অবিরাম জোনাকি প্রবাহ
আমার আকাশে ধ্রুবতারা যারা
প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
হরিশংকর জলদাস
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রত্যেক মানুষের একটা করে নিজস্ব নদী আছে। ফুলও আছে এক-দুইটা, নিজের করে। প্রত্যেকের নিজের করে গানও আছে– দু’একটা। তেমনি প্রতিপ্রত্যেকের আকাশও আছে। সবার আকাশে ধ্রুবতারা আছে। কারও আকাশে কম, কারওবা বেশি। সব ধ্রুবতারা সমানে জ্বলজ্বল করে না। কোনো ধ্রুবতারার গায়ে ফকফকা জোছনা, কোনোটাতে জোনাকির মিটিমিটি আলো।
আমারও নিজের করে একটা আকাশ আছে। সেখানে আছে ধ্রুবতারাও। আমার কাছে সেই ধ্রুবতারার আলো পূর্ণ চাঁদের, অন্যের কাছে হয়তো তা মাটির প্রদীপের।
আজ এই লেখায় যে দু’চারজন মানুষের কথা লিখতে বসেছি, তারা অন্যের কাছে অতি নগণ্য; কিন্তু আমার জীবনে ধ্রুবতারা। এই যে আজকের আমি, সেই আমিকে নির্মাণ করেছেন তারা।
পরানেশ্বরী জলদাসী। আমার নির্মাতৃ। ঠাকুরদি তিনি আমার। আমার বাবার অভাবী সংসারে জ্বলন্ত জোনাকি। মা শুকতারা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, কিন্তু আমি লালিত হয়েছি ঠাকুরদির কোলে। ১৯ বছর বয়সে বিধবা হয়েছেন। আট কি নয় বছর বয়সে স্বামী চন্দ্রমণির ঘর করতে এসেছিলেন। শহরের মেয়ে। অজগাঁ উত্তর পতেঙ্গায় এসে শহুরেপনা বিসর্জন দিয়ে ২২ বছরের চন্দ্রমণিকে জীবনের গন্তব্য করে নিয়েছিলেন। বেশ কটি বছর কেটে গিয়েছিল সুখে-স্বস্তিতে। পরানেশ্বরী দুই সন্তানের জননী হয়েছেন। মেয়ে যশোদা, ছেলে যুধিষ্ঠির। পিতা রামচন্দ্রের একমাত্র পুত্রসন্তান চন্দ্রমণি। বঙ্গোপসাগরই তাঁর ঠিকানা। সাগরের জলশস্যে সংসার চলে। একদিন সুযোগ এলো জলচর থেকে স্থলচর হওয়ার। বার্মা অয়েল কোম্পানিতে সুইপারের চাকরি জুটল। এর মধ্যে যশোদা মারা গেল। পুত্র যুধিষ্ঠিরকে বুকের আরও কাছে টেনে নিলেন পরানেশ্বরী।
চন্দ্রমণির রক্তে বঙ্গোপসাগরের নোনাজলের কল্লোল। সারাক্ষণ কানের কাছে ডাক পাড়ে– আয় আয়। নীল জলের আহ্বানকে অস্বীকার করেন কী করে চন্দ্রমণি? সুযোগ এলো নীল সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার। তিন মাসের জন্য মাছ মারতে যাবেন। গহিন সমুদ্রে। বিশাল বড় কাঠের নৌকা। মাঝিমাল্লা আটজন। স্থলজীবনের চাকরিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নৌকায় গিয়ে উঠলেন চন্দ্রমণি। বুড়ো বাপের আহাজারি, রূপসী স্ত্রীর কাকুতি, আড়াই বছর বয়সের পুত্র যুধিষ্ঠিরের কচি মুখ– কোনোটিই ফেরাতে পারল না চন্দ্রমণিকে।
বঙ্গপোসাগরের নীল জলই চন্দ্রমণিকে খেল। আশ্বিনের ঝড়ে নৌকা ডুবল। বেবান সমুদ্রে ওদের বাঁচাবার কেউ ছিল না। অন্য সবার সঙ্গে চন্দ্রমণিরও সলিল সমাধি হয়েছিল। আটটি মৃতদেহ কোথায় যে ভেসে গিয়েছিল, কে জানে!
