ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

‘গল্পটি এক বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে’

‘গল্পটি এক বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে’
×

সালমান রুশদি [জন্ম : ১৯ জুন, ১৯৪৭]

শ্রুতিলিখন ও অনুবাদ তারেক মিনহাজ

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমসাময়িক কথাসাহিত্যের অন্যতম মহারথি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদি। মার্কিন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মার্থা টাইখনারের নেওয়া রুশদির এই সাক্ষাৎকারে সর্বশেষ গ্রন্থ ‘দ্য ইলেভেন্থ আওয়ার’সহ তাঁর লেখা ও ভাবনার গূঢ় জগতের খানিকটা উন্মোচিত হয়েছে। মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএস (কলাম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেম)-এ ২৫ নভেম্বর ২০২৫ এটি সম্প্রচারিত হয়। শ্রুতিলিখন ও অনুবাদ তারেক মিনহাজ

মার্থা টাইখনার: আপনার শেষ গ্রন্থের নাম ‘দি ইলেভেন্থ আওয়ার’। কেন এই নাম? বইটির কোথাও যেন মৃত্যুর একটা প্রচ্ছন্ন ছায়া বা পূর্বাভাস রয়েছে। কেন এমন?
সালমান রুশদি: প্রথমত, আমার বয়স এখন ৭৮ বছর। এটা একটা বড় কারণ। দ্বিতীয়ত, কিছুদিন আগেই আমি মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ঘুরে এসেছি, কোনোমতে বেঁচে ফিরেছি [১২ আগস্ট ২০২২ তাঁর ওপর সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিেত বলা]। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে ভাবিয়ে তোলে। তাই ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’– এ ধারণা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তা ছাড়া আমি এডওয়ার্ড সাঈদের একটা বিখ্যাত প্রবন্ধের কথা ভাবছিলাম, নাম ‘অন লেট স্টাইল’। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মহান শিল্পীরা তাদের জীবনের শেষ অধ্যায় বা সৃষ্টিকে ফুটিয়ে তোলেন। সেই প্রবন্ধে এডওয়ার্ড সাঈদ শাস্ত্রীয় সংগীতের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন, কারণ সংগীত নিয়ে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তবে সহজ করে বললে মূল ধারণাটা ছিল এমন–জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ হয় খুব শান্ত ও সমাহিত হয়ে যায়, জীবনের পরিণতিকে মেনে নিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি থেকে কাজ করে অথবা তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যেমন ডিলান থমাস বলেছিলেন, ‘রেইজ অ্যানিমেটেড অ্যাগেইনস্ট দ্য ডাইং অব দ্য লাইট’ (আলো নিভে আসার বিরুদ্ধে ক্ষোভ)। আমার মনে আছে, এই প্রবন্ধের মূল কথাই ছিল– ‘হয় এটা, নয় ওটা’– শিল্পীরা যে কোনো একটা পথ বেছে নেন। কিন্তু ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এটা ‘হয় এটা, নয় ওটা’ গোছের কিছু নয়। আমার মনে হয়, একজন মানুষ মঙ্গলবারে খুব শান্ত থাকতে পারেন, আবার বুধবারে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারেন। আমি মূলত দেখতে চেয়েছিলাম মানুষ কীভাবে জীবনের শেষ অঙ্কটার মুখোমুখি হয়। আর সেজন্যই বইটার নাম ‘দি ইলেভেন্থ আওয়ার’, কারণ এর প্রতিটি চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
lজীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনি আপনার শৈশব, বেড়ে ওঠা বা অতীতের চেনা জায়গাগুলোতে কতটা ফিরে যান?
llআমি যতবারই বোম্বেতে যাই– যেটিকে আমি এখনও বোম্বে বলতেই পছন্দ করি– ততবারই আমি আমার পুরোনো পাড়ায় একবার ঢুঁ মারি। আমার কাছে ওটা একটা জাদুকরী জায়গা। ওখানে গেলেই আমার মনে হয়, আমি এক মায়াবী জগতে পা রেখেছি।
lকিন্তু এই জাদুকরী জায়গাটার কি আপনার এখন আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে হয়? অথবা জীবনের শেষ পাহাড়ি পথটুকুতে এসে কি এখন ওটাকে ভিন্ন নজরে দেখছেন?
llএখন আমি ওটাকে একটা দূরত্ব থেকে দেখি। তবে যতবারই ওখানে যাই, এই বিশাল শহরের ওই ছোট্ট অংশটুকুর মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। শৈশবের চেয়ে শহরটা এখন আকারে অনেক অনেক বড় হয়ে গেছে, এক বিশাল মহানগর। আর এই বিশাল মহানগরের বুকে ওই ছোট্ট কানাগলিটাই আমার কাছে আমার সবকিছুর উৎস।
lআপনি তো বহু বছর ধরে ওখানে থাকেন না। এরপর আপনি ব্রিটেনে থেকেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তবুও নিজের অস্তিত্বের সেই আদি অংশের সঙ্গে আপনার এত গভীর যোগাযোগ কীভাবে রয়ে গেছে?
llআমার মনে হয়, মানুষ যেখানে জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে, সেই জায়গার একটা নিজস্ব জাদু থাকে– যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। আর ‘বাড়ি’ বা ‘হোম’-এর ধারণাটা আমাদের এই যুগে– যখন মানুষ এত বেশি স্থান পরিবর্তন করে– একটু বহুমুখী বা বহুবচনিক। 
এক ধরনের বাড়ি হলো আপনার শৈশবের ঘর, যার প্রতি আপনার মনে এক গভীর টান থাকে। আবার মানুষ নিজের চেষ্টাতেও নতুন বাড়ি তৈরি করে নেয়। সেগুলো একাধিক জায়গায় হতে পারে, কিন্তু প্রতিটা জায়গাই তোমাকে ঘরের অনুভূতি দিতে পারে।

