প্রচ্ছদ
সামান্যতেই শেষ
×
ময়ুখ চৌধুরী
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ০৭:২১
যেভাবে যাচ্ছিলে, সেভাবেই চলে গেলে। সেই ফাঁকে আড়চোখে সামান্য তাকানো। এক ঝটকায় এক পাশের চুল পিঠের পেছনে ছিটকে পড়ল। আমিও যেন ছিটকে পড়লাম হাতুড়ির ঘা খাওয়া বরফখণ্ডের মতো। নিজেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে জড়ো করলাম। তখন আমি আর আমি নেই, 'তুমি' হয়ে গেছি।
শুরু হলো আমার মরণদৌড়। ছিটকে পড়া দিগন্ত থেকে তোমার দিকে। দৌড়াচ্ছি, আজও দৌড়াচ্ছি। বায়ান্ন বছর যে পেরিয়ে গেল, খেয়ালই করিনি। তবুও, তবুও তোমার নাগাল পেলাম না।
ভুল বললাম; কেবল দৌড়াইনি, দাঁড়িয়েও ছিলাম। তুমিই আমাকে লেবুগাছতলে দাঁড় করিয়ে রেখে হাতে মেহেদি লাগাতে চলে গেলে। যাবার বেলায় দুটি লেবুপাতা কুটি কুটি করে ছিঁড়লে; তারপর হাতের তালুতে করে ইশারায় মৃত্যুর গন্ধটুকু নিতে বললে। সেই গন্ধ নিতে গিয়ে তোমার তালুর ঝাপসা রেখাগুলোর ঘ্রাণও আমি পেয়েছি। সামান্য এই গন্ধচুরি তুমি টের পাওনি। আর আমি নিজেও টের পাইনি যে, শুরুতেই আমি শেষ হয়ে গেছি।
তুমি চলে গেলে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম লেবুগাছতলে- কচলানো লেবুপাতা মুঠোয় করে। দিন গেল, রাত গেল, মাস গেল, বছর গেল, ঘুম গেল। পড়ে থাকল শুধু স্বপ্ন।
১৯৭৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। নিজেকে প্রস্তুত মনে হলো। ভেবেছি সবার আগে তোমাকে গিয়ে বলব- 'জানো, আজ আমি চাকরিতে যোগদান করেছি!' এটা একটা বিকল্প বাক্য মাত্র। আসলে আমার সাহস ছিল না যে, বলি- '...তোমাকে আমি ভালোবাসি, তোমাকে চাই।' শেষ পর্যন্ত সবগুলো কথাই অনুচ্চারিত রয়ে গেল। তার আগেই তোমার হাতের মেহেদি অর্থবহ হয়ে গেছে।
আমি আবার ফিরে গেলাম লেবুগাছের সবুজ অন্ধকারে। দাঁড়িয়ে থাকলাম বছরের পর বছর। মুঠোবন্দি পাতাগুলো খুলে দেখতে ভয় পাচ্ছি। বাতাসে বিষণ্ণতার গান আর আমার অবাস্তব অপেক্ষ। না, আমি অপেক্ষা করছিলাম না; অপেক্ষা করছিল আমার না-বলা কথাগুলো। এবারের কথাগুলো এ রকম- 'সামান্য গন্ধটুকু আমি চুরি করেছি, সেটুকু ফেরত দিতে চাই। আর, তুমিও আমাকে আমার কাছে ফেরত দাও।'
ঝটকা-চুলের দৃশ্যকলা দিয়ে শুরু, সামান্য ওটুকুতেই আমি শেষ। তারপর লেবুপাতার হত্যাকাণ্ড, তারপর শরীরের ঝাপসা ঘ্রাণ। সামান্য এটুকু চুরির জন্যে, আমার না-বলা কথাগুলোকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে! তাও এক বছর-দু'বছর হলে কথা ছিল,- না, হায়রে বছর! সেই যে তুমি গেলে আর এলে না। আবার সেই ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। আমাকে চুরি করে এভাবে পালিয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি। কর্পূরের গন্ধে আমি পাথর হয়ে গেলাম। পাথরেরও পা থাকে। গড়াতে গড়াতে আমি সবখানে যেতে থাকলাম।- যেখানে যেখানে তোমার চিহ্ন পড়ে আছে, সবখানে। যেখানে তোমার জন্ম, সেইখানে। হাঁটতে হাঁটতে তুমি ভাত খেতে এঘরে-ওঘরে, সেইখানে। যে খাটে তুমি অদেখা ভঙ্গিমায় ঘুমোতে, আলতোভাবে সেটাকে ছুঁয়েছি। বিয়ের আগে, যে জানালা দিয়ে তুমি দক্ষিণের আকাশ দেখতে, আকাশের চাঁদ দেখতে, সেই জানালা দিয়ে আমার পাড়াটা স্পষ্ট দেখা যায়। অথচ তোমার কাছে চিরকালই আমি অস্পষ্ট রয়ে গেলাম।