পরানেশ্বরীর যুদ্ধজীবন শুরু এখান থেকেই। রূপসী নারী। কোনোদিন পাড়ার বাইরে পা রাখেননি। কী করবেন তিনি, এখন! ঘরে বৃদ্ধ শ্বশুর আর আড়াই বছরের শিশু যুধিষ্ঠির। খাবেন কী? পুত্র-শ্বশুরকে খাওয়াবেন কী? চন্দ্রমণির আয়েই যে সংসার চলত! নিঃস্ব, নিরুপায় পরানেশ্বরী মাথায় লইট্যা মাছের খাড়াং (টুকরি) তুলে নিলেন। সমুদ্রকিনারা থেকে বহদ্দারদের নৌকা থেকে মাছ কিনে হিন্দু-মুসলমান পাড়ায় বেচতে আরম্ব করলেন। পরনের ধুতির একপ্রান্তকে বিড়া বানিয়ে তার ওপর বড় চৌকো একটি তক্তা বসিয়ে, ওপরে মাছের খাড়াং বসিয়ে গলি-গলিতে হাঁক পাড়তে শুরু করলেন পরানেশ্বরী– ‘মাছ লইবা না মাছ? তাজা লইট্যা মাছ?’
সেই ১৯ বছর বয়স থেকে আমার জন্মাবধি পরানেশ্বরীর সেই হাঁক থামেনি। ইত্যবসরে যুধিষ্ঠিরকে বিয়ে করিয়েছেন। আমি জন্মেছি, শ্বশুর রামচন্দ্র মারা গেছেন। যুধিষ্ঠির আয়সক্ষম হয়েছেন। তারপরও পরানেশ্বরীর হাটে-বাজারে, পাড়ায় পাড়ায় মাছ বেচা থামেনি। অভাব যে ওই পরিবারকে ছেড়ে যায়নি কখনও! সন্তান উৎপাদনে বাবা অনাধুনিক ছিলেন। এর মধ্যে আমার আরও কজন ভাইবোন জন্মে গেছে।
যাক, আমার নির্মাতৃর কথা বলি। পরানেশ্বরীকে আমি ‘বদ্দা’ বলে ডাকতাম। বড়দার অপভ্রংশ বদ্দা। আমার কোনো বড় দাদা ছিল না। তাই বোধহয় ছোটবেলা থেকে ঠাকুরদিকে বদ্দা ডাকতে শিখিয়েছিলেন, আমার মা-বাবা।
স্তন্যপান ত্যাগ করার পর থেকেই বদ্দার বিছানায় বদ্দার সঙ্গেই শুতে শুরু করেছি আমি। তাঁর মেছো গন্ধভরা আঁচলটি আমার গায়ের ওপর ছড়িয়ে না দিলে ঘুম আসত না আমার।
বয়স আড়াই-তিন হলে বদ্দার সঙ্গে যাওয়ার আবদার শুরু হলো আমার। তিনি যে মাথায় খাড়াং নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মাছ বেচতে যান, সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যেতে হবে। বদ্দা যতই বোঝান, হিন্দু-মুসলিম পাড়াগুলো অনেক দূরে দূরে রে ভাই। কত যে অলিগলি ওই পাড়াগুলোর! অতটা পথ তুই হাঁটতে পারবি না ভাই। ঠাকুরদি যতই বলেন ততই আমার গোঁ বাড়ে– যাবই যাব। পরে স্নেহের কাছে হার মানেন বদ্দা।
এরপর গলিতে গলিতে, বাড়িগুলোর ঘাটার আগায় আগায় ঠাকুরদি হাঁক পাড়েন– মাছ লইবা না মাছ? আমি পাছে পাছে হাঁটি। এই যে সঙ্গে যাওয়া বদ্দার, এক-দুবারে শেষ হয়ে যায়নি। বহুবার গেছি। শেষের দিকে এমন হয়েছে, বদ্দার সঙ্গে আমিও সুর মিলিয়ে হাঁক দিয়েছি– ‘মাছ লইবা না মাছ? তাজা লইট্যা মাছ? চিক্কা ইঁচা– ?’ ঠাকুরদির ভরাট গলার সঙ্গে আমার মিহি কণ্ঠস্বর শুনে অনেক নারী কৌতূহলী হয়েছে। জিজ্ঞেস করেছে, ‘ছেলেটি কে?’
