লেখার জীবন সময়ের ভূপ্রকৃতি
শিল্পকর্ম :: সফিউদ্দিন আহমেদ
ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিরোনাম থেকে যে প্রশ্নটি উঠতে পারে তা এ রকম : লেখার কি স্বতন্ত্র, এমনকি স্বয়ম্ভু জীবন থাকতে পারে স্বাধীন, লেখক-নিরপেক্ষ?
জবাবটা এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। লেখক, যিনি লিখছেন আর তাঁর হয়ে-ওঠা লেখাকে আলাদা করা মুশকিল। তারপরও যদি বলি, লেখা নিজস্ব গতিপথ মেনে চলে, বিস্তর বাঁকবদল সত্ত্বেও সে তার পথ ধরে এগোতে চায়, তাহলে লেখক কি এই পথচলার বাহনমাত্র? যদিও একজন লেখক ও তাঁর রচনার মধ্যে যে সম্পর্ক তা গভীর আত্মগত সংযোগের, কিন্তু শেষ শব্দটি লেখা হয়ে যাওয়ার পর কী ঘটে? তখনও কি লেখাটি লেখকের অধীনে থাকে, নাকি একটি নিজস্ব জীবন লাভ করে– পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও ব্যাখায়?
এ কোনো দার্শনিক প্রশ্ন নয়, এটি একজন লেখকের অস্তিত্বের মর্মমূলে প্রোথিত বাস্তবতা। লেখক তাঁর কল্পনাকে উজাড় করে একটি জগৎ নির্মাণ করেন, সেখানে মানুষ থাকে, তাদের নানাবিধ চালচলন থাকে, সেই সাথে ভূগোল, ইতিহাস, প্রকৃতি থাকে, সময় তো থাকেই। তবে লেখকের বয়ান যখন পাঠকের কাছে পৌঁছায়, তখন সেটি প্রায় অপ্রত্যাশিত পথে বাঁক ফেরাতে পারে। ভেঙে বললে, একজন লেখক সাধারণত একটি অভিপ্রায় নিয়ে লিখতে বসেন। তা হতে পারে কোনো বার্তা (আজকের লেখালিখিতে বার্তা কথাটা স্থূল, বরং প্রশ্ন বা ডিসকোর্স বলাই সংগত) পৌঁছানো, কিংবা এক বা একাধিক চরিত্রের গতিপথ আঁকতে গিয়ে সেই বার্তা/প্রশ্ন/ডিসকোর্সকে বুনে দেওয়া। তিনি চান ভাষা, আঙ্গিক ও শৈল্পিক দক্ষতায় তার অভিপ্রায় চরিতার্থ হবে। কিন্তু পাঠক কীভাবে নেবেন তার ওপর কি তার নিয়ন্ত্রণ থাকে? এই যে উপলব্ধি তা কখনও হতাশাজনক, আবার কখনও মুক্তিদায়কও হতে পারে। এখানেই লেখা তার সৃষ্টিকর্তা থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে। লেখার জীবন শুরু হয় যখন লেখক কলম ধরেন, তবে তা পূর্ণতা পায় পাঠকের কাছে পৌঁছে। যে গল্প লেখক তাঁর নিজের উপলব্ধিজাত কোনো জটিল, দুরূহ পরিস্থিতিতে লিখেছিলেন তা পাঠকের কাছে হয়ে যেতে পারে তার নিজের উপলব্ধি ও জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি।
ঠিক এখানে লেখার জীবন আলাদা। লেখা একটি বীজ যা লেখক বপন করেন, কিন্তু কোন মাটিতে তা পড়বে, কোন ঋতুতে অঙ্কুরিত হবে, আদৌ হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে পাঠকের অভ্যন্তরীণ জগৎ ও সময়ের বাস্তবতার ওপর। এ ছাড়া বীজটা যে কী, তা সব সময় তাঁর জানা থাকে না। ফলে অঙ্কুরোদ্গমের পরে গাছ কেমন হবে, কেমন ফল দেবে, কতদূর ছড়াবে তা তিনি আগেভাগে ঠিক করে দিতে পারেন না। এ এক স্বাধীন জীবন যা পাঠকের অনুভূতিতে শ্বাস নেয়, সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠে ও সমাজ-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে নতুন রূপ পায়। এভাবে লেখকের সৃষ্টি হয়েও লেখার নিজস্ব পথ ও জীবন রয়েছে যা বহুমাত্রিক পাঠ ও অর্থের মধ্য দিয়ে এগোয়, লেখকের সীমা অতিক্রম করে। তাই বলা হয়, লেখা থেকে যায় লেখকের মৃত্যুর পরেও।