আবারও কি ভুল বললাম? - তুমি নেই, তুমি চলে গেছ। একদিন কন্যা ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। একদিন জায়া ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। একদিন জননী ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। কিন্তু কোনোদিন কারও প্রেমিকা ছিলে-না, এখন হয়েছ। তুমি খুব একটা কাছে আসতে না, এখন আসো। তুমি বেছে নিয়েছ আমার ঘুমের ভূগোল। আমার লেখার টেবিলে এসে বসো। কবিতার খাতাগুলো টেনে নাও। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখো। খুঁটে খুঁটে বেছে নাও নিজেকে, তারপর নিজেকে গিলে খাও, নিঃশেষ করে ফেলতে চাও। এখন তুমি ডাইনি হয়ে গেছ।
নাহ, এও বোধহয় ভুল বললাম। সেই রাতে পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে আকাশ বানালে, তারপর হয়ে গেলে ধ্রুবতারা। ঠিক আছে, ওভাবেই জ্বলতে থাকো তুমি। আমি ঘুমাই। আমাকে ঘুমের মধ্যে বরফের মতো গলে যেতে দাও। বায়ান্ন বছর ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।
পরিশিষ্ট : মৃত্যুদৃশ্য
প্রচণ্ড ঘুম পেয়েছিল আমার- আলকাতরার চেয়েও ঘন, থিকথিকে।
সাব্যস্ত মৃতদেহটাকে গর্তের মধ্যে মাটি-চাপা দিয়ে
তারপর ফিরে গেলে যার যার জীবিত আস্তানায়।
আমার শিয়রে কয়েকটা আগরবাতি তখনও উড়ছে,
তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে আসছিল গেরুয়া গন্ধ-
আমি বিভোর, আমি কৃতজ্ঞ।
মাত্র একটা বৃষ্টি হতে দাও, দেখবে-
নয়টা আগরবাতির বিনিময়ে ঠিকই পাঠিয়ে দেবো
উদ্গত ঘাসের সবুজ, যার অজস্রতা গুনতে গুনতে
তোমরা পৌঁছে যাবে আমার কাছে।
তখন আমি জানতে চাইবো তার কথা
যে আমার পাশে শুয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
আমার চোখ দুটো তৃণের শিকড় বেয়ে কীভাবে উঠে আসছে দ্যাখো,
কাণ্ড বেয়ে, ডাল বেয়ে চূড়ান্ত সূক্ষ্ণতায়।
তোমরা তাকে দেখতে পাচ্ছ-
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যে আমার মরদেহ দেখতে আসেনি?
আমি আজও জীবিত-
তার চোখেও!
শুরু হলো আমার মরণদৌড়। ছিটকে পড়া দিগন্ত থেকে তোমার দিকে। দৌড়াচ্ছি, আজও দৌড়াচ্ছি। বায়ান্ন বছর যে পেরিয়ে গেল, খেয়ালই করিনি। তবুও, তবুও তোমার নাগাল পেলাম না।
ভুল বললাম; কেবল দৌড়াইনি, দাঁড়িয়েও ছিলাম। তুমিই আমাকে লেবুগাছতলে দাঁড় করিয়ে রেখে হাতে মেহেদি লাগাতে চলে গেলে। যাবার বেলায় দুটি লেবুপাতা কুটি কুটি করে ছিঁড়লে; তারপর হাতের তালুতে করে ইশারায় মৃত্যুর গন্ধটুকু নিতে বললে। সেই গন্ধ নিতে গিয়ে তোমার তালুর ঝাপসা রেখাগুলোর ঘ্রাণও আমি পেয়েছি। সামান্য এই গন্ধচুরি তুমি টের পাওনি। আর আমি নিজেও টের পাইনি যে, শুরুতেই আমি শেষ হয়ে গেছি।
তুমি চলে গেলে, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম লেবুগাছতলে- কচলানো লেবুপাতা মুঠোয় করে। দিন গেল, রাত গেল, মাস গেল, বছর গেল, ঘুম গেল। পড়ে থাকল শুধু স্বপ্ন।
১৯৭৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। নিজেকে প্রস্তুত মনে হলো। ভেবেছি সবার আগে তোমাকে গিয়ে বলব- 'জানো, আজ আমি চাকরিতে যোগদান করেছি!' এটা একটা বিকল্প বাক্য মাত্র। আসলে আমার সাহস ছিল না যে, বলি- '...তোমাকে আমি ভালোবাসি, তোমাকে চাই।' শেষ পর্যন্ত সবগুলো কথাই অনুচ্চারিত রয়ে গেল। তার আগেই তোমার হাতের মেহেদি অর্থবহ হয়ে গেছে।