lআপনি তিনটি দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এখন আপনার কাছে ‘বাড়ি’ কোনটি?
llএখন আমার বাড়ি হলো নিউইয়র্ক সিটি। আমি এখানে ২৬ বছর ধরে আছি। এখানে আমি নিজেকে খুব স্বাচ্ছন্দ্যময় মনে করি। নিউইয়র্কের মতো কিছু শহর আছে, যেগুলো খুব সহজেই তোমাকে আপন করে নেয়। নিউইয়র্কের ইতিহাসটাই হলো বাইরে থেকে মানুষের আসার ইতিহাস। মানুষ পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে, এমনকি আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চল থেকেও এখানে আসে। নিউইয়র্ক নিয়ে যে বিখ্যাত গানটা আছে, সেটাও কিন্তু এখানে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার গল্প নিয়েই। তাই নিউইয়র্ক আমাকে সবসময়ই টেনেছে। এখানে এসে ব্যাগটা নামিয়ে রাখলেই তুমি একজন ‘নিউইয়র্কার’ হয়ে গেলে।
lযখন আপনি আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেন এবং শপথ নিলেন– আমার ধারণা সেটা ২০১৬ সালের দিকে...
ll জি, ২০১৬ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে।
lশপথ নেওয়ার সময় আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
llআমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে আমি কতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ তার আগে আমি অনেক দিন ধরে গ্রিনকার্ড এবং অন্যান্য উপায়ে এখানে থাকছিলাম। আমার মনে আছে, শপথ নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যখন ট্যাক্সিতে চড়লাম এবং শহরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, চারপাশটা অন্যরকম লাগছিল। মনে মনে ভাবলাম, ‘আহা, এখন আমি সত্যিই এই জায়গার একজন।’ অনুভূতিটা দারুণ ছিল।
lনাগরিকত্ব নেওয়ার সময় আপনার যে অনুভূতি হয়েছিল, আমেরিকার সাম্প্রতিক গণজীবন এবং আপনার নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পর কি সেই অনুভূতিতে কোনো চিড় ধরেছে বা পরিবর্তন এসেছে?
llসময়টা যে কঠিন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমেরিকার জন্য এটা একটা কঠিন সময়। তবে কঠিন সময়টা এখন বিশ্বজুড়েই চলছে। আমি যে তিনটি দেশ নিয়ে আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি ভেবেছি– ভারত, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা– তিনটি দেশই কম-বেশি একই রকম কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
lবিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে আপনি যেখানে জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন, সেখানে অভিবাসীবিরোধী একটি মনোভাব দেখা যাচ্ছে। নিজে দু-দুবার অভিবাসী হওয়ার কারণে এই বিষয়ে আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞ বলাই যায়; তো এই প্রবণতা দেখে আপনার কী মনে হয়? আপনি কী নিয়ে চিন্তিত হন?
llস্বভাবতই এটা আমার একদম পছন্দ নয়। এর জবাবে আমি এমন গল্প এবং প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করেছি, যা অভিবাসনকে খাটো না করে বরং এর উদযাপন করে। কারণ নিউইয়র্কের মতো মহান শহরগুলো অভিবাসীদের ছাড়া আজকের এই অবস্থানে আসতে পারত না। অভিবাসীরাই নিউইয়র্ক এবং লন্ডনকে আজকের রূপ দিয়েছে। এমনকি বোম্বের ক্ষেত্রেও এটা সত্যি, কারণ সেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে মিশেছে। আমি সবসময়ই মানুষের এই স্থানান্তরকে আমাদের সময়ের অন্যতম সংজ্ঞায়িত উপাদান হিসেবে দেখেছি। গত ১০০ বছরে, বিশেষ করে বিমানযাত্রার আবিষ্কারের পর, পৃথিবীর ইতিহাসে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে। তাই অভিবাসীরাই আসলে আধুনিক বিশ্বকে গড়ে তুলেছে। একজন অভিবাসী না থাকলে তুমি হয়তো স্টিভ জবসকে পেতে না। আজ আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব জিনিস ব্যবহার করি, তার অনেকটাই অভিবাসী সম্প্রদায় বা ব্যক্তিদের অবদান। তাই আমি একে জীবনকে সমৃদ্ধ করার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখি, সংকুচিত করার মাধ্যম হিসেবে নয়। কিন্তু এখন সেই জায়গাটা ক্ষয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে।