এ গেল একদিক, যা বেশ সরলই। অন্যদিক থেকে দেখলে যা দাঁড়ায়– লেখক হয়তো লেখালিখির কোনো পর্যায়ে (হতে পারে শুরুর পর্যায়ে) সচেতন বা অসচেতনভাবে একটা গতিপথ মাথায় রেখে লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। তা হতে পারে যে কোনো বিষয়ে, আঙ্গিকে, প্রকরণে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল সেই গতিপথ ধরেই তিনি এগিয়েছেন। তিনি না চাইলেও তার লেখাই তাকে সে পথে পরিচালিত করছে। তার মানে এ পর্যায়ে তার লেখায় যে জীবন মূর্ত হয়েছে তাকে আঁকড়ে থাকাই হয়ে উঠছে তার কাজ। এই যে লেখার জীবন তা সময়ের ধারায় রূপান্তরিত হয়ে লেখকের সময়, পাঠকের সময় ও ঐতিহাসিক সময়কে তুলে ধরে ও ব্যাখ্যা করে। সময়ের সঙ্গে লেখার সম্পর্ক কেবল বর্তমানের নয়, স্মৃতিরও। বহু লেখা ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক স্মৃতিকে ধারণ করে ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, নির্বাসন বা ব্যক্তিগত দুঃখবোধ সবকিছুই সময়ের গর্ভ থেকে উঠে এসে নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়। সাহিত্য সে-অর্থে স্মৃতির সংরক্ষণাগার। ইতিহাস যেখানে ঘটনাকে নথিবদ্ধ করে, সাহিত্য সেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভয়, বিষণ্নতা ও নীরবতার ইতিহাসকে বুনে চলে।
লেখা কেবল মুদ্রিত পৃষ্ঠা নয়। এ এক চিন্তাসত্তা যা সময়ের গর্ভে জন্ম নিয়ে রূপ বদলাতে সক্ষম। লেখা তাই সময়ের সন্তান, একটি নির্দিষ্ট সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এর জন্ম এবং সময়ই পারে লেখার বয়ানকে বদলে দিতে। প্রতিটি সময়ের পাঠক তার নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে লেখাকে যাচাই করেন। অনেক লেখাই হয়তো তার সময়ে বা বিচারে গুরুত্বহীন, অথচ পরবর্তী সময়ে যা হয়ে উঠতে পারে যুগান্তকারী। এই দ্বিমুখী সম্পর্ক লেখাকে করে তোলে বহু সময়ের সন্তান যার জন্মকাল নির্দিষ্ট, কিন্তু জীবন বহমান। বিস্তর উদাহরণ মিলবে যাতে দেখা যাবে উন্নত লেখা কখনোই সময়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। সময় তাকে জন্ম দেয়, সময়ই তাকে নীরব করে, আবার সময়ই নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে। একটা লেখা পাঠককে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি পাঠকও লেখাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। পাঠের ভেতর দিয়ে পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা, সংকট, স্মৃতি ও সামাজিক আবহকে লেখার সঙ্গে মিলিয়ে নেন। সেদিক দিয়ে প্রতিটি পাঠ আসলে একেকটি নতুন সৃজন। যে উপন্যাস একজন পাঠকের কাছে প্রেমের আখ্যান, তা কারও কাছে হতে পারে রাজনৈতিক রূপক কিংবা অস্তিত্বসংকটের বয়ান। এই বহুমাত্রিকতার কারণে উন্নত সাহিত্য কখনও একরৈখিক থাকে না। লেখকের কলমে তার জন্ম হলেও পাঠকের বোধে তার বহুবার পুনর্জন্ম ঘটে। এই চক্র ঘিরেই লেখার জীবন।
এই চক্রে লেখক অনুপস্থিত। অন্যদিকে এ চক্রেই লেখার জীবনযাপন। সাহিত্যিক চিন্তায় সময় একটি মৌলিক উপাদান যা আখ্যানের গঠন, পাঠের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করে। লেখক এমন একজন মানুষ যিনি জগৎকে কৌতূহল, সহমর্মিতা ও মানব সংযোগের চেতনার মধ্য দিয়ে দেখেন। সময় তাঁর কাজের নেপথ্যে নয় বরং এক চালিকাশক্তি হয়ে থাকে। সে অর্থে লেখা হচ্ছে লেখক ও তাঁর সময়ের মধ্যকার আলাপ।
