ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

প্রচ্ছদ

অনেক কমলা রঙের রোদ

অনেক কমলা রঙের রোদ
×

রাজীব নূর

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ০৭:২০

তখন সে ছিল আমার পাশে। আমরা হাঁটছিলাম ফুটপাত ধরে। অনেক রোদ ছিল সেদিন। রোদে সবসময় তার কপাল কুঁচকে যায়, চোখ বুজে আসে। চোখ-কপাল কুঁচকে সে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমার মনে এলো 'অনেক কমলা রঙের রোদ;/ আর তুমি ছিলে'।
জীবনানন্দ দাশের 'নগ্ন নির্জন হাত' কবিতায় তো এমন এক নারীর কথা বলা হয়েছে, 'যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে/ অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখিনি'। তাহলে সে যখন আমার পাশে এবং সে পাশে আছে বলেই যখন আমি রোদের রং দেখতে শুরু করেছি, সামান্যে অসামান্য এক অনুভূতি তাড়িত হচ্ছি; তখন যার মুখ কোনোদিন দেখা হয়নি, তাকে নিয়ে লেখা কবিতাটি আমার মনে এলো কেন? আমার এই অনুভূতি এক বিলুপ্ত নগরীর কথা, সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ বর্ণনা শেষে ভারতসমুদ্রের তীর কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনার থেকে টায়ার সিন্ধু নদের পার হয়ে জীবনানন্দীয় পরিভ্রমণকে কি সামান্য করে দেয় না?
সামান্য থেকে শুরু- এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল ফরহাদ খানের 'শব্দের মজা' নামের কোনো একটা লেখায় পড়েছিলাম, সামান্য শব্দটি তার মূল অর্থে আর ব্যবহৃত হয় না। বাংলা ভাষায় এমন আরো শব্দ রয়েছে, যেগুলোর মূল অর্থের সঙ্গে বর্তমান অর্থের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজে বের করলাম ফরহাদ খানের সেই লেখা- 'তুচ্ছ, নগণ্য, অল্প অর্থেই সামান্য শব্দের ব্যবহার বেশি। তবে সাধারণ, গুরুত্বহীন অর্থেও সামান্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সামান্য শব্দের মূল অর্থের সঙ্গে বর্তমানে প্রচলিত অর্থের সামান্য সম্পর্কও নেই। সামান্য শব্দের মূল অর্থ হলো সমানতা, সমানভাব।'
ভাবলাম, কবে শব্দটির এমন অর্থবদল হলো? নিশ্চয়ই রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুরের আগে। লালন ফকির যখন 'পাবে সামান্যে কি তার দেখা' কিংবা 'সামান্যে কি তার মর্ম জানা যায়' রচনা করছেন; তারও পরে রবীন্দ্রনাথের 'সামান্য ক্ষতি' রচিত হয়েছে।
'সামান্য ক্ষতি' কবিতাটি ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি। কোন ক্লাসে পাঠ্য ছিল মনে নেই। মনে আছে, কাশীর মহিষী করুণা মাঘ মাসে শীতের বাতাসের মধ্যেই পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জনে শিলাময় ঘাট চম্পকবনে শতসখিসনে স্নানে চলেছেন। "স্নান সমাপন করিয়া যখন/ কূলে উঠে নারী সকলে/মহিষী কহিলা, -'উহু! শীতে মরি,/সকল শরীর উঠিছে শিহরি,/জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী-/শীত নিবারিব অনলে'।"
তারপরের গল্প প্রায় সবারই জানা। দরিদ্রের কুটির পুড়িয়ে নিজেকে উত্তপ্ত করে দীপ্ত-অরুণ-বসনা রানি ফিরে গেলেন প্রাসাদে। রাজার কাছে বিচার এলো এবং রানিকে দেওয়া হলো কঠিন শাস্তিত- "পথে লয়ে তারে কহিলেন রাজা,/'মাগিবে দুয়ারে দুয়ারে-/এক প্রহরের লীলায় তোমার/যে ক'টি কুটির হল ছারখার/যত দিনে পার সে-ক'টি আবার/গড়ি দিতে হবে তোমারে'।"
সামান্য তো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতার শিরোনামে এবং কাশীর রানির দৃষ্টিতে এই তুচ্ছতা প্রকাশ পেয়েছে। লালনের গানে কিন্তু অল্প অর্থেই এসেছে সামান্য শব্দটি। গানের আরো গূঢ় তথ্য বোঝা আমার সাধ্যে নেই। 'পাবে সামান্যে কি তার দেখা/বেদে নাই যার রূপরেখা' বোধ হয় শুধুই পরমাত্মার কথা বলে। তবে 'পাথরে যেমন অগ্নি থাকে/বের করে নেয় ঠুকনি ঠুকে/সিরাজ সাঁই দেয় তেমনি শিক্ষে/বোকা লালন সং নাচায়।'