ঠাকুরদি মাথা নিচু করে বলেছে– ‘আঁর নাতি। কোনো রকমে বাড়িত রাখি আইত নো– পারি। লগে লগে আইবই আইব।’
বলে সমানে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে গেছেন ঠাকুরদি। ঠাকুরদি পরানেশ্বরীর কাছেই আমার সকল আবদার-অনুরোধ। যখন যা চেয়েছি, ক্ষমতার বাইরে হলেও কেমন করে যেন আমাকে এনে দিয়েছেন। সে কাঠের খড়ম হোক বা লেবেনচুস। ঘুড়ি হোক বা নাটাই-সুতা। রাতে বদ্দার পাশে না শুলে ঘুম আসত না। যখন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি, তখনও এই ষাটোর্ধ্ব নারীটির পাশে শুলেই আমার দু’চোখ জুড়ে নিদ্রা নেমে আসত। সংসারের লোকসংখ্যা তখন এগারো। বাবার একার পক্ষে সংসারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। ঠাকুরদিকে তখনও পাড়ায়-হাটে মাছ বিক্রি করে যেতে হচ্ছে। সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলাতেই। কখনও এমন ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন যে কোনো রকমে হাতমুখ ধুয়ে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়তেন। যেদিন মন ও শরীর একটু ভালো থাকত, বলতেন– ‘আমার গা থেকে মাছের কী বদবুরে ভাই! তুই বড় হয়েছিস, এখন তুই আলাদা করে থাক না রে ভাই!’
বদ্দা যতই বলুন, আমি নাছোড়। পরনের কাপড়ে ফোঁটায় ফোঁটায় মাছের পানি পড়ে গোটা কাপড়টা মেছোগন্ধতে ভরিয়ে তুলেছে। শরীর থেকে মহাভারতের মৎস্যগন্ধার মতো ভুরভুর করে মাছের গন্ধ বেরোচ্ছে। তাতে কী? মহিলাটি যে আমার ত্রিভুবন, আমার স্নেহ-আশ্রয়। জড়িয়ে ধরে বলেছি, ‘ওইসব দুর্গন্ধে আমার কিছু আসে যায় না বদ্দা।’ স্বামীহারা এই নারীটির বুকে সংসার যাতনার কত বড় জগদ্দল পাথর চেপে আছে তখন, তা ভুলে শব্দ করে হেসে উঠে বলতেন, ‘তোরে লই আর নো পাইরলাম!’
পতেঙ্গা বোর্ড সরকারি প্রাইমারি স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দেবে সেদিন। আমি তখন ফাইভে। পাস করলে হাই স্কুলে যাব। রেজাল্টের কথা মা-বাবার খেয়াল নেই। রেজাল্ট দেওয়ার ঠিক আগে আগে বদ্দা স্কুল চত্বরে উপস্থিত হয়েছেন। জটলা থেকে একটু দূরে বসে আছেন। পাশে মাছের খাড়াং, তক্তা। সকালে মাছ বেচতে বেরিয়েছিলেন। বেচা শেষে স্কুলে এসেছেন। আজ যে রেজাল্ট দেবে রাতে ঠাকুরদিকে বলেছিলাম। ক্লান্তি-অবসন্নতার মধ্যেও সেকথা মনে রেখেছেন বদ্দা। ভদ্রলোকদের জটলার মধ্যে গিয়ে দাঁড়াননি তিনি। জানেন, রেজাল্টপ্রত্যাশী ওই অভিভাবকদের মনে একজন জেলেনির জন্য কী প্রচণ্ড ঘৃণা। অন্য কেউ তেমন খেয়াল না করলেও আমি খেয়াল করেছি চোখেমুখে কী উদ্বিগ্নতা নিয়ে অপেক্ষা করছেন তিনি। ফল প্রকাশের পর বদ্দার কাছে এসে যখন বলেছি, ‘বদ্দা, আমি ফার্স্ট হয়েছি।’ বদ্দা বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, ‘তুই পাস কইয্যসনি হিয়ান ক। ফাস্ট টাস্ট ন বুঝি।’