লেখার জীবন শুধু বিষয় বা ভাবনায় আটকে থাকে না, অনেক সময় লেখক যে ভাষা ব্যবহার করেন, লেখাটি সে ভাষাকেও অতিক্রম করে নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করে। শব্দ তখন কেবল অর্থ বহন করে না, বরং হয়ে ওঠে সামষ্টিক স্মৃতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আবহ ও সেই সাথে সময়ের অপ্রকাশিত-রুদ্ধ অনুভবের ধারক। ফলে একটি লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে নতুন ভাষিক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। এ কথা রোলাঁ বার্ত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ডেথ অব দ্য অথর’-এ খানিকটা অন্যভাবে বলেছেন– কোনো লেখার অর্থ লেখকের ব্যক্তিগত অভিপ্রায় দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় না। এর মূলে কাজে করে পাঠকের অভিজ্ঞতা, ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও কালপ্রবাহের বিবর্তন। রুশ তাত্ত্বিক বাখতিন সাহিত্যকে দেখেছেন বহুস্বরিক বা dialogic একটি ক্ষেত্র হিসেবে। তাঁর মতে লেখায়, বিশেষত উপন্যাসে কখনও একক কণ্ঠ কাজ করে না– বহু কণ্ঠ, বহু অভিজ্ঞতা ও বহু সামাজিক অবস্থানের সংঘাতে অর্থ তৈরি হয়। যে কারণে কোনো সাহিত্যকর্ম একটি চূড়ান্ত সত্য প্রতিষ্ঠা করে না, বরং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সহাবস্থান ঘটায়। এ প্রসঙ্গে মিশেল ফুকোকেও স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, ভাষা ও জ্ঞানের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক সক্রিয়। ফলে একটা লেখা কেবল সাহিত্যিক অভিব্যক্তি নয় বরং একটি সময়ের জ্ঞান, ক্ষমতা ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলনও বটে। এদিক থেকে দেখলে বোঝা যাবে কেন একই সাহিত্যকর্ম সময়প্রবাহে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে বিশেষায়িত হয়ে ওঠে।
২
একটি লেখা কেবল তার শব্দ-প্রতিমা নিয়ে বাঁচে না। এর মধ্যে থাকতে হয় সময়চেতনা– যে সময়ের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণাবোধ, আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে রূপ দেয়। লেখক সেই সময়ের সন্তান, তাঁর উপলব্ধি, ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি তিনি যে বার্তা বা ডিসকোর্স তুলে ধরেন তাও সময়ের ছাঁচে গড়া। যেমন– ঊনবিংশ শতকের বাস্তববাদী উপন্যাসগুলোতে আমরা যে সমাজ-চেতনোর প্রতিফলন দেখি তা বিশ শতকের অস্তিত্ববাদী সাহিত্যে পাওয়া যায় না। আবার উত্তরাধুনিক কালের সংকট ও বিভ্রান্তি যে লেখাকে রূপ দেয় তার অনুধাবন পূর্ববর্তী সময়ের পাঠকের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ।
আগেই বলা হয়েছে, সময় কেবল লেখার জন্মদাতাই নয়, লেখার জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণকারীও। সে কারণে একটি লেখা এক সময়ে যে প্রতিক্রিয়া পায়, অন্য সময়ে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হতে পারে। এমিলি ডিকেনসনের কবিতা বা কাফ্কার গল্প-উপন্যাস বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখালিখির জীবনীশক্তি সময়কে অতিক্রম করে চলেছে।
