ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ কেন ট্রাম্পের নতুন নিশানায়
ছবি: আল-জাজিরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২৯
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ শিগগির হামলা চালানো হতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছের এই পাহাড়ের গভীরে তৈরি করা হয়েছে শক্তিশালী সুরক্ষিত স্থাপনা। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে এ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে কারা চলাফেরা করছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র জানে। এর আগে গত জুলাইয়েও তিনি স্থাপনাটি ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন। তখন তিনি ইরানকে প্রস্তুত থাকার কথাও বলেছিলেন।
ট্রাম্পের নতুন হুমকির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের খার্গ দ্বীপের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে ইরানের সংবাদমাধ্যমে বলা হয়। খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র; দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন কোথায়
ইরানে ‘কুহ-ই কোলাং গাজ লা’ নামে পরিচিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইসফাহান প্রদেশে অবস্থিত। নাতাঞ্জের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থেকে এর দূরত্ব মাত্র প্রায় দুই কিলোমিটার।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়টির ভেতরে মাটির কয়েক শ মিটার নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। মূল কক্ষগুলো অন্তত ১০০ মিটার গভীরে বলে ধারণা করা হয়। ফলে শক্তিশালী বাংকার বিধ্বংসী বোমা দিয়েও স্থাপনাটিতে হামলা চালানো কঠিন হতে পারে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি জানিয়েছে, স্থাপনাটি এখনো নির্মাণাধীন এবং চালু হয়নি। তবে পশ্চিমা কয়েকজন বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে বিকল্প হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালানোর জন্য এই স্থাপনা তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
স্থাপনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, এটি এখনো প্রায় অক্ষত। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালেও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন তখন হামলার লক্ষ্য হয়নি। চলমান সংঘাতেও স্থাপনাটির বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদনকেন্দ্র ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর বেশ কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রম পুনর্গঠনের জন্য পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেখানে সেন্ট্রিফিউজের যন্ত্রাংশ তৈরি, সংযোজন কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুলাইয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এমন গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল যে গত বছরের শেষ দিকে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ এই স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্য নিশ্চিত করেনি।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কতটা ক্ষতি হয়েছে
২০২৫ সালের হামলায় ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদোতে চালু থাকা প্রায় ১৮ হাজার সেন্ট্রিফিউজের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়েছে বলে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদনকেন্দ্র এবং ইরানের একমাত্র ইয়েলোকেক উৎপাদনকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৬ সালের মার্চে নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার প্রবেশপথের ভবনগুলোতে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। তবে স্থাপনার ভেতরে অতিরিক্ত ক্ষতির প্রমাণ তারা পায়নি।
ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার টানেলের প্রবেশপথ এখনো বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কোনো কার্যক্রম চলছে- এমন প্রমাণ নেই।
ট্রাম্পের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
২০২৫ সালের জুনের হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করা হয়েছে। তবে কয়েক দিন পর ফাঁস হওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ছয় মাসেরও কম সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন।
তবে হামলার পর থেকে কোনো পরিদর্শক ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে ইরানের মজুত ইউরেনিয়ামের অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু হামলার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে ইরানের সহযোগিতা কমে যাওয়ায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে আগের তুলনায় কম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসির মতে, ইরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে তাত্ত্বিকভাবে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হলে তা ১০টির বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে এই মজুত বর্তমানে কোথায় রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
এ কারণেই অক্ষত ও গভীর ভূগর্ভে নির্মিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের নতুন হুমকির ফলে স্থাপনাটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামনে এসেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
- বিষয় :
- ট্রাম্প
- ইরান
- পারমাণবিক শক্তি
- হামলা
- হুমকি