আমি আবার ফিরে গেলাম লেবুগাছের সবুজ অন্ধকারে। দাঁড়িয়ে থাকলাম বছরের পর বছর। মুঠোবন্দি পাতাগুলো খুলে দেখতে ভয় পাচ্ছি। বাতাসে বিষণ্ণতার গান আর আমার অবাস্তব অপেক্ষ। না, আমি অপেক্ষা করছিলাম না; অপেক্ষা করছিল আমার না-বলা কথাগুলো। এবারের কথাগুলো এ রকম- 'সামান্য গন্ধটুকু আমি চুরি করেছি, সেটুকু ফেরত দিতে চাই। আর, তুমিও আমাকে আমার কাছে ফেরত দাও।'
ঝটকা-চুলের দৃশ্যকলা দিয়ে শুরু, সামান্য ওটুকুতেই আমি শেষ। তারপর লেবুপাতার হত্যাকাণ্ড, তারপর শরীরের ঝাপসা ঘ্রাণ। সামান্য এটুকু চুরির জন্যে, আমার না-বলা কথাগুলোকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে! তাও এক বছর-দু'বছর হলে কথা ছিল,- না, হায়রে বছর! সেই যে তুমি গেলে আর এলে না। আবার সেই ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। আমাকে চুরি করে এভাবে পালিয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি। কর্পূরের গন্ধে আমি পাথর হয়ে গেলাম। পাথরেরও পা থাকে। গড়াতে গড়াতে আমি সবখানে যেতে থাকলাম।- যেখানে যেখানে তোমার চিহ্ন পড়ে আছে, সবখানে। যেখানে তোমার জন্ম, সেইখানে। হাঁটতে হাঁটতে তুমি ভাত খেতে এঘরে-ওঘরে, সেইখানে। যে খাটে তুমি অদেখা ভঙ্গিমায় ঘুমোতে, আলতোভাবে সেটাকে ছুঁয়েছি। বিয়ের আগে, যে জানালা দিয়ে তুমি দক্ষিণের আকাশ দেখতে, আকাশের চাঁদ দেখতে, সেই জানালা দিয়ে আমার পাড়াটা স্পষ্ট দেখা যায়। অথচ তোমার কাছে চিরকালই আমি অস্পষ্ট রয়ে গেলাম।
আবারও কি ভুল বললাম? - তুমি নেই, তুমি চলে গেছ। একদিন কন্যা ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। একদিন জায়া ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। একদিন জননী ছিলে, খরচ হয়ে গেলে। কিন্তু কোনোদিন কারও প্রেমিকা ছিলে-না, এখন হয়েছ। তুমি খুব একটা কাছে আসতে না, এখন আসো। তুমি বেছে নিয়েছ আমার ঘুমের ভূগোল। আমার লেখার টেবিলে এসে বসো। কবিতার খাতাগুলো টেনে নাও। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখো। খুঁটে খুঁটে বেছে নাও নিজেকে, তারপর নিজেকে গিলে খাও, নিঃশেষ করে ফেলতে চাও। এখন তুমি ডাইনি হয়ে গেছ।
নাহ, এও বোধহয় ভুল বললাম। সেই রাতে পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে আকাশ বানালে, তারপর হয়ে গেলে ধ্রুবতারা। ঠিক আছে, ওভাবেই জ্বলতে থাকো তুমি। আমি ঘুমাই। আমাকে ঘুমের মধ্যে বরফের মতো গলে যেতে দাও। বায়ান্ন বছর ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।
পরিশিষ্ট : মৃত্যুদৃশ্য
প্রচণ্ড ঘুম পেয়েছিল আমার- আলকাতরার চেয়েও ঘন, থিকথিকে।
সাব্যস্ত মৃতদেহটাকে গর্তের মধ্যে মাটি-চাপা দিয়ে
তারপর ফিরে গেলে যার যার জীবিত আস্তানায়।
আমার শিয়রে কয়েকটা আগরবাতি তখনও উড়ছে,
তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে আসছিল গেরুয়া গন্ধ-
আমি বিভোর, আমি কৃতজ্ঞ।
মাত্র একটা বৃষ্টি হতে দাও, দেখবে-
নয়টা আগরবাতির বিনিময়ে ঠিকই পাঠিয়ে দেবো
উদ্গত ঘাসের সবুজ, যার অজস্রতা গুনতে গুনতে
তোমরা পৌঁছে যাবে আমার কাছে।
তখন আমি জানতে চাইবো তার কথা
যে আমার পাশে শুয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল।
আমার চোখ দুটো তৃণের শিকড় বেয়ে কীভাবে উঠে আসছে দ্যাখো,
কাণ্ড বেয়ে, ডাল বেয়ে চূড়ান্ত সূক্ষ্ণতায়।
তোমরা তাকে দেখতে পাচ্ছ-
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যে আমার মরদেহ দেখতে আসেনি?
আমি আজও জীবিত-
তার চোখেও!
- বিষয় :
- প্রচ্ছদ
- ময়ুখ চৌধুরী
