কয়েকজন জোনাকি
ইরাজ আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পথ হাঁটতে হাঁটতে সৈয়দ শহীদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল; সখ্য তৈরি হয়েছিল। দিবারাত্রি জুড়ে সময়ের মাকড়সা জাল বুনেছিল। আমাদের এখন দেখা হয় না, কিন্তু সেই জালটা ছিঁড়ে গুটিয়ে যায়নি। মাঝখানে এখন দূরত্বের পরিমাপ হিসেবে যোগ হয়েছে একটি মহাসাগর। এখন আটলান্টিকের ওপারে বসবাস করেন সৈয়দ শহীদ। বহু বছর ধরেই মার্কিন মুলুকে তাঁর বসবাস। যদি অতীত-বর্তমানের কাঠামোটা সরিয়ে ফেলা যায় তবে বলা যাবে, সৈয়দ শহীদের সঙ্গে আমার এখনও দেখা হয়, হয়ে যায়। যে রকম হতো তিরিশ বছর আগে অনেক বছর আগে সন্ধ্যাবেলা স্টেডিয়াম পাড়ায় বইয়ের দোকান ম্যারিয়েটায়, পল্টনের নির্জন কোনো গলির গভীরে চায়ের দোকানে, কোনো ফুটবল ম্যাচে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে, সাপ্তাহিক ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকার অফিসে সান্ধ্য আড্ডায় অথবা শাহজাহানপুরের মোড়ে।
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে, তারিখ মিলিয়ে নির্দিষ্ট করে এখন আর বলা সম্ভব নয় তাঁর সঙ্গে আমার কবে দেখা হয়েছিল অথবা কী কারণে দেখা হয়েছিল। বছর তিরিশ আগে বা তারও আগে এই ঢাকা শহর তখন এত অচেনা হয়ে যায়নি। হাতের রেখার মতো পরিচিত ছিল পথ, গলি, বাড়িঘর। সহজেই চেনা হয়ে যেত মানুষের মুখ, সম্পর্ক। তখন পথ চলতে চলতে সৈয়দ শহীদ কখন শহীদ ভাই হয়ে উঠেছিলেন আজ আর মনে নেই।
বইয়ের রাজ্যে অবাধ বিচরণ ছিল শহীদ ভাইয়ের। শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, খেলা, রাজনীতি, সমাজনীতি– কী পাঠ করেননি! আমি জানি, এখনও সেই বইয়ে-ই মগ্ন হয়ে থাকেন। মার্কিন মুলুকে দীর্ঘ নির্বাসনে আজও বই তাঁর সঙ্গী। বন্ধুত্ব আসলে প্রতিদিন লেখা রোজনামচার মতো। সেই লেখাটা বন্ধ হয়ে গেলে তা নির্বাসনে পরিণত হয়।
আশির দশকের মাঝামাঝি একটা সময় থেকে শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। তখনকার ঢাকা স্টেডিয়ামে ছোট্ট একটা বইপাড়ার উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিল ম্যারিয়েটা নামে একটি বইয়ের দোকান। সময়ের পরিক্রমায় ম্যারিয়েটা এবং সেই ছোট্ট বইপাড়াটাও আর বেঁচে নেই। সেখানেই নিয়মিত সান্ধ্য আড্ডার আয়োজনে জড়িয়ে গিয়েছিলাম শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে। আগেই বলেছি, প্রচুর পড়তেন শহীদ ভাই। কিন্তু বই পাঠের বিষয়ে আমার ধারণা এবং অর্জন তখনও ছিন্নমূল পাঠকের পর্যায়ে রয়ে গেছে। সেই ছিন্নমূল, বিক্ষিপ্ত ধারণা কিনারা খুঁজে পেয়েছিল। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের মতো অদৃশ্য নিয়মে বেঁধে কত বই যে শহীদ ভাই আমাকে পড়িয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু পরে লক্ষ্য করে দেখেছি, সেগুলো এলোমেলো পাঠ ছিল না। সুনির্দিষ্ট একটি অভিমুখ ধরে রেখে যে বই পড়তে হয়, একজন লেখকের মানসিকতা বুঝতে হয়, তাঁর লেখার দর্শন সম্পর্কে জেনে যেতে হয় সেই ভ্রমণে, সে শিক্ষাটা শহীদ ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া। আজও বই সংগ্রহ করতে গিয়ে, পাঠ করতে গিয়ে শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়।
