ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জানালা

আড্ডা-তর্ক-মনন ও সৃজনসঙ্গীরা

আড্ডা-তর্ক-মনন ও সৃজনসঙ্গীরা
×

রফিকউল্লাহ খান [জন্ম: ২১ জানুয়ারি ১৯৫৭]

রফিকউল্লাহ খান

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৫ | ০০:২৭

বিশ্ববিদ্যালয় ও লেখকজীবনে আড্ডা ও তর্কবিতর্কই লেখকদের মনন-সৃজন সমৃদ্ধ করে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এবং এর আগেপরেও আড্ডার একাধিক পরিমণ্ডল ছিল। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে যখন যেখান থেকে পেরেছি প্রয়োজনীয় রসদ আহরণ করেছি। সতীর্থদের সঙ্গে আড্ডা ছিল একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেই সতীর্থদের ভেতর থেকেই বেশ কয়েকজন হয়ে উঠল সাহিত্য-শিল্পচর্চার আজীবনের সঙ্গী। সবচেয়ে দীর্ঘায়ু আড্ডাটি ছিল ফুলার রোডের ১২/এইচ বাসায়। 
সত্তর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তরুণ শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনের বাসভবন। সাহিত্য-শিল্প-দর্শন  ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যার আলোচনা সেখানে হতো না। সেই আড্ডার প্রায় নিয়মিত অংশী ছিলেন ড. এ কে এম খায়রুল আলম, কবি অধ্যাপক মাহবুব সাদিক, ড. সুকুমার বিশ্বাস, অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী প্রমুখ।
আশি-নব্বই দশকের অনেক তরুণ লেখক-কবিও ওই আড্ডায় অংশ নিতেন। স্বাধীনতা-উত্তর নতুন সাহিত্য-সমালোচনার রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল সেই আড্ডা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্বরে বর্তমান ডাকসু ভবন এলাকায় গড়ে উঠেছিল আরেকটি অবিস্মরণীয় আড্ডা। লেখক-চিন্তক-কবি আহমদ ছফা ছিলেন ওই আড্ডার মধ্যমণি। সন্ধ্যা-পরবর্তী দীর্ঘ-সময়ব্যাপ্ত আড্ডার অনেকের মধ্যে লেখক-গবেষক অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসানের নাম বিশেষভাবে মনে পড়ছে। ওই আড্ডা ছিল বহু মত ও পথের মিলনকেন্দ্র। এ আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্যনতুন প্রসঙ্গ। এই আড্ডা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘মূলভূমি’ নামক সৃজনশীল ছোটকাগজ। 
এই আড্ডায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই সত্তর-আশির দশকের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। আরেকটি সৃষ্টিশীল আড্ডা জমে উঠেছিল ‘বিপক্ষে’ নামক সাহিত্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। আড্ডা অপেক্ষা কর্মতৎপরতাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিতেন। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আহমদ বশীর, জাহিদ হায়দার, আবু সাঈদ জুবেরী, সৈয়দ কামরুল হাসান প্রমুখ। সিদ্ধেশ্বরী-মালিবাগ-মৌচাককেন্দ্রিক এই সাহিত্য আন্দোলন জন্ম দিয়েছিল ‘বিপক্ষে’র আটটি সমকালের সাহিত্যধারাবিরোধী সংখ্যা। 
আমার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বা আংশিক হলেও রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে-ওঠা সৃষ্টিশীল আড্ডার উত্তাপ আমাকে ভালোভাবেই স্পর্শ করে যেত। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং হাজী মুহম্মদ মহসীন হলের মাঝামাঝি গভীর রাতের সেই আড্ডার স্মৃতি অনেকটা শিহরণ জাগানিয়া। সেনা শাসনামলে রাত ১২টা থেকে ১৪৪ ধারার কালে কলাভবন থেকে নীলক্ষেতগামী রাস্তার মাঝে বসত আমাদের দীর্ঘ আড্ডা। নকিব ফিরোজ, তুষার দাস, আহমদ আজিজ, সৈয়দ  আজিজুল হক (মাসুম), মুজাহিদ শরীফ ও মইনুদ্দিন খালেদ মিলে শিল্প-সাহিত্যের এক মগ্নস্রোত সৃষ্টি হতো সেই আড্ডায়। 
এইসব আড্ডা কিংবা যে সূত্রেই হোক, বিচিত্রভাবে ইংরেজি সাহিত্যের দুই তুখোড় ছাত্র গোলাম ফারুক খান ও আবেদীন কাদের এবং জন্মবাউল মঈনুস সুলতানের সঙ্গ ও জ্ঞানস্পৃহা এখনও অমলিন করে রেখেছে বন্ধুত্ব। v
 

আরও পড়ুন

×