানেই আমার জীবনের সবকিছু দিয়েছি। এখন জানি না কোথায় যাব, কী করব। গায়ের কাপড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই জমি এখন আর নিরাপদ নয়, কিন্তু এটাই আমাদের শেষ সম্বল।’

ত্রিশূলী নদীর পাশে বসবাস যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে তা রোববার আরেকবার দেখা যায়। নদীর পানি হঠাৎ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে উদ্ধারকারীরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান। এরপর দেবীঘাটের অনেক বাসিন্দা ঘরে অবশিষ্ট থাকা কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। তাদের অনেকে স্থায়ীভাবে অন্য এলাকায় পাড়ি জমাবেন।

বাড়িতে পাওয়া একটি চেয়ার হাতে দেবীঘাটের বাসিন্দা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

বন্যার সতর্কবার্তা পাওয়ার পরের কয়েক মিনিটে শুধু নিজের স্বর্ণের গয়না নেওয়ার সময় পেয়েছিলেন ৩৬ বছর বয়সী যমুনা মাগার। বাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, দেবীঘাটে এরপর কীভাবে বসবাস করবেন তা বুঝতে পারছেন না।

যমুনা বলেন, ‘আমরা এর আগেও বন্যার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু কখনো এমন বন্যার কথা ভাবিনি। আমাদের যা কিছু ছিল, সবই হারিয়ে গেছে। নিজের জীবন, সন্তানদের নিয়ে আমি এতটাই চিন্তিত যে এখানে আর থাকতে চাই না।’

(নেপালের দেবীঘাট থেকে প্রতিবেদনটি লিখেছেন দ্য গার্ডিয়ানের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি হ্যানা এলিস-পিটারসেন।)

সংশ্লিষ্ট খবর

আরও পড়ুন

×