lআপনার জীবনের অন্যতম প্রধান একটি কাজ হলো মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার প্রচার করা এবং যারা লিখছেন তাদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। এখন আমরা সেই লড়াইয়ের কোন পর্যায়ে আছি?
llএই ফ্রন্টেও আমরা খুব একটা ভালো জায়গায় নেই। আমার এই সংকলনের শেষ গল্প ‘দি ওল্ড ম্যান ইন দ্য পিয়াজ্জা’ মূলত এরই একটি রূপক। বাকস্বাধীনতার রূপক হিসেবে এখানে ‘ভাষা’ নিজেই একটি নারী চরিত্র হয়ে গল্পে প্রবেশ করেছে। সে হঠাৎ করেই গল্পে এসে এক কোনায় বসে পড়ল, যা আমি নিজেও আশা করিনি। মাঝে মাঝে নিজের মন যখন নিজেকেই চমকে দেয়, তখন খুব ভালো লাগে।
lশেষ গল্পটি আসলে কী নিয়ে? আমাদের একটু ধারণা দিন।
llগল্পটি একজন বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে, যিনি একটি নামহীন শহরের স্কয়ার বা চত্বরের কোনায় বসে কেবল দুনিয়া চরে বেড়ানো দেখেন।
lএকদম সাধারণ একজন বৃদ্ধ?
llহ্যাঁ, হাতে এক কাপ কফি নিয়ে বসে থাকা একজন সাধারণ বৃদ্ধ, যাঁর বিশেষ কিছু করার নেই। গল্পের শুরুতে সময়টা ছিল ভীষণ দমনপীড়নমূলক, যেখানে মানুষ কী বলবে আর কী বলবে না– তা নিয়ে ভীষণ সংকুচিত বোধ করত। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং সবাই সবার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, তর্ক এবং দ্বিমত পোষণ করতে শুরু করে। পুরো চত্বরটি মতভেদের এক মুখরিত কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ মানুষটি সেখানে বসে সব দেখেন এবং এই আয়োজন উপভোগ করেন। কিন্তু কিছু ঘটনার আবর্তে তিনি নিজেই সেই তর্কের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন এবং নিজেকে একজন সালিশকারী ভাবতে শুরু করেন। তিনি নিজের মতামত চাপাতে যান এবং মানুষকে পথ দেখাতে চান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা তাঁর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। আর এই গল্পের অন্য যে চরিত্রটি, অর্থাৎ স্বয়ং ‘ভাষা’– শুরুর দিকে বাকস্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে সে খুব হতাশ ছিল এবং চত্বরের এক কোনায় মুখ ভার করে বসে থাকত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে সে নিজেই বড় ভূমিকা রাখে। পরে তার ভালো সময় আসে এবং সে যুবকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। কিন্তু গল্পের শেষে যখন পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে শুরু করে, তখন তার মনও আবার অন্ধকার হয়ে যায়। এটি মূলত একটি রূপক যে সমাজ অবরুদ্ধ থাকলে কেমন আচরণ করে আর উন্মুক্ত হলে কেমন রূপ নেয় এবং এই দুইয়ের মাঝখানের যাতায়াতটা কেমন হয়।
lসেই গল্পের শেষে মানুষ আর কথা বলতে পারে না। এবং গল্পের শেষ লাইনটি হলো– ‘শব্দ আমাদের ব্যর্থ করে’। এটা তো বেশ চমকে দেওয়ার মতো এবং ভয়ানক।
ll হ্যাঁ, এটি ভয়ানক হওয়ার জন্যই লেখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, আমরা যদি জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাই, যেখানে আমাদের ভাষা আর আমাদের প্রয়োজন বা চাওয়াকে প্রকাশ করতে পারে না, তবে আমরা বড় বিপদে আছি। কারণ ভাষা হলো আমাদের প্রাথমিক সম্পদ। আমি সবসময়ই লেখকদের ভাষার অভিভাবক হিসেবে দেখেছি। এটা আমাদের দায়িত্ব যে আমরা যেন ভাষার সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্য এবং উন্মুক্ততা রক্ষা করি। সাহিত্য যদি তা করতে পারে, তবে তা বিশ্বকেও সেই পথ দেখাতে পারে।
lআর সবকিছুর মূল কথাই হলো বাকস্বাধীনতা।
ll হ্যাঁ, সবার ওপরে বাকস্বাধীনতা। 

আরও পড়ুন

×