লেখার জীবনের উৎস লেখকের কল্পনা ও অভিজ্ঞতার মিলনস্থলে হলেও তার গতি, মোড় ও বিস্তার নির্ধারিত হয় সময়ের ভূপ্রকৃতির দ্বারা। কখনও রাজনীতি, কখনও সামাজিক আন্দোলন বা প্রযুক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে তা প্রভাবিত হয়। একটি নিরীহ কবিতা বা গল্প কোনো এক সময় বিশেষ তাৎপর্য পেতে পারে যখন সেই সময়ের প্রেক্ষাপট তার নতুন পাঠ তৈরি করে দেয়। খানিকটা গভীরে গেলে দেখা যাবে, সময় শুধু লেখার গ্রহণযোগ্যতাকেই নয়, ব্যাখ্যাকেও পুনর্নির্মাণ করে। একজন পাঠক যখন কোনো লেখা পড়েন, তিনি নিজের সময়, বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে তাকে ধরার চেষ্টা করেন। হোমারের ইলিয়াড প্রাচীন গ্রিকদের কাছে ছিল মহাকাব্যিক বীরত্বের প্রতিচ্ছবি; আধুনিক পাঠকের চোখে তা হতে পারে যুদ্ধনির্ভর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতীক। দান্তের দ্য ডিভাইন কমেডি শুধু একটি ধর্মীয় কাব্য নয়, এটি মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় বিশ্বাস কাঠামোরও প্রতীক। ইনফারনো, পারগেটোরিও ও প্যারাডিসো– এই তিনটি স্তরের মধ্য দিয়ে দান্তে কেবল আত্মার যাত্রাই চিত্রিত করেননি, বরং সময়ের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও দার্শনিক দ্বন্দ্বকেও তুলে ধরেছেন। অথচ একই কবিতা আজকের পাঠকের কাছে হয়ে ওঠে নৈতিক অনুসন্ধান বা ব্যক্তিগত মোক্ষলাভের প্রতীক। শেকসপিয়ারের নাটকগুলো (ডার্ক কমেডিসহ) এলিজাবেথীয় ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও মানব প্রকৃতির জটিলতা থেকে অনুপ্রাণিত। হ্যামলেট সে সময় ছিল রাজনীতি ও বিশ্বাসঘাতকতার নাটক, কিন্তু আজ তা টু বি অর নট টু বি শুধু একটি নাটকীয় সংলাপ নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব সংকটের সোচ্চার প্রতিধ্বনি। অন্যদিকে ‘মেজার ফর মেজার’ আজকের দিনে বহুল প্রচারিত যৌন হয়রানিই শুধু নয়, মানবমনের নানা গূঢ় প্রবণতার দিকে আমাদের মনোযোগী করে। আধুনিক কালে জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটিফোর একটি কালজয়ী রচনার উদাহরণ, যা প্রতিটি যুগে নতুন অর্থ ধারণ করে। একই কথা প্রযোজ্য অ্যালডাস হাক্সলির ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড নিয়ে। যত সময় যাচ্ছে, মনে হচ্ছে উপন্যাস দুটি আমাদের সময়কেই ছেনে তুলছে। চিনুয়া আচেবের থিংস ফল এপার্ট আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সংস্কৃতি ধ্বংসের এক বেদনাবিধুর আখ্যান। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হলেও এ উপন্যাসের জীবন সময়ের স্রোতে আরও বিকশিত হয়েছে– বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন ও বিকল্প ইতিহাস খোঁজার চেষ্টার অংশ হিসেবে। মার্গারেট অ্যাটউডের দ্য হ্যান্ডমেইডস টেইল ১৯৮৫ সালে নারীবাদী ডিস্টোপিয়া হিসেবে ধর্মতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বয়ান করলেও বর্তমান নারী অধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি ভিন্নভাবে পাঠ করা হচ্ছে– নারীর শরীর নিয়ে রাজনীতি, আইনি অধিকার ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি রচনা প্রথমে বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে যেমন স্বদেশি আন্দোলনের একগুঁয়ে ভাবধারার সমালোচনা, নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়আশয় তৎকালীন অনেক পাঠকের কাছে ছিল অস্বস্তিকর। আজ অবশ্য এ উপন্যাসকে আধুনিকতা, নারীবাদ ও রাজনৈতিক দ্বিধা-সংকটের এক যুগান্তকারী পাঠ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার আধুনিক, বিমূর্ত ও আত্মসন্ধানী কাব্যভাষা তাঁর জীবদ্দশায় অনেকের কাছে (গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কাছেও) দুর্বোধ্য, এমনকি অর্থহীন মনে হয়েছিল। সময়ের বিবর্তনে আজ তাঁর কবিতা পাঠ করা হয় নাগরিক বিষণ্নতা, অস্তিত্বসংকট ও নিঃসঙ্গতার অভিঘাত রূপে।