এই আমার ঠাকুরদি, এই-ই আমার নিমার্তৃ। মাঝে মাঝে তাঁকে মায়ের চেয়েও বড় বলে মনে হতো আমার। মা শুধু জন্ম দিয়েছেন আমায়, আমার লালনপালন ভরণ-পোষণ সবই আমার ঠাকুরদিই করেছেন। মা লেখাপড়া জানতেন না, ঠাকুরদিও। বাবা কিছুটা পড়েছিলেন। হাইস্কুলে ভর্তি হবার পর একজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হতো আমায়। তিনি মিলনকান্তি সরকার। অঙ্ক, ইংরেজি পড়তাম তাঁর কাছে। রাতের বেলা। গ্রুপে পড়াতেন। হিন্দুপাড়াটি আমাদের জেলেপাড়া থেকে বেশ দূরে। মাইল-দেড় মাইল। হিন্দুপাড়া থেকে জেলেপাড়ার রাস্তাটি মেটে। দুইপাশে ঝোপঝাড়, গাছপালা। সেখানে সাপখোপ-বেজি-গুইসাপ-শেয়াল। ঘুটঘুটে অন্ধকার তো আছেই। ছুটি হতে হতে প্রায় রাত ৯টা বেজে যেত। ঠাকুরদি হাতে হারিকেন নিয়ে স্যারের দাওয়া থেকে একটু দূরে অপেক্ষা করে থাকতেন। ছুটি হলে নাতিটিকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন বলে। আষাঢ়-শ্রাবণের ঘোর বর্ষা যখন, তখন মাথায় মাথাল দিয়ে মৃদু আলোর হারিকেনটা হাতে নিয়ে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বদ্দা। বর্ষা-বাদল তাঁর কাছে কিছুই না। তাঁর প্রাণের ধন যে হরিশংকর নামের নাতিটি। আমার মা শুকতারা আর ঠাকুরদি পরানেশ্বরীকে একসঙ্গে স্মরণ করতে গেলে প্রথমেই আমার ঠাকুরদির কথা মনে পড়ে। আমার কাছে ঠাকুরদি যে মায়ের বাড়া। এই যে আমার জীবনের সোপানগুলো তৈরি হলো, তার প্রথম সোপানটি তৈরি করে দিয়েছেন আমার ঠাকুরদি পরানেশ্বরী। তাঁর সান্নিধ্যে, তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা না পেলে আমি কখনও আলোর পথের যাত্রী হতে পারতাম না। পাঠক যারা, তাদের কাছে এই জেলে নারীটি একেবারেই অপাঙ্ক্তেয়, কিন্তু আমার কাছে আরাধ্য দেবী।
লেখার শুরুতে দু’চারজনের কথা লিখব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু স্থানের অভাবে আমি মাত্র আরেকজনের কথা লিখে লেখাটার ইতি টানব।
আমার জীবনে দ্বিতীয় জোনাকি আলোটির নাম ধ্রুবব্রত চক্রবর্তী। তিনি পতেঙ্গা হাই স্কুলের প্রথম হেডমাস্টার। ফাইভ পাস করে ঘরে বসে আছি। বাবার ধারণা– জেলে সমাজে ফাইভ পাস বিশাল এক ব্যাপার। হরিশংকর সুর করে রামায়ণ-মহাভারত পড়তে পারে, মনসাপুঁথি পাঠের আসরে মনসাপুঁথি পড়তে পারে। এরপরে আর কী চাই? আমার মনে যে আরও পড়ার আগ্রহ, বাবাকে বলি কী করে? হাই স্কুলে পড়তে গেলে যে অনেক টাকার দরকার। অভাব-ক্লিন্ন সংসারে ভরণপোষণ মিটিয়ে বড় ছেলের পড়ার বাড়তি খরচ মেটানোর টাকা কই বাবার হাতে? জানুয়ারিতেই হাই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এখন এপ্রিল মাস। বাবার সঙ্গে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই, বাজারে মাছও বেচতে যাই ঠাকুরদির সঙ্গে।
আমাদের গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল কয়েকটা। হাই স্কুল ছিল না একটাও। ১৯৬২-তে হাই স্কুল হলো– পতেঙ্গা হাই স্কুল।
একদিন সন্ধ্যাবেলা উঠানের চুলায় মা ভাত-তরকারি রাঁধছেন। আমি, বাবা, ঠাকুরদি এবং অন্য ভাইবোনেরা চুলা ঘিরে বসে আছি। ওখানটায় আমাদের পারিবারিক আড্ডাখানা। হঠাৎ ঘাটার আগা থেকে ভেসে এলো– যুধিষ্ঠির বাবু বাড়ি আছেন নাকি? কী রকম অদ্ভুত সুরেলা সুন্দর কণ্ঠস্বর– যে যুধিষ্ঠিরকে লোকে তুচ্ছ ‘জুষ্টি’ বলে ডাকে, তাকে একবারে যুধিষ্ঠির বাবু বলে ডাকছেন!
