প্রচ্ছদ
অসামান্য দিয়ে কেন নয় শুরু...
নিলুফা আক্তার
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ০৭:২০
আসলেই কি জীবনের শুরু সামান্য দিয়ে? যখন আমরা বলি, জীবনের কোনো কিছুই অপাঙ্ক্তেয় নয়; তার অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে, যাকে আমরা সামান্য বলে ফেলে দিই, অবহেলা করি; তার প্রাণভ্রমরার বাস অসামান্যে? আসলে সেই সামান্য দিয়েই অসামান্যের শুরু। সাধারণ দিয়েই তো অসাধারণের যাত্রা। সামান্য দিয়ে শুরুর মধ্যেই অসামান্যের অমিয় শক্তির আধার। মানুষ যখন জীবনের অর্জন সম্পর্কে কিংবা সমাজ তার পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলে, শুরুটা হয়েছে সামান্য দিয়ে। তখন হয়তো সে উপলব্ধি করে না, ওই শুরুটাই তার অসামান্যের পথে ধাবিত হবার নিজস্ব অমিত শক্তি। সুতরাং আমরা কি বলতে পারি না, আসলে সামান্য দিয়ে নয়; সব শুরুই হয় অসামান্য দিয়ে।
'সামান্য দিয়ে শুরু'র কথা লিখতে বসে মানুষ আমি বিষয়টাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। তাই ফেরাতে চাই দৃষ্টি জীবনের দিকে...! যখন আমি মাতৃজঠরে ছিলাম তখন আমার এই রক্তবীজের জন্ম কিন্তু হয়েছিল অসামান্য দিয়েই। কারণ এই নশ্বর পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী আদম-হাওয়ার মতো দু'জন নর-নারীর অবিনশ্বর প্রেম আর সঙ্গমের তীব্র গভীর অনুভূতির আশ্চর্য মুঙ্ক্ষণেই পরমাশ্চর্য ওই রক্তকণার জন্ম! তারপর ভ্রূণ আমি একটু একটু করে হাত-পা ছড়িয়ে মানুষ হয়ে উঠতে থাকি। মানুষের ভেতর মানুষের এ এক অসামান্য শুরু!
নারী শিশুর জন্ম, জীবন বাস্তবতা নিয়ে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তখনও 'বিকলাঙ্গ চিন্তক'! এখনও কি? আমাকে সেই 'কিম্ভূূতকিমাকার' চিন্তার ধূম্রজালে নিক্ষেপ হতে হয়নি। কিন্তু জন্মের পর তবুও নার্স সদ্যোজাত এই আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল! নেপথ্যের কারণ জন্মদাত্রী অ্যাকলাম্পসিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত! অথচ মা আর সদ্যোজাত আমি দু'জনেই বেঁচে গেলাম! মৃত্যুকে তুড়ি মেরে এই আমার বেঁচে যাওয়া, সে এক অসামান্য শুরু নয় কী! তারপর মেঘনাপারের শহরটাতে শিশু আমার আদর-শাসনের বিচিত্র খেয়ালের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা। কিন্তু সেই বেড়ে ওঠা, একজন পুরুষের 'যেভাবে বেড়ে উঠি' কিংবা একজন নারীর 'আমার মেয়েবেলা'র মতোও নয়, বরং একজন সন্তানের বেড়ে ওঠা। একটু থমকে দাঁড়াতে হয়, যে বিভাজনের কথাটি বলছি, সেটা কি সমাজের চোখে নারী শিশু, মাতাপিতার কাছে শুধু সন্তান, আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল? উত্তরটা আনিসুজ্জামান স্যারের কথা দিয়েই দিতে চাই। যদিও তিনি বাংলা সাহিত্যে নারীর অবস্থান প্রসঙ্গে কথাগুলো বলেছেন, কিন্তু সাহিত্য তো সমাজেরই দর্পণ; মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাই স্যারের কথার সূত্র ধরেই অসামান্যের পরবর্তী শুরুটা করতে চাই- 'পুরুষ শুধু নিজের চোখ দিয়ে নারীকে দেখেনি, কী দৃষ্টিতে নারী পুরুষকে অবলোকন করছে, পুরুষ সম্পর্কে, নিজের সম্পর্কে, জগৎ সংসার সম্পর্কে নারী কী ভেবেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ব্যাখ্যা করেছে পুরুষই। ...