তিন দশক বা তারও বেশি সময় আগে এই শহরে ভাবনার উদ্রেক ঘটানো সিনেমাগুলো দেখার কোনো মসৃণ ব্যবস্থা ছিল না। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের হাইকমিশনের কল্যাণে সেসব সিনেমা আমরা দেখতে পেতাম। আমার সিনেমা দেখার দারুণ এক সঙ্গী ছিলেন সৈয়দ শহীদ। কখনও ত্রুফো, কখনও গঁদ্যার, বার্গম্যান, কখনও সত্যজিৎ, ঋত্বিক অথবা মৃণাল সেনের সিনেমা দেখা এবং বোঝার আনন্দ তাঁর কাছেই শেখা। সিনেমা দেখে হল থেকে বের হয়ে আমরা হাঁটতাম। সদ্য দেখে ফেলা সিনেমাটির ব্যবচ্ছেদ করতাম। শহীদ ভাই আসলে আলোচনার সুযোগটা তৈরি করে দিতেন সেই যাত্রার মধ্যে। এমন কত সন্ধ্যার সঙ্গে আমরা হাঁটতে হাঁটতে, কথা বলতে বলতে রাত্রির দিকে চলে গেছি তার ইয়ত্তা নেই।
কয়েক বছর আগে মার্কিন মুলুকে গিয়েও দেখা হয়েছে আমাদের। আমরা অবিশ্রান্ত কথা বলেছি। শিল্প, সাহিত্য অথবা রাজনীতি– কিছুই বাদ পড়েনি সেখানে। মনে হয়েছিল, পূর্ব রাত্রি অথবা পূর্বদিনের মধ্যেই রয়ে গেছি আমরা। অনেকদিন আগের এক শহর আরেকটি শহরের মধ্যে জেগে উঠেছে ঘুম থেকে। আজও আমার অবিরাম শিখতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে সৈয়দ শহীদ তাঁর ছায়া বিস্তার করে আছেন। যখন চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার সন্ধান দেয় নতুন একটা বই অবিশ্রান্ত কথা বলতে ইচ্ছে করে, শহীদ ভাইয়ের অভাব অনুভব করি। আলোচনাযোগ্য একটি সিনেমা দেখে বের হয়ে ভাবি, শহীদ ভাই কী বলতেন সিনেমাটা দেখে? একটা বইয়ের রুদ্ধশ্বাস পাঠ শেষ করে ভাবি, আমরা আবার কথা বলতে বলতে, হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম পল্টনের কোনো গলির চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে ভাসত আমাদের অগণিত কথার বুদ্বুদ?
মুকুল ভাই সৈয়দ শহীদের মতো নির্বাসিত জীবন বেছে নেননি আটলান্টিকের ওপারে। অথচ তারা দুজন বন্ধু হয়ে আছেন অর্ধেক জীবনব্যাপী। খায়রুল আনোয়ার মুকুল দীর্ঘকাল ধরে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। এই শহরে আমাদের পরিচয়ের সূত্রপাতও সাংবাদিকতা পেশার হাত ধরে। একদা সাংবাদিকতা আমারও রুজির উৎস ছিল। তরুণ বয়সে খবর এবং খবরের পেছনের মানুষদের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। তখনও এই পেশাটি সামাজিক-রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ হিসেবেই অনেককেই আকর্ষণ করেছিল। সেই আকর্ষণ এই মানুষটির কাছে যাবার সুযোগ করে দিয়েছিল। আঙুল গুনে দেখলে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেছে আমাদের সম্পর্কের। সাংবাদিকতা পেশায় মুকুল ভাই কাটিয়ে দিয়েছেন চল্লিশ বছর প্রায়। আমি তিরিশ। এই দীর্ঘ ভ্রমণ- যাত্রায় বয়স বেড়েছে আমাদের। এই শহরের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বহু দুর্যোগের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, আবার নতুন দুর্যোগ তৈরি হয়েছে। খবরের উৎস বদলেছে, মানুষের কথা বলার ধরন পাল্টেছে, বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ খসে পড়েছে আবার মুখোশ তৈরির নতুন কারখানাও স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু সময়ের এই অস্থির আবর্তনের মধ্যে পাল্টে যাননি খায়রুল আনোয়ার মুকুল। নীতি, নৈতিকতা আর মূল্যবোধ ধরে রাখার জন্য মাশুল দিতে হয়েছে তাঁকে; কিন্তু বদল হয়নি তাঁর জীবনের অভিমুখ।
