ন্যাটোর রেড লাইন পরীক্ষা করছে রাশিয়া, যুদ্ধ ছড়াচ্ছে কৃষ্ণসাগরে
কৃষ্ণসাগরে ড্রোন প্রতিহতের মিশনে রোমানিয়ার এফ-১৬ ফাইটার জেট। গত ১৭ অক্টোবর। ছবি: এএফপি
রয়টার্স
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৬:৪৮
কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক যুদ্ধ ন্যাটোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো সদস্য দেশগুলো।
গত মাসে কৃষ্ণসাগরে দেশ দুটির কাছাকাছি এলাকায় পণ্যবাহী জাহাজে সাতটি হামলা হয়। এরপর প্রতিরক্ষা জোরদারের ঘোষণা দেয় ন্যাটো। সামুদ্রিক টহল বিমান, রাডার ও ড্রোন মোতায়েনের কথা জানায় তারা। কিন্তু এর তিনদিন পর গত ২৩ অক্টোবর রোমানিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে আরেকটি জাহাজে হামলা হয়। আর গত সপ্তাহে বুলগেরিয়ার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ডুবে যায় গ্রিসের কনটেইনারবাহী একটি জাহাজ।
সামরিক বিশ্লেষকদের সন্দেহ এসব হামলার পেছনে রাশিয়ার হাত আছে। জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের মতে, সবশেষ হামলার ভিডিওতে একটি নৌ-ড্রোন দেখা গেছে। সেটির ধরন রাশিয়ার ব্যবহৃত ড্রোনের মতো। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি নিঃসন্দেহে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনা।’
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। এর আগে তারা ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। দেশটির দাবি, সামরিক সহায়তা দিয়ে ইউরোপীয় সরকারগুলোই ইউক্রেনের যুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে।
‘রেড লাইন’ পরীক্ষা করছে রাশিয়া
ইউক্রেন তাদের পণ্য রপ্তানির জন্য রোমানিয়ার একটি খাল ব্যবহার করে। গত মাসে যেসব জাহাজে হামলা হয় সেগুলোর বেশিরভাগই ওই খালের কাছে নোঙর করা ছিল অথবা খালটির দিকে যাচ্ছিল। হামলার শিকার একটি জাহাজ রোমানিয়ার জলসীমার মধ্যে ছিল। বাকি আটটি ছিল রোমানিয়া বা বুলগেরিয়ার অর্থনৈতিক অঞ্চলে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের কৃষ্ণসাগর কর্মসূচির পরিচালক ইউলিয়া জোজা বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো উত্তেজনা বাড়াতে অনাগ্রহী। এই মনোভাবকেই রাশিয়া হামলার ক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যাটোর আকাশসীমায় রাশিয়ার ড্রোন অনুপ্রবেশ করেছে। এখন জাহাজে হামলা হচ্ছে। জোজা বলেন, মস্কোর এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য ‘রেড লাইন’ বা সহ্যের সীমারেখা পরীক্ষা করা। কারণ তারা জানে যে, পশ্চিমারা পাল্টা পদক্ষেপ নিলেও সেটির পরিসর সীমিত হবে।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেন, ইউক্রেনকে মিত্রদের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করতেই রাশিয়া এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটি গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলসহ জোটের সব সদস্যকে রক্ষায় ন্যাটো অঙ্গীকারে অটল আছে।
এক বছরে ৪০০ জাহাজে হামলা
শস্য ও তেল রপ্তানির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন উভয়ের কাছে কৃষ্ণসাগর গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এ কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অপরদিকে ন্যাটো সদস্য রোমানিয়ার জন্যও কৃষ্ণসাগর বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এখানে দেশটির সমুদ্র উপকূলের কাছে নেপচুন ডিপ গ্যাস প্রকল্প আছে। আগামী বছর এই প্রকল্প চালু হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্যাস উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে রোমানিয়া।
অ্যামব্রে অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক টমাস আলেক্সার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে ৩১৭টি জাহাজে হামলা করেছে দুই পক্ষ। এর আগের ছয় মাসেও ৭৪টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছিল।
অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে ইউক্রেন ১৩৭টি জাহাজে হামলা চালায়। রাশিয়ার হামলার সংখ্যা ছিল ৯২টি। তবে অক্টোবরে রাশিয়া ৩৮টি জাহাজে হামলা চালায়, ইউক্রেনের হামলার সংখ্যা ছিল পাঁচটি।