ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হিমালয়ে বিপর্যয়ের পর জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি নেপালের

হিমালয়ে বিপর্যয়ের পর জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি নেপালের
×

বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লেও পাহাড়ে বসবাসকারীদের জীবন ও জীবিকায় সেটির প্রভাব পড়ে। ছবি: এএফপি

এএফপি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:১১ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:১৪

নেপালের পর্বতে ঠিক কী কারণে হিমবাহ ধসে পড়েছিল তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এ অবস্থায় বন্যার ভুক্তভোগী, অধিকারকর্মী, হিমবিজ্ঞানী এবং সরকারের মন্ত্রীরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন।

দেশটির ৩ কোটি মানুষের অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে তাদের অবদান খুবই সামান্য। অথচ বন্যার কারণে এখন পুনর্গঠন কাজে দেশটিকে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হতে পারে।

ফলে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি নেপালের সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। রসুয়া জেলা থেকে উদ্ধার হওয়া পেম্বা ছিরিং তামাং (৫৭) বলেন, ‘এমন বন্যা আমি জীবনে দেখিনি। এটি ঘরবাড়ি, গ্রাম- সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।’

এমন পরিস্থিতির জন্য নেপাল কতটা দায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জলবায়ু আন্দোলনকর্মী তাশি লাজোম। তিনি বলেন, বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে নেপাল অন্যতম। একইসঙ্গে জলবায়ুর প্রতি সবচেয়ে সহানুভূতিশীল দেশগুলোরও একটি।

লাজোম বলেন, ‘আমরা এমন একটি অপরাধের শাস্তি ভোগ করছি, যে অপরাধ আমরা করিনি।’ তাই বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলোকে দায় স্বীকারের আহ্বান জানিয়েছেন হিমবিজ্ঞানী তেনজিং ছোগিয়াল শেরপা। তিনি বলেন, ‘তাদের কিছুটা দায়িত্ব নেওয়া উচিত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু ইতোমধ্যে হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকির ধরন বদলে দিচ্ছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, অঞ্চলটি বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে।

সান্যাল বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিকভাবে একের পর এক দুর্যোগ ঘটতে দেখেছি। ২৬ আগস্ট যা ঘটেছে, সেটিও এর উদাহরণ। একটি ঘটনা থেকে একাধিক দুর্যোগের সূত্রপাত হয়েছে।’

‘সতর্কবার্তা’
নেপালের নেতারা বলছেন, পাহাড়ের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নেপাল যে দুর্যোগগুলোর মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এএফপিকে তিনি বলেন, নেপালকে দেওয়া সহায়তাকে শুধু ত্রাণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়। বরং জলবায়ু ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা উচিত।

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার পাদদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য বৈশ্বিক তাপমাত্রার সামান্য বৃদ্ধিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে জানান তাশি লাজোম। তিনি বলেন, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়াকে অধিকাংশ মানুষের কাছে খুব বেশি মনে নাও হতে পারে। কিন্তু পাহাড়ে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতে হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষতি হতে পারে।

জাতিসংঘ ২০২৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তার জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ নামে একটি তহবিল চালু করে। তবে সীমিত অর্থের এই তহবিল থেকে এখনো অর্থ বিতরণ শুরু হয়নি।

সংস্থাটির প্রাথমিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নেপালের বন্যায় শুধু অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সড়ক, সেতু, কৃষিজমির ক্ষতি এবং মানবিক সহায়তার ব্যয়সহ মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।

বৃহত্তর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো পাহাড়ে বসবাসকারী ২৪ কোটি মানুষের পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী আরও ১৬৫ কোটি মানুষের জন্য পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

তিব্বত পলিসি ইনস্টিটিউট নামে থিঙ্কট্যাঙ্কের গবেষক ধনদুপ ওয়াংমো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হলে এ ধরনের বিপর্যয় চলতেই থাকবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি ঘটার আশঙ্কা আছে। সেগুলোর পরিণতি মর্মান্তিক হতে পারে।

আরও পড়ুন

×