সময় মানুষকে বদলে দেয়। এখন সন্ধ্যামালতী ভেবে বীজ পুঁতে বড় হবার পর দেখি ডানা মেলেছে পাতাবাহার। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা চমকে ওঠার বাইরে সেই একইরকম রয়ে গেছে কালের পরিক্রমায়। আজও নিঃশব্দে কত কী শিখি তাঁর কাছ থেকে! আকাঙ্ক্ষার পরিসীমা কমিয়ে আনা, পরিমিতিবোধের শিক্ষা আজও ঝালিয়ে নেওয়া যায় তাঁর জীবনাচরণ থেকে। মুকুল ভাই কখনোই কিছু শেখান না। শেখানোর স্কুল খুলে বসেননি কোনোদিন। জীবনের বিপরীত স্রোতে তাঁর সাঁতার। হয়তো সেখানেও সঙ্গীহীন তিনি। কিন্তু কখনোই হারিয়ে যান না ঢেউয়ের আঘাতে। এখন জানি, নিজেকে হারাতে না দেওয়ার লড়াইটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ জীবনে। এটুকু অর্জন করতে নিজেকে অবিরাম সংগ্রাম করতে হয় নিজের সঙ্গেই। সেই পথটাই বেছে নিয়েছেন মুকুল ভাই। জীবন যখন অন্ধকারে তলিয়ে যেতে চায়, ক্লান্তি এসে ভর করে, হাত ছুটে যেতে চায় অবলম্বন থেকে তখন জোনাকি পোকার মতো আলো জ্বেলে থাকেন তিনি। অগ্রজের মতো স্নেহে নতুন পথের নিশানা ঠিক করে দেন।
মুকুল ভাই দীর্ঘসময় দৈনিক কাগজের রিপোর্টার ছিলেন। টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদের প্রধান কর্তা ছিলেন। পেশার সেই কলরোল থেকে সরে এসেছেন এখন। একটা সময়ে আমাদের নিয়মিত আড্ডার জায়গা ছিল ম্যারিয়েটা নামের সেই বইয়ের দোকানে। সেখানেই তাঁর বন্ধু সৈয়দ শহীদের সঙ্গে আমার পরিচয়। আজও প্রচুর বই পড়েন মুকুল ভাই। গান শোনেন। সত্তরের কাছাকাছি বয়সেও তাঁর স্মৃতিশক্তির ধার তুমুল। আমাদের নিত্যদিনের রোজনামচায় একদা শোনা রেডিও নাটক থেকে শুরু করে বহুকাল আগে পাঠ করা বই, ফেলে আসা আমাদের উত্তাল দিন, বর্তমান রাজনীতি, সমাজ, সাংবাদিকতার হালচাল, পাল্টে যাওয়া মানুষ– বিচিত্র সব বিষয় প্রবল হয়ে থাকে। এই অবিরাম আলাপের ভেতর দিয়ে তাঁর ভাবনা, জীবনবোধ ফুটে ওঠে। সহজ জীবনযাপনের পরিচয়টুকু স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়, যা আজও ধরিয়ে দেয় ভালো-মন্দের তফাত।
একেকজন মানুষ একেকভাবে আলো ফেলেন জীবনের ওপর। কিন্তু তাঁর সেই নিজস্ব আলোর অবিরাম প্রবাহ অন্য কেউ ভাগ করে নেয়। কারণ সে আলো অর্থ বহন করে। সমাজ বিকশিত হয়, ক্ষয় হয় মূল্যবোধের ধারণা, নীতি অথবা সম্পর্ক। অস্থির এক সময় বয়ে চলেছে আমাদের চারপাশে। সেখানে আদর্শিক মানুষের অনড় অবস্থান ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠেছে। আমরা পরমাণুকে বিভক্ত করে ফেলার বিদ্যা হয়তো আয়ত্ত করতে পেরেছি সহজে, কিন্তু মানুষ জড়ো করতে ভুলে গেছি। জীবনের এই নিঃসঙ্গ প্রবাহের ভেতরে মৃদু এবং ব্যক্তি পর্যায়ে হলেও আলো ছড়ানো মানুষদের সঙ্গে বসবাস করতে ভুলে গেছি।
- বিষয় :
- গল্প
