সিনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ আমেরিকা-বিরোধী মুসলিম উগ্রবাদী: ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০৭
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে সিনেট নির্বাচনের প্রচারণামূলক সমাবেশে মুসলিম প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদকে ‘আমেরিকা-বিরোধী মুসলিম উগ্রবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববারের ওই সমাবেশে তিনি এল-সায়েদকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলায় ‘ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩’ (৯/১১) হামলাকারীদের সঙ্গে তুলনা করেন এবং তাকে সিনেটর হওয়া থেকে ঠেকাতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ডেমোক্র্যাটরা সহিংস ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে।
মিশিগানের পোর্ট হিউরনে সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, আমি এখানে এসেছি একজন জিহাদি ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হওয়া থেকে আটকাতে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই এলাকার ৬৬ শতাংশ ভোট ট্রাম্পের পক্ষে পড়েছিল।
এল-সায়েদ সিনেটে নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মিশিগানের সিনেট আসনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আসনটিতে রিপাবলিকান দলের সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মাইক রজার্সের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এল-সায়েদ। আসনটি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমাবেশে ট্রাম্প এল-সায়েদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াকে ‘ফ্লাইট ৯৩’-এর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো টড বিমারসহ অন্যদের ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, পঁচিশ বছর পর, মিশিগানের উচিত উঠে দাঁড়ানো এবং লড়াই করা—ঠিক যেমনটি টড করেছিলেন—যাতে কোনো জিহাদি ক্যাপিটলে প্রবেশ করতে না পারে। ট্রাম্প আরও বলেন, এল-সায়েদ জয়ী হলে তিনিই হবেন একমাত্র সিনেটর, যাকে সিনেটে প্রবেশের আগে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এল-সায়েদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নাকচ করেছেন। রোববার রাতে মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ট্রাম্প তার প্রথম নামকে ব্যক্তিগতভাবে অপমানজনক হিসেবে দেখলেও সৌদি আরব বা কাতারের একই নামের ব্যক্তিদের নিয়ে তার আপত্তি নেই। অথচ সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের বিনিয়োগ তহবিল অ্যাফিনিটি পার্টনার্সকে কয়েক বিলিয়ন ডলার দিয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, কাতার ট্রাম্পকে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের একটি বোয়িং ৭৪৭ জেট উপহার দিয়েছে।
এল-সায়েদ বলেন, আমি বুঝতে পারছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমার প্রথম নামটিকে ব্যক্তিগতভাবে অপমানজনক বলে মনে করেন। অথচ, সৌদি আরবের কেউ একই নামের হলে তার কোনো সমস্যা হয় না—যদিও তারাই তার জামাতার প্রাইভেট ইকুইটি ব্যবসায় অর্থায়ন করছে। আবার কাতারের কেউ একই নামের হলে তাতেও তার কোনো আপত্তি থাকে না—যদিও তারাই তাকে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের একটি ব্যক্তিগত জেট বিমান উপহার দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন এল-সায়েদ। ট্রাম্পের সমাবেশে উপস্থিত শ্বেতাঙ্গ-প্রধান জনতার একাংশ এল-সায়েদকে নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের সমর্থনে উল্লাস করে। কেউ কেউ তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে চিৎকার করে, আবার কেউ ‘দেশ থেকে বের করে দাও’ বলে স্লোগান দেয়। অথচ এল-সায়েদের জন্ম মিশিগানেই।
মিশিগানের স্যান্ডুস্কির বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী টেরেন্স ক্যামবার্ন শারীরিক প্রতিবন্ধী ও সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য। তিনি এল-সায়েদের ‘রাজনৈতিক বিশ্বাসের’ কারণে ট্রাম্পের সমালোচনাকে সমর্থন করেন বলে জানান। ট্রাম্পের ৯/১১-সংক্রান্ত মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যামবার্ন বলেন, আমি ডিয়ারবর্ন ঘুরে দেখেছি এবং সেখানে এমন অনেক কিছু দেখেছি, যার সঙ্গে তিনি (এল-সায়েদ) একমত পোষণ করেন। মিশিগানের ডিয়ারবর্ন শহরে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
সমাবেশ শেষে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার সময় ট্রাম্পের ৯/১১-সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তর দেননি রজার্স। তবে রোববার দিনের শুরুতে এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এল-সায়েদ একজন সহিংস সন্ত্রাসী—এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন। রজার্স বলেন, আমি তাকে কখনোই সন্ত্রাসী বলিনি।
তবে রজার্স কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেছেন, আরব বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী ইসলামপন্থী গোষ্ঠী ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে এল-সায়েদের সম্পর্ক রয়েছে। এল-সায়েদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আনুগত্য নিয়ে রজার্সের প্রশ্ন তোলাকেও তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে রজার্স বলেন, এল-সায়েদ এসব অভিযোগের বিষয়ে যথেষ্ট স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তিনি ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টস অফ আমেরিকা’-র আদর্শের অনুসারী একজন প্রার্থী, যার পেছনে এমন কিছু উগ্র সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা আমেরিকাকে পছন্দ করে না।
রোববার পূর্ব মিশিগানে ট্রাম্পের এই ভাষণের আগের দিনই অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচার চালান সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আগামী সপ্তাহের নির্বাচনে মিশিগানের গুরুত্ব এই দুই নেতার প্রচারেই স্পষ্ট হয়েছে।
শনিবার ডেট্রয়েটে আয়োজিত এক সমাবেশে ওবামা বলেন, এল-সায়েদের বিরোধীরা তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে, যেন তিনি তাদের তুলনায় ‘কম আমেরিকান’। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ওবামা বলেন, একসময় তার জন্মস্থান নিয়েও মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল—তিনি কেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন বলে প্রচার করা হয়েছিল। ওবামা বলেন, “এসব কৌশল আমার ক্ষেত্রে কাজ করেনি। মিশিগানেও না। আর আব্দুলের ক্ষেত্রেও এগুলো কোনো কাজে আসবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলাতে ডেমোক্র্যাটদের মাত্র কয়েকটি আসন অর্জন করতে হবে।