ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পকে ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট বানাবে?

মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পকে ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট বানাবে?
×
×

মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার ভাগ্যও নির্ধারণ করবেন মার্কিন ভোটাররা। ছবি: এএফপি

এএফপি

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৪:২৫ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৪:৪৯

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নানা নাটকীয়তায় ভরা। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁর ক্ষমতার শেষ দুই বছর আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

এই অস্থিরতার মধ্যে থাকতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান। নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানানো, এমনকি ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের পাল্টা জবাব দিতেও তৎপরতা শুরু করতে পারেন। ট্রাম্পের এসব সম্ভাব্য পদক্ষেপ নির্বাচনের পর মার্কিন সরকারের কাজে সব দিক থেকে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

এ অবস্থায় ট্রাম্পকে ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনীতিতে ‘লেম ডাক’ বলতে প্রভাব ও কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যাওয়া নেতাকে বোঝায়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ক্ষমতার মেয়াদ শেষের দিকে থাকা এই প্রেসিডেন্ট আরও বেশি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারেন।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক পিটার লজ এএফপিকে বলেছেন, ‘ট্রাম্প নীরব থাকবেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না। অন্তত তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কোনো নমুনা নেই। তিনি কখনো বলেননি যে, হেরে গেছেন। বরং যখনই কোণঠাসা হয়েছেন, তখনই আরও জোরে চিৎকার ও লড়াই করেছেন।’ 

ভেটো ও প্রতিশোধ
ট্রাম্প নিজেকে সব সময় একজন লড়াকু হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে একই কৌশল অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ, লড়াই চালিয়ে যাবেন।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক পোস্টকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা (রিপাবলিকান পার্টি) জিততে না পারলে ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো আইন প্রণয়নের উদ্যোগে আমি ভেটো দেব।’ হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা যেকোনো তদন্ত বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করলে সেটির জবাব দিতে তারা প্রস্তুত।

টাইম সাময়িকীকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সম্ভবত আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, আমিও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়- ডেমোক্র্যাটরা তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলে, তিনি উল্টো তদন্তকারী ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাতে বিচার বিভাগকে নির্দেশ দেবেন।

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ফলাফল মানতে চাননি ট্রাম্প। বরং ভোটার জালিয়াতি নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন। যা পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। এবার তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনেও হস্তক্ষেপ করতে পারেন। বিতর্কিত আসনগুলোর ভোট গণনাকে চ্যালেঞ্জ জানানো কিংবা ফলাফল অনুমোদনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টাও করতে পারেন।

ইরান যুদ্ধ
পররাষ্ট্রনীতি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ‘লেম ডাক’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতেও ব্যাপক ক্ষমতা থাকে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করতে পারেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাস এএফপিকে বলেন, ‘ট্রাম্প তাঁর যুদ্ধবাজ উত্তরাধিকার চাইবেন, এটা আমি মনে করি না। তিনি চান, তাঁর মেয়াদ শেষে যুক্তরাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হোক।’

ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে ট্রাম্প বরখাস্ত করতে পারেন- এমন জল্পনাও চলছে। দায় নিতে অনাগ্রহী একজন প্রেসিডেন্ট সত্যিই এমন পদক্ষেপ নিলে তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

ইউক্রেন, বরফ গলানো ও বাণিজ্য
ট্রাম্প নিজেকে শান্তি চুক্তি সম্পাদনে দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে পছন্দ করেন। রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে তিনি সম্ভবত ইউক্রেনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে নতুন করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা।

একই সময়ে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এই দুই নেতাকে তিনি বিশ্বশক্তির সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন। চলতি মাসের শেষ দিকে চীনে একটি সম্মেলনে তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক হতে পারে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাস বলেন, ন্যাটো ও পশ্চিমা মিত্রদের কয়েকটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকতে পারে। এমনকি এ প্রক্রিয়ার গতি আরও বাড়তে পারে।

তবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ‘নিরলসভাবে সক্রিয়’ থাকবেন বলে মনে করেন হাস। কানাডার প্রতি তাঁর সাম্প্রতিক বৈরী মনোভাবেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

২০২৮ সালেও প্রাসঙ্গিক থাকতে চান ট্রাম্প?
তিনি সব সময় নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে পছন্দ করেন। তাই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের দিকে সবার মনোযোগ চলে যাক, সেটি সহজে মেনে নেবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাম্প নিজেও সেই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর আভাস দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।

তবে ‘গ্রেট আমেরিকান প্রেসিডেন্টস: দ্য টুয়েলভ হু ট্রান্সফর্মড দ্য নেশন’ বইয়ের লেখক ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান লিচম্যান বলেন, ‘কিংমেকার হয়ে ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাইবেন।’

নিজের স্মৃতিসৌধ নিজেই গড়তে চান
অন্যদের মতো অবসরের প্রস্তুতি হিসেবে ট্রাম্পও হয়তো নিজের বাসভবন ও আশপাশের পরিবেশ উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি নীতিগত বিষয় নিয়ে খুব একটা কথা বলেননি। বরং লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার এবং ওয়াশিংটনকে আরও সুন্দর করে তোলার বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

ওয়াশিংটনে নিজের উপস্থিতির স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার আগ্রহের কথা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর আশঙ্কা, অন্যরা তাঁর হয়ে এসব কাজ করবে না। সোমবার রিফ্লেক্টিং পুলে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ওয়াশিংটনের জন্য আমাদের অনেক ভালো পরিকল্পনা আছে।’

আরও পড়ুন

×