ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

মধুসূদন দত্ত : সত্য ও সাহিত্যের স্বত্ব

মধুসূদন দত্ত : সত্য ও সাহিত্যের স্বত্ব
×

মাইকেল মধুসূদন দত্ত [২৫ জানুয়ারি ১৮২৪–২৯ জুন ১৮৭৩]

খালেদ হোসাইন

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধনাঢ্য পিতার সৃষ্টি-উন্মাদ পুত্র নিছক কবি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজের সচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনকে একজন মানুষ কতটা বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিতে পারেন, মধুসূদন দত্ত তার সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ। ঊনপঞ্চাশ বছর জীবনটাকে খুবই বিশৃঙ্খল ও সুখ-দুঃখের এক উত্থান-পতনময় গ্রাফ মনে হয়। নিজের জীবন, শিক্ষা-দীক্ষা, কবি হওয়ার তীব্র বাসনায় ধর্মান্তরিত হওয়া, একাধিক বিয়ে, সন্তান-সন্ততি, বিলাত ও ফরাসি দেশে গমন ও প্রত্যাবর্তন, ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আমূল বাসনা পরিত্যাগ করে বাংলা সাহিত্যে আত্মনিয়োগ, বাংলা সাহিত্যের যাবতীয় অপূর্ণতা দূর করার তীব্র আকুলতা থেকে সৃষ্ট সাহিত্য সম্ভারের বৈচিত্র্য, নৈপুণ্য ও সমৃদ্ধি একেবারেই তুলনারহিত। 
অক্ষরবৃত্ত পয়ার ও লাচাড়ির গৎবাঁধা ছন্দ থেকে মুক্ত করতে র‌্যাংকভার্সের অনুপ্রেরণায় মধুসূদন দত্ত ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে’ এর সূচনা হলেও ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ এর যে বলিষ্ঠ রূপ, তা বাংলা কাব্যভাষায় সংযুক্ত করল কাব্যপাঠের সাংগীতিকতা ও প্রবহমানতার অনিঃশেষ আনন্দ। এর ফলে বাংলা কবিতায় ভাষা ও প্রাকরণিক বিবেচনায় যে অগ্রসরতা ও প্রাণের স্বস্তি অর্জন করল, বাংলা সাহিত্যে এর ফল চিরকালীন সম্মানজনক এক সম্পদ হয়ে থাকল। 
ভাবা যায় না, বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর সংযোগ ঘটে নাটকের মাধ্যমে। রামনারায়ণ তর্করত্নের নাটক দেখে তাঁর মনে হয়েছে। 
অলীক কুনাট্য রঙ্গে       
মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।
‘শমির্ষ্ঠা’ (১৮৫৯), ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০), ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) ও ‘মায়াকানন’ তাঁর নাটক। এর মধ্যে টডের রাজস্থানের কাহিনি নিয়ে তিনি কৃষ্ণকুমারী নাটকটি লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত ট্র্যাজেডি না-থাকার শূন্যতা পূরণ করার জন্য। কৃষ্ণকুমারী, ভীমসিংহ, জগৎ সিংহ প্রমুখ গাম্ভীর্যপূণ চরিত্রের পাশে ড্রামাটিক রিলিফ দেওয়ার জন্য ধনদাস ও মদত্রিকা প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল হয়ে আছে। শুধু নাটক নয়, দুটি যথোপযুক্ত দুটি প্রহসন সৃষ্টি করেছিলেন মধুসূদন দত্ত– ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ (১৮৬০), বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০)। সৃষ্টি-বৈচিত্র্যকে প্রসারিত ও গভীর করার জন্য ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোর বর্ণনা তালিকা দেওয়া যায়। যেমন– ‘দি অপ্সরি : আ স্টোরি ফ্রম হিন্দু মিশনারি’, ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি ও ভিশনস অব পাস্ট’; অনুবাদগ্রন্থ ‘হেক্‌টর-বধ’ (১৮৭১)। অসমাপ্ত কাব্যনাট্য ‘রিজিয়া : ইমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’।
বাংলা সাহিত্যে ‘সনেট’ আঙ্গিকটির অস্তিত্ব ছিল না, মধুসূদন রচনা করলেন ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলি’। একে একে তিনি দিগন্তের পরে দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মমতার অনুভূতি, গভীর শিল্পবোধ এবং তৎপর সক্রিয়তা নিয়ে। 

বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত আঙ্গিকে, বিষয় ও রূপায়ণের বা শৈলীগত প্রবণতায় প্রতি নিজে ‘স্বীয়-স্বভাবে’ বিদ্রোহ করেছিলেন বলেই এমন রত্নসম্ভার সৃষ্টি করতে পেরেছেন এবং সেই সঙ্গে সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছেন। এসব সনেটে দেশ ও ভাষার প্রতি তাঁর নিবিড় প্রেমনিষ্ঠা মূর্ত হয়ে আছে।  

একই প্রসঙ্গ বিভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায়, শিল্পাঙ্গিক সাপেক্ষে, স্বতন্ত্র অর্থবহতা আত্মস্থ করতে পারে। তাই কোন শিল্প কোন কালে বা কাল-পরিধিতে সৃষ্ট হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিত তাকে অনিবার্যভাবে প্রভাবিত ও প্রভান্বিত করে। সাধারণত আলোচনা-গবেষণার প্রয়োজনে যে যুগ বিভাজন তৈরি হয়ে থাকে, তা অনেকটা অনুমানভিত্তিক, প্রামাণিক নয়। বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাজন অনুযায়ী ১৮০১ সাল থেকে আধুনিক যুগের সূচনা কিন্তু এটাও আমরা জানি, পরিপূর্ণভাবে আধুনিক চেতনাবহ সাহিত্যিক নিদর্শনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ষাট বছর, যতদিন পর্যন্ত না মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৯৭৩) ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৯৬১) প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন ও বিচিত্র কারণে এই গ্রন্থটি অনন্য। উনিশ শতকে মহাকাব্যের ধারায় হেম-নবীন-রঙ্গলাল, এমনকি কায়কোবাদের সৃষ্টিসম্ভার ঐতিহাসিক কারণে তাৎপর্যবহ বটে কিন্তু এ-কথাই প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রকৃত সাহিত্যিক মহাকাব্য। ধ্রুপদি পুরাণ বা ধর্মকেন্দ্রিক ‘রামায়ণ’ থেকে অংশবিশেষ গ্রহণ করে এর মধ্যে সমকালীন জীবন-বাস্তবতার যে মর্মভেদী চালচিত্র তিনি উপস্থাপন করলেন, তা হয়ে উঠেছে অচিন্ত্যপূর্ব এক রাজনৈতিক ভাষ্য। কেননা, এ কাব্য এক বলিষ্ঠ ও সমৃদ্ধ এক ‘রূপক কাব্য’। এ ভূখণ্ডের স্বকীয়, স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক সংস্কৃতি বিনষ্ট করার জন্য যে আগ্রাসনপ্রবণ ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল, তাকে চিহ্নিত ও প্রতিরোধের গভীর আয়োজন এ কাব্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘রামায়ণে’র খলনায়ক এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র, দেশপ্রেম ও প্রজাপ্রীতির জন্য যিনি স্বীয় শান্তি, সন্তান ও সর্বস্ব উজাড় করে দিতে অকুণ্ঠ। শৈলীগত সাফল্য বর্ণনার আগে, লোকসাহিত্যে, সাহিত্যে, মধ্যযুগের বিচিত্র আঙ্গিকে চিরদিনের ‘অবাঞ্ছিতা’ নারী-চরিত্র চিত্রায়ণে মধুসূদন দত্ত বিবেচনাশক্তি ও মানবিকবোধের যে পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁকে মহিমান্বিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। সম্মুখ সমরে বীরবাহু প্রকৃত বীরের মতো লড়াই করে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, রাবণের তাতে পিতৃ-হৃদয় গৌরবান্বিত বটে :  
মহাশোকে শোকাকুল কহিলা রাবণ;–
যে শয্যায় আজি তুমি শুয়েছ, কুমার, 
প্রিয়তম, বীর-কুল-সাধ এ শয়নে 
সদা! রিপুদলবলে দলিয়া সমরে, 
জন্মভূমি-রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে? 
যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্ তারে!
কিন্তু রাবণ কেবল দেশপ্রধানই নন, তাই পিতার মানবিক হৃদয়ও একই সঙ্গে সক্রিয় ও স্পন্দিত হতে থাকে: 
“তবু, বৎস, যে হৃদয়, মুগ্ধ মোহমদে 
কোমল সে ফুল-সম। এ বজ্র-আঘাতে, 
কত যে কাতর সে, তা জানেন সে জন, 
অন্তর্যামী যিনি; আমি কহিতে অক্ষম।” 
অভিমানে ঈশ্বরের প্রতি অনুযোগও করেন তিনি :“হে বিধি, এ ভবভূমি তব লীলাস্থলী;–
পরের যাতনা কিন্তু দেখি কি হে তুমি 
হও সুখী? পিতা সদা পুত্রদুঃখে দুঃখী–
তুমি হে জগৎ-পিতা, এ কি রীতি তব? 
হা পুত্র! হা বীরবাহু! বীরেন্দ্র-কেশরী! 
কেমনে ধরিব প্রাণ তোমার বিহনে?”–
কিন্তু রাবণের মতো দেশপ্রধান ও পিতার মতো দ্বৈতসত্তা নন বীরবাহুর জন্মদাত্রী চিত্রাঙ্গদা, সকাতর ও সর্বাত্মক মাতৃসত্তা নিয়ে তাই রাজদরবারে এসে সরাসরি অভিমান ও অভিযোগ উত্থাপন করেন: 
“একটি রতন মোরে দিয়াছিল বিধি 
কৃপাময়; দীন আমি থুয়েছিনু তারে 
রক্ষাহেতু তব কাছে, রক্ষঃকুল-মণি, 
তরুর কোটরে রাখে শাবক যেমতি 
পাখী। কহ, কোথা তুমি রেখেছ তাহারে, 
লঙ্কানাথ? কোথা মম অমূল্য রতন? 
দরিদ্র-ধন-রক্ষণ রাজধর্ম; তুমি 
রাজকুলেশ্বর; কহ, কেমনে রেখেছ, 
কাঙ্গালিনী আমি, রাজা, আমার সে ধনে?”
নারী যে তার প্রগাঢ় অনুভূতির কথা এভাবে বলতে পারল, সময়ের বিবেচনায়, এ এক বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা। বীরবাহুর মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে বিলাসকানন ছেড়ে প্রমীলা যখন তিনি রাজদরবারের দিকে ছুটে যাচ্ছেন, প্রত্যাবর্তনের পথে বাধাপ্রাপ্ত হলে কুলবধূর কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হয় বীরাঙ্গনা-সুলভ উক্তি: 
“পর্ব্বতগৃহ ছাড়ি’
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?” 
এ কাব্যে নারীচরিত্রসমূহকে পরিপূর্ণ মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত করার মানসিকতা অন্যত্রই হাজির সতর্ক সচেতনতায়। তাই তাঁকে নারী-প্রগতির প্রকৃষ্ট প্রণেতা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। 
একজন কবির সৃষ্টি-সামর্থ্যের প্রধান নির্ণায়ক তার কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার ক্ষমতা, তা জনচিত্তভেদী হওয়ার যোগ্যতা, সার্বভৌম হয়ে উঠতে পারার শক্তি। সমকালীন জীবন-বাস্তবতার নিরিখে, যখন এখনও, নারী তার যথার্থ মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত, নানাভাবে নিগৃহীত, তেমন একটা সময়ে মধুসূদনের এই মনোভঙ্গি কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, অনুসরণীয়ও বটে। 
মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের এক মায়াময় মিথ। বিচিত্র, বিক্ষিপ্ত জীবন-প্রণালির সঙ্গে অসম্ভব রকমের বৈপরীত্যময় সৃষ্টিসম্ভার জীবনের সত্য ও সৃষ্টির স্বত্বকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যে, বিশেষভাবে কাব্যে, জৈবনিক তথ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জিত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সত্য। মধুসূদনের সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম পাঠ বা পর্যালোচনা করলে এই বিবেচনা অন্তরকে দখল করে নেয়।       

আরও পড়ুন

×