ডাকতে ডাকতে বেশ কয়েকজন লোক আমাদের উঠানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সেই সন্ধ্যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, আরেকজন ভদ্রগোছের লোক, পরে জেনেছি তিনি পতেঙ্গা হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। এবং বিশেষভাবে উল্লিখিত যিনি, তিনি ধ্রুবব্রত চত্রবর্তী। পতেঙ্গা হাই স্কুলের হেডমাস্টার।
সেদিন ধ্রুবব্রত চক্রবর্তী বাবাকে বলেছিলেন, ‘হরিশংকরকে স্কুলে পাঠাননি কেন?’ আমার নাম আগেভাগে জেনশুনেই তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।
বাবা যতই অভাব ইত্যাদির কথা বলেন, হেডস্যার ততই বলেন, ‘হরিশংকরকে আমার স্কুলে দরকার।’
বাবা আরও কিছু কথা বলে গেলেন, সবই আমাকে আর পড়ানোর দরকার নাই-এর পক্ষে। মনোযোগ দিয়ে বাবার সব কথা সেই সন্ধ্যায় শুনে গিয়েছিলেন ধ্রুবব্রত চক্রবর্তী।
শেষে বলেছিলেন, ‘কাল হরিশংকরকে নিয়ে স্কুলে আসেন। পরেরটুকু আমি দেখছি।’
পরদিন বাবা আমাকে নিয়ে স্কুলে গেছিলেন। ধ্রুব স্যার আমাকে সিক্সে ভর্তি করিয়ে নিয়েছিলেন। ভর্তি বাবদ একটি টাকাও নেননি। আমাদের ঘরদোরের জরাজীর্ণ অবস্থা, পরিবারবর্গের পরিধেয়ের মান দেখে তিনি হয়তো বাবার আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপারটা অনুমান করে নিয়েছিলেন।
তারপর ধ্রুবব্রত চক্রবর্তী নামের এই লোকটি মৃত্যু পর্যন্ত আমার সামনে সামনে আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে হেঁটে গেছেন। পতেঙ্গা হাই স্কুল থেকে সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিতাড়িত হয়ে অন্য স্কুলে চলে গেছেন, একসময় রিটায়ারমেন্টে গেছেন, আমি পড়াশোনা চুকিয়ে সরকারি কলেজে ঢুকেছি, বিয়ে করেছি, সন্তানদের বিয়ে দিয়েছি, তখনও আমার নির্মাতা ধ্রুববত চক্রবর্তী আমার জীবনে আলোর দিশারি হয়ে থেকেছেন।
হাই স্কুলজীবনে ফিরে যাই। ধ্রুব স্যার আমাকে ভর্তি করিয়েই ক্ষান্ত হননি। দু’চারটা বইও কিনে দিলেন। একজন অবহেলিত সমাজের ছেলেসন্তানের জন্য একজন ব্রাহ্মণের এ রকম ভালোবাসার গহনতা ও কারণ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।
অলৌকিকভাবে প্রায় ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে গেলাম আমি। ধ্রুব স্যার আমাকে গোটা বছরের টিউশন ফি ফ্রি করে দিলেন। একদিন তাঁর কক্ষে ডেকে ক্লাস সেভেনের সমস্ত বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ভালো করে পড়বি শংকর। তোকে অনেক বড় হতে হবে।’ ততদিনে তিনি আমাকে হরিশংকর থেকে শংকর এবং তুমি থেকে তুই বলতে শুরু করেছেন। হ্যাঁ, ভালো করে পড়েছিলাম আমি। ক্লাস টেন পর্যন্ত বারবার ফার্স্টই হয়েছি।