পাথরে ঠুকনি ঠুকে আগুন জ্বালানো শিখেছিল আমাদের পূর্বপুরুষ। অবশ্য আগুন আগে থাকতেই প্রকৃতিতে ছিল। গাছে গাছে ঘর্ষণে আগুন লেগে বন পুড়ে যাওয়ার ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। প্রকৃতি থেকে আগুন জ্বালানো এবং আগুনের ব্যবহার করতে শিখে প্রাণিকুলের মধ্যে নিজেদের আলাদা করে নিতে পারল মানুষ। নৃতত্ত্ববিদ রিচার্ড রাংহামের মতে, হোমিনিডরা মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে উন্নীত করে আগুনের ব্যবহার আবিস্কার এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। এই সময়টাকে তিনি ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার বলে মনে করেন। বর্তমানে রান্না করাটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। তবে আদিতে রান্না করতে শেখাটাই অনেক বড় ঘটনা ছিল। বহু যুগ ওপারের মানুষ যেদিন কাঁচা মাংস ঝলসাতে শিখে গেল, তখন এই সামান্য শুরু এক অসামান্যের সূত্রপাত করেছিল। আগুন কেবল রান্না নয়, বরং মানুষ যে আসলেই মানুষ- সেটার প্রমাণ। তবে রিচার্ড রাংহামের এই কথাগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। ২০০৯ সালে নিজের তত্ত্বগুলোকে 'ক্যাচিং ফায়ার' বইয়ে তুলে ধরেন তিনি। আগুন আবিস্কারের সময় এবং কারা আগুন আবিস্কার করেছে, সে নিয়ে বিস্তর তর্ক রয়েছে, নিয়ান্ডারথাল, হোমো ইরেক্টাস নাকি আরো পরের মানুষ?
আগুন নিয়ে কত কী বলা যায়! আগুনের পাখি ফিনিক্সের কথা পড়েছিলাম সেই কোন ছোটবেলায়! গ্রিক পুরাণ অনুসারে ফিনিক্স হলো পবিত্র এক 'আগুনপাখি', যার জীবনচক্র আবর্তিত হয় হাজার বছর ধরে। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য যমদূত আসার আগেই পাখিটি নিজের বাসা নিজেই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আর ওই ভস্ম থেকেই জন্ম নেয় নতুন জীবন। শুরু হয় তার অবিনাশী যাত্রা। ফিনিশীয় সভ্যতাই নাকি প্রথম ফিনিক্স পাখির কল্পনা করেছিল। অন্য সব সভ্যতার ধর্মীয় পুরাণেও এ পাখির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যেমন ভারতে দেবতা বিষ্ণুর বাহন গরুড়, প্রাচীন মিসরে বেনু বা বেন্নু। মিসরীয় মিথের এই বেনু বা বেন্নু শব্দের অর্থই নাকি 'আগুন থেকে সুন্দর করে বেরিয়ে আসা'। যাই হোক, 'আসুন আমরা আগুন সম্পর্কে বৃথা বাক্য/ব্যয় না করে একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি/জ্বালিয়ে দিয়ে বলি :এই হচ্ছে প্রকৃত আগুন।'
এবার আসি আমার ব্যক্তিগত আগুনের কথায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি গ্রাম ভাদুঘরে আমার জন্ম। আমাদের ছোটবেলায় রিজভী-ওয়াহাবী দ্বন্দ্বে গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই আগুনের কথা বলার আগে আমাদের গ্রামটার কথা বলি। আল মাহমুদের 'লোক-লোকান্তর' কাব্যগ্রন্থের 'রাস্তা' নামে একটি কবিতায় ওই গ্রামটির কথা আছে। কবিতায় ভাদুঘরকে ভুল বানানে ভাদুগড় লেখা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, কোনো এক বাহাদুরের গড় থেকে গ্রামটির এমন নামকরণ হয়েছে। ভাদু উৎসবের কথাও বলা হয় কোথাও কোথাও। অবশ্য পুরুলিয়া অঞ্চলের এই উৎসবটি যে সমতটের ভাদুঘর গ্রামে ছিল না- এটা নিশ্চিত করেই অনুমান করা যায়। আমাদের ভাদুঘরে একটা মেলা হয় প্রতি বছর বৈশাখের ১৪ তারিখে, যা পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে ভাদুঘরের বান্নি নামে খ্যাত। এই মেলা-বান্নির কথা আছে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর কবিতায়। ওই কবিতায় গ্রামের নামটি নির্ভুল বানানে লেখা ছিল। বোধ হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমিতির কোনো একটা সংকলনে অনেককাল আগে কবিতাটি পড়েছিলামচ্ 'ভাদুঘর কতদূর, সেখানে কি এখনো মেলাবান্নি বসে'। এই কবিতাটি খুঁজে বের করা নিশ্চয়ই দুরূহ হবে। আমি অবশ্য খোঁজার চেষ্টা করিনি।