নারী যখন নিজের কথা বলতে শুরু করেছে তখন পুরুষের লেখা থেকে তার জানা হয়ে গেছে ভালোবাসলে, ঘৃণা করলে, কষ্ট পেলে, দুঃখ দিলে নারীর অনুভূতি কেমন হয়। (সম্পা, শাহীন আখতার, সতী ও স্বতন্তরা :বাংলা সাহিত্যে নারী, ১ম খণ্ড) অর্থাৎ সুস্বাদু সন্দেশ তৈরি করার জন্য নানা দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ করা এক লৌহনির্মিত ছাঁচ দিয়ে নারীর দেহ আর অনুভূতির নির্ধারিত এক অবয়ব নির্মাণ করে ফেলেছে এ পুরুষ-সমাজ।
মনোমুগ্ধকর লোভনীয় সন্দেশ বানানোর সামান্য সেই লৌহ ছাঁচ দিয়েই কি আমার জীবনের অসামান্য শুরু? দেখি না স্মৃতি আমায় কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়? সামান্য না অসামান্যের শুরুতে....। আহা, জীবনের ফেলে আসা হৃদয় জাগানিয়া স্মৃতির কথায় হৃদয় কেমন মোলায়েম মৃত্তিকার মতন ভিজে যায়, মিলিয়ে যায়! 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!' কিন্তু সামান্যের ধূলিকণায় মিশে থাকা মুক্তসম সেই অসামান্যের কথা বলতে হলে তো বেদনাকে জাগাতে হবেই। আমার শিক্ষক মা, আইনজীবী পিতা মেয়েদের নিজের মতো করে হাসতে, কাঁদতে, খেলতে, লড়তে কোনো বাদ সাধেননি। খুব অবাক হই, ভালো লাগায় বুক ভরে যায়, যখন ভাবি, সেই ছোট্টবেলায় কী ভীষণ অবলীলায়, অবাধ মুক্তির আনন্দে আমার বড় হওয়ার অসামান্য শুরু!
শিক্ষায়তনে আনন্দযজ্ঞের ভেতর দিয়ে বিদ্যার অন্বেষণ, আত্তীকরণ, ডাকাতিয়া নদীতে নির্ভয়ে ঝাঁপ দেওয়া, শহরের মধ্যখান দিয়ে বয়ে যাওয়া জোয়ার যৌবনে ক্ষ্যাপাটে খালে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা, নদীর পাড় ঘেঁষে বসে জলরঙে ছবি আঁকা, সান্ধ্য আলোয় খোলা মাঠে স্বননের কবিতা পাঠ, সূর্য ওঠার আগে নগ্ন পায়ে প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া। আহা! আমার মগ্ন হৃদয়ের উথাল-পাতাল করা যত স্মৃতি! 'সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!' জীবনানন্দের মতো আমিও সেই ছোট্টবেলার জল-জমিন-আসমান ঘেরা হৃদয় উপড়ানো স্মৃতিগুলোর সঙ্গে আজও যখন একা একা কথা বলি, তখন অসামান্য এক অনুভূতির ভেতরের সেই অসাধারণ ক্ষণটি আমি আমার সঙ্গে যাপন করি। এই অসামান্য শুরুটাও জীবনের, নিয়তির নিয়মে এক সময় থমকে দাঁড়ায় ছোট্টবেলার বন্ধু 'বলাকা'র আত্মহত্যায়। তারুণ্য-যৌবনের সন্ধিলগ্নে দাঁড়িয়ে রূপসী সে মেয়ে 'বলাকা'। তখন ইডেন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। ও যখন ছুটিতে বাড়ি আসত, আমার ক্ষ্যাপাটে মন ওকে দেখলেই মনে মনে গাইত 'বলাকা ও বলাকা, দু'চোখে স্বপ্ন আঁকা, খুঁজে ফিরিস তুই কাকে?' তারপর একদিন অবেলায় ওই স্বপ্নকে খুঁজতে গিয়েই বলাকা নিখোঁজ হয়ে যায় অসময়ে। তার নিথর নশ্বর অসামান্য দেহটা সামান্য বহ্নিতে ভস্ম করে, নিশ্চিহ্ন করে দেয় ধর্ম। সেই স্মৃতি আর ভস্ম বেদনার স্তব্ধ এক প্রতিমা হয়ে আজও আমার 'অন্তর্লোকে জোনাকী জ্বলে'র মতো জ্বলে আর নেভে। আহা! কী অসাধারণ বেদনার ভেতর দিয়ে আমার যৌবনের শুরু! এই আত্মহত্যায় আমাদের মা-বাবারা উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে। তবুও জীবনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, অবাধ গতির কাছে বারবার হার মানে অপ্রতিরোধ্য স্থবির মৃত্যু। সব ব্যথার ভার রয়ে সয়ে ক্ষয়ে একদিন আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। যখন আমি শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য পার করে যৌবনবতী হয়ে উঠি। যখন আমি নারী থেকে মা হয়ে যাই। তখন জীবনের দাবিতে আমিও এক সময় বলাকা হয়ে উঠি, কিন্তু ওকে অনুসরণ করি না। আমিও ভালোবাসতে শিখি। সেই ভালোবাসা পুরুষের তৈরি ভালোবাসা। সেই লৌহ ছাঁচ-এর প্রেম। ভালোবাসার এই সাধারণ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আমি আরও একবার অসাধারণ হয়ে উঠি। আমার ভেতরে ভ্রূণের অনুভবে আমি যেন মায়ের ভেতরে সেই রক্তবীজ কণা আমাকেই আবার নতুন করে অনুভব করি। জীবনে এ এক অসামান্যের শুরু! তারপর একদিন কাহলিল জিব্রানের মতো মা আমিও উপলব্ধি করলাম- Your Children are not your Children… they come through you but not from you and though they are with you! সেই ক্ষণ থেকে অদ্ভুত এক যাতনার মনোবাসে আমি নিমজ্জিত। তবুও আমার আত্মজা- এই পরিচয় নিয়ে আমারই মতো এক অসামান্যের পিরামিড স্পর্শ করে তারও জীবনের শুরু। জননী আমি এবার জায়া হয়ে নতুন এক অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হলাম। মধ্যযুগের বেহুলার মতো লখিন্দরকে বাঁচাতে আমাকেও একবিংশ শতাব্দীর রঙ্গমঞ্চের নির্মম জীবন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। অনিবারণীয় মৃত্যুর মতো সেও এক প্রতিনিয়ত যুদ্ধরত অসাধারণ এক জীবনের শুরু! সামাজিক সংসারে 'জায়া' 'নারী' আমি এবার পুরুষের চোখে যেন মানুষ হয়ে উঠলাম। যদিও এই মানুষ পরিচয় তারা নানা প্রশংসাবাণে বিদ্ধ করে নারী-শব্দ খাঁচায় পুরে রাখার নানা কূট-কৌশলে অবিরত ক্রীড়ারত। কিন্তু মানুষ আমি আমার 'মেরুদণ্ড'র কথা কখনোই ভুলে যাই না। সনাতন সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে 'মানুষ' হয়ে ওঠার এক অসামান্য শুরু। সমাজ যখন আমার 'কন্যা-জায়া-জননী'র পূর্ণাঙ্গ নারীসত্তা নিয়ে মুগ্ধ; ঠিক তখনটায় আমি আমার নারীসত্তা নিয়ে বিব্রত, বিক্ষুব্ধ! পরিণত মানুষ আমি আত্মপ্রশ্নে ক্ষুব্ধ হই এই ভেবে, পুরুষকে কেন তবে 'পুত্র-স্বামী-পিতা'র পূর্ণতায় নারীর পাশাপাশি দাঁড় করানো হয় না?
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির নীরব প্রতিবাদস্বরূপ এখন আমি যখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াই, হূৎপিণ্ডের ভেতরের কথাগুলো মস্তিস্ক দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করে স্পষ্ট অকম্পিত কণ্ঠে বলতে শুরু করি, মনোদৈহিক শক্তি নিয়ে একা একা পথ হাঁটতে থাকি, ঠিক তখনই আমি বুঝি, আমি জানি- হ্যাঁ, এবার আমি কন্যা-জায়া-জননী এবং অতঃপর নারী থেকে মানুষ হয়ে উঠেছি। এ আমার নিজস্ব অর্জন, এ আমার অন্তর্নিহিত শক্তি। এখন আমি যখনই মুখোমুখি হই জন্ম-জরা-ক্ষয় নামক জীবনযুদ্ধের তখন অসামান্য দিয়ে শুরু হওয়া মানুষ আমি সামান্যের অর্গল ভেঙে বেরিয়ে আসি গভীর আত্মবিশ্বাসে। এভাবেই সামান্য দিয়ে শুরু হয়ে অসামান্য হয়ে যায় আমার প্রাত্যহিক যাপিত জীবন!
- বিষয় :
- প্রচ্ছদ
- নিলুফা আক্তার