ধ্রুবতারা ধ্রুবব্রত যদি সেই জোছনামাখা সন্ধ্যায় তুলে এনে সিক্সে ভর্তি না করাতেন, কোথায় ভেসে যেতাম আমি। পাড়ার জগদীশ, ঠাকুর দাস, লালমোহন, সুধীর, বংশীমোহনের মতো আরেকজন মাছমারা হতাম। হরিশংকর জলদাস অন্য দশজন জলদাসের মধ্যে হারিয়ে যেত।
স্কুলড্রেস ছিল পাঞ্জাবি-পায়জামা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির পর বাবা একজোড়া সেলাই করিয়ে দিয়েছিলেন। ক্লাস এইট পর্যন্ত তা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কাপড়ের আর কী দোষ! তিন বছর ধরে কত আর অত্যাচার সহ্য করবে? এখানে ওখানে ছিঁড়তে আরম্ভ করেছে। সবচেয়ে বেহাল দশা পায়জামার। পায়ের দিকে ছিঁড়েফুঁড়ে একাকার। ঠিক ওই সময় একরাতে হেডস্যার আমাকে চট্টগ্রামের রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নিয়ে গেলেন। চত্বরে বিছানো চাটাইয়ে পাশাপাশি বসেছি। যোগাসন করে বসতে গিয়ে বারবার পায়জামার ছেঁড়া অংশটি দৃশ্যমান হচ্ছে। আমি আলোচনা শুনব কি, পায়জামার ছেঁড়া অংশ ঢেকে আমার লজ্জা গোপন করতে ব্যস্ত।
ধ্রুব স্যার আমার সেই লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টাটি হয়তো দেখে গিয়েছিলেন, নইলে কেন ফেরবার পথে দর্জির দোকানে নিয়ে আমার মাপজোখ করবেন? তিন দিন পর স্কুল ছুটি হলে পিয়ন দিয়ে নিজের রুমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। একটি কাপড়ের প্যাকেট এগিয়ে ধরে শুধু বলেছিলেন, ‘কাল থেকে পরে আসবি।’
বাড়িতে ফিরে নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি সামনে নিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলাম আমি। ভাঙাচোরা পথে এগোতে এগোতে এতদূর পথ যে আসতে পারলাম, তা এ রকম অসাধারণ মানুষদের স্নেহের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
আরও কতজনের কথা যে পড়ে থাকল! দাঙ্গার সময় আমাদের বাড়ি আক্রান্ত হলে যে আব্দুল গফুর বুক চিতিয়ে আমাদের রক্ষা করেছিলেন, তাঁর কথা না-বলা থেকে গেল। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় না খেয়ে মরার উপক্রম হলে যে মল্লিক সওদাগর বাকিতে চালডাল দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছিলেন, তাঁর কথা রয়ে গেল। আব্দুল গফুর, মল্লিক সওদাগর, নেপাল চৌধুরী, রহমান চাচা, জয়নাল আবেদীনের মতো আরও কত মহান মানুষের অবদানের কথা অনুল্লেখিত থেকে গেল, তাতে আফসোসের সীমা রইল না। এইসব মানুষ, যারা অন্যের কাছে কোনোভাবেই বিখ্যাত নন, কিন্তু আমার আঁধার জীবনে আলো জ্বালিয়ে গেছেন– অবিরাম, অফুরান। তারা আমার স্বর্গ, তারা আমার জীবনে দেবদূত।
- বিষয় :
- গল্প