আল মাহমুদ তাঁর বন্ধু চণ্ডীপদ চক্রবর্তীকে উৎসর্গিত 'রাস্তা' নামের কবিতাটিতে লিখেছেন, 'যদি যান,/কাউতলী রেলব্রিজ পেরুলেই দেখবেন/মানুষের সাধ্যমত/ ঘর-বাড়ি।' শহরতলির আর সব গ্রামের মতো আমাদের গ্রামটিও সত্যি ঘনবসতিপূর্ণ, গ্রামের মানুষের মধ্যে শহুরেপনার সঙ্গে গ্রাম্যতা মিলেমিশে ছিল। বিগত তিন দশকে শহর অনেকটা এগিয়ে গেছে আমাদের গ্রামের দিকে। ফলে গ্রামের মানুষ আরো শহুরে হয়েছে, গ্রাম্যতা ঘুচেছে গ্রামটির, পুরোপুরি বিসর্জিত হয়েছে গ্রামীণ আবহ। নেই আল মাহমুদের কবিতায় বর্ণিত 'চাষা হাল বলদের গন্ধে থমথমে হাওয়া'। 'লাউয়ের মাচায় ঝোলে সিক্তনীল শাড়ির নিশেন' এখন বিগত দিনের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে আছে 'কিষাণের ললাটরেখার মতো নদী'টা, যে নদীর তীর ধরে মালোপাড়ার পাশ দিয়ে 'শুঁটকির গন্ধে পরিতৃপ্ত মাছির আওয়াজ' শুনতে শুনতে আমরা যেতাম কুমারপাড়ায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসের মালোদের অনেকেই ছিল আমাদের এই গ্রামেও। এখন আর নেই তাদের কেউ। গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে চলে গেছেন আমার গ্রাম থেকে গ্রামান্তর প্রদক্ষিণের দীক্ষাদাতা দাদাটি। আমাদের ছোটবেলায় রিজভী-ওয়াহাবী দ্বন্দ্বে গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার যে গল্পটা বলছিলাম, আমার এই দাদাটি, যাকে আমি 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের ইন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করতাম, তার দেশত্যাগ, সেই আগুনের অনেক পরের ঘটনা। অবশ্য দেশত্যাগের এমন সব ঘটনা আমি অনেক ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। আমার মায়ের অধিক মাসিটি চলে গেছেন। এ তো দেশ ছেড়ে যাওয়া নয়, নির্বাসন দণ্ড। তবু ছোটবেলায় তৃতীয়পক্ষের এক শিশু আমি ভাবতাম, মাসিদের চলে যাওয়ার মতো একটা দেশ আছে। আমাকে এই দেশেই থাকতে হবে।
যতদূর মনে পড়ে, রিজভী আর ওয়াহাবীদের দুই পক্ষই নিজেদের সুন্নি বলে দাবি করে এবং অপরপক্ষের কথা বলার সময় তুচ্ছার্থে নাম দুটি ব্যবহার করে থাকে। তাদের একটি পক্ষ যখন অন্যপক্ষের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল, সেবার অনেক ভয় পেয়েছিলাম। আমার জন্ম এই দুই পক্ষের বাইরের আরো একটি ক্ষুদ্রপক্ষে, যারা প্রাণপণে নিজেদের মুসলিম বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে এবং যাদের বাকি মুসলমানদের প্রায় সব গোষ্ঠী অমুসলিম ঘোষণার জন্য আন্দোলন করে যায়। শুধু ধর্মীয় কারণে ছোটবেলা থেকে বহু সামাজিক নিগ্রহের মধ্যে বড় হতে হয়েছে আমাকে। আমাদের গ্রামে জ্বলা সেই আগুন আমার মনে যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল, বহুবছর পর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লিতে আগুনের পর সেখানকার মানুষগুলো কেমন আছে, জানতে গিয়ে জেনেছিলাম, অভিন্ন আতঙ্কের মধ্যে বড় হচ্ছে সাঁওতালপল্লির শিশুরা। ২০১৬ সালের নভেম্বরের ৬ তারিখের ওই দিনটি সাঁওতাল শিশুদের কাছে 'সেঁঙ্গেল মাহা' বলে পরিচিত। শিশুরা শুধু নয়, ওই দিনটিকে সাঁওতালপল্লির বড়রাও এই নামে স্মরণ করে থাকে। 