৩
এ তো গেল ‘লেখার সময়’, কথাটা ঘুরিয়ে ‘সময়ের লেখা’ বললে একটা ভিন্ন চিত্র কি পাওয়া যাবে না? উপরে যা বলা হলো তা-সময় কেন লেখার জীবনে জরুরি? এবার যদি প্রশ্ন তোলা যায়–লেখা কেন সময়ের বাহন হওয়ার জন্য জরুরি, কিছু কি তফাত ঘটবে? চার্লস ডিকেন্স যখন উপন্যাসের সূচনাতে ঘোষণা করেন : ইট ওয়াজ দ্য বেস্ট অব টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওয়ার্স্ট অব টাইমস, তখন তাঁর অভিপ্রায়টি খোলাসা করে জানান যে, তিনি একই বিষয় নিয়ে ইউরোপের পাশাপাশি দুই শহরের (লন্ডন ও প্যারিস) একই সময়ের গল্প শোনাতে যাচ্ছেন। ‘আ টেইল অব টু সিটিজ’-এ ডিকেন্স সময়ের দুই বিপরীতমুখী প্রবাহকে দেখতে গিয়ে লন্ডন ও প্যারিসের চালচিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে আনন্দ ও বেদনা, সৃষ্টি ও ধ্বংস সহাবস্থানে রয়েছে। এখানে মূল বিষয় ইতিহাসকে সময়ের নিরিখে ধরা। লন্ডনে এমন এক সমাজ চিত্রিত হয়েছে যা নিখুঁত না হলেও অনেক চরিত্রের জন্য আপেক্ষিকভাবে স্বস্তিকর। অপরদিকে প্যারিস হচ্ছে সহিংসতা, দারিদ্র্য ও অস্থিরতায় নিমজ্জমান এক শহর যা বিপ্লব ও বৈষম্যের বিধ্বংসী পরিণতির প্রতিচ্ছবি। যদিও উপন্যাসের একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সূচনা-বাক্যটি লেখা হয়েছে, এটি সর্বকালীন সত্য হয়ে উঠেছে, অর্থাৎ যে পরিস্থিতিতে বিপরীত অভিজ্ঞতা বা শক্তি কাজ করে, সেখানে এটি প্রয়োজ্য। সময়ের বাহন হিসেবে লেখার জীবন-ইতিহাস দীর্ঘ।
সময় নিয়ে টি এস এলিয়ট ফোর কোয়ের্টেটস-এর চারটি আন্তঃসংযুক্ত কবিতায় তাঁর দার্শনিক উপলব্ধি খুঁটিয়ে দেখেছেন। প্রথম কবিতায় (বার্নট নরটন) সময়কে চক্রাকার ভাবনায় উপস্থাপন করেছেন। অতীত ও বর্তমান উভয়ই ভবিষ্যতের দ্বারা পরিবেষ্টিত, এমন ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন সময়কে বিমূর্ত ধারণা হিসেবে দেখা যাবে না, এটি মানুষের অস্তিত্বের অপরিহার্য ভিত্তি। তৃতীয় কবিতা ড্রাই সালভেজেস-এ সময়কে তিনি এক জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা বলে বিবেচনা করেছেন। নদী ও সমুদ্রের চিত্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্যকার সময়ের প্রবাহ তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি দুই ধরনের সময়ের পার্থক্যের কথা বলেন– মানুষের ব্যক্তিগত, অভ্যন্তরীণ সময় এবং প্রকৃতির বাহ্যিক, ধারাবাহিক সময়। ফোর কোরের্টেটসের চারটি কবিতার সারকথা– সময়ের অভিজ্ঞতাই একমাত্র বাস্তবতা, শুধু সময়ের মধ্য দিয়েই সময়কে জয় করা যায়।
সুতরাং সময় যেভাবেই আসুক– ‘লেখার সময়’ বা ‘সময়ের লেখা’ হিসেবে তা লেখার সঞ্জীবনী শক্তি। তবে কথা থাকে, সময় কখনও সরলরৈখিক, কখনও খণ্ডিত, কখনও চক্রাকারে আবর্তিত। সেই সাথে রয়েছে ব্যক্তির নিজের সময়, সমাজের সময়, ঐতিহাসিক সময় যা কখনও আলাদা, কখনও পরস্পর-সন্নিহিত, কখনও জটপাকানো। ফলে সময় বলতে অসময়, দুঃসময় মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বই কিছু নয়। এসব নিয়েই লেখার শাখা-প্রশাখাময় অসীম জীবন।
- বিষয় :
- গল্প