'সেঁঙ্গেল মাহা' মানে 'আগুনের দিন'। 'সেঁঙ্গেল' শব্দের অর্থ আগুন, 'মাহা' অর্থ দিন। তবে মাহা শুধুই দিন নয়, বিশেষ দিন এবং সেটা ভালো-মন্দ দুই অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। এখানে মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আগুনের স্মৃতি আমাকে বিচলিত করে। আমি কায়মনে প্রার্থনা করি, এমন দিন যেন কোনো শিশুর জীবনে না আসে। আমাদের গ্রামে আগুন দেওয়ার পরের দিন আমার শিক্ষকদের কয়েকজন আলোচনা করছিলেন, সামান্য কয়েকটি বাড়ি পুড়েছে- এটা খবর হিসেবে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি যে স্কুলটিতে পড়তাম, তার শিক্ষকদের অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন, হয়তো তারা সেদিনের খবরের কাগজে আগের দিন তাদের পাঠানো খবরটি এত ছোট করে ছাপা হয়েছে কেন, তা নিয়ে আলাপে এই কথা বলেছিলেন। আমার শিক্ষকদের কাছে যে আগুন সামান্য ছিল, সেই আগুন আমাকে বিপন্ন বিস্ময়ে তাড়িত করে বেড়াচ্ছে এখনো। বহুবছর পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিন যশোরের অভয়নগর উপজেলার চাঁপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় যখন আগুন দেওয়া হলো, তার পরদিন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম এবং শুনছিলাম সহকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, গোটাদশেক ঘর পুড়েছে; এ সামান্য আগুন। আমি কিন্তু সামান্য আগুন দেখে আবারও গুমরে কেঁদেছিলাম সেদিন। খাবারের জন্য কাঁদছে যে শিশুটি, তাকে দেখলাম। কাঁদছেন ওর মা-ও। কারণ, ঘরে খাবার নেই। খাবার আসবে কোথা থেকে? ঘরই তো নেই! ঘরদোর, সহায়-সম্বল গেছে এমন ১২২টি সংখ্যালঘু পরিবারের। নির্বাচনের পর রাতে চাঁপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় অন্তত ১০টি বাড়ি। সেখান থেকে যশোর শহরে ফিরতে ফিরতে আমি আমার শৈশবে ঢুকে পড়ি, ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিলাম আবারও; সেই ছোটবেলায় যেমন একঘরে হয়ে থাকার বেদনায় প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। তবু যশোর শহরে ফিরে আমি লিখেছিলাম, সামান্য আগুনে যে অসামান্য ক্ষতির শুরু হয়েছে, তার গল্প- 'চাঁপাতলায় শুধুই কান্না'। সঙ্গে ছাপা হয়েছিল মা-মেয়ের ছবিটি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনোত্তর সহিংসতার প্রতীক হয়ে আছে ওই কান্নার ছবি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আবারও গিয়েছিলাম ওই গ্রামে। ২০১৪ সালে যে মেয়েটি ছিল মায়ের কোলে, সে তখন পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে, মহাকাল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়-সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বছর পাঁচেক আগের ওই দিনটির কথা ওর মনে থাকার কথা নয়। তাণ্ডবের দিনে ওর বয়স ছিল চার বছরেরও কম। তবে শিশুটির দাবি, অনেক কিছুই মনে আছে ওর। বড় কোনো ঘটনা শিশুমনেও গভীর রেখাপাত করতে পারে। তাই সে ভোলেনি, কোনো এক সন্ধ্যায় ওদের ঘরদোর ভাঙচুর করে গিয়েছিল খারাপ মানুষেরা।
আমাদের গ্রামে লাগা আগুনের ঘটনাটি, যা আমার কয়েকজন শিক্ষকের কাছে ছিল সামান্য ঘটনা, তা আমি ভুলতে পারিনি। ওই আগুন আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, 'ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু'। ওই আগুন আমাকে করেছে অতি-স্পর্শকাতর, টের পাই একটা এক্সট্রা সেন্সর কাজ করে আমার মধ্যে। তাই সে আমার পাশে থাকলে রোদের রং দেখতে পাই; না থাকলেও দেখি, তখন হয়তো কমলা রঙের রোদ নীল হয়ে আসে।

আরও পড়ুন

×