ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাথরে বন্দি মানব জীবনগাথা

পাথরে বন্দি মানব জীবনগাথা
×

ভাস্কর্য :: ময়নুল ইসলাম পল

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৪ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৫ | ০৭:৩৯

পাথর প্রকৃতির এক নিরাবেগ সৃষ্টি। সহস্র বছরের প্রলেপে জমাটবাঁধা, নিঃশব্দে ইতিহাসের ভার বহনকারী এক জড়বস্তু। তবু এই পাথরই হয়ে ওঠে জীবনের আরেক মুখচ্ছবি, যখন কোনো শিল্পীর হাতের স্পর্শ তাকে জাগিয়ে তোলে। এমনই এক শৈল্পিক জাগরণের সাক্ষী হচ্ছে লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্র, যেখানে শুরু হয়েছে ভাস্কর ময়নুল ইসলাম পলের একক প্রদর্শনী ‘পাথরের বৈভব’।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসিমা হক মিতু ও লেখক-সাংবাদিক ইমতিয়ার শামীম। পুরো প্রদর্শনীটির কিউরেশনও করেছেন নাসিমা হক মিতু।

প্রদর্শনীজুড়ে রয়েছে নানা আকার-আকৃতির বিমূর্ত ভাস্কর্য। যেগুলোতে পাথর কেটে নির্মিত হয়েছে প্রকৃতির বহুবর্ণ রূপ। কোনো ভাস্কর্যে মানুষের সরব উপস্থিতি, কোনোটি আবার প্রাণীর বৈচিত্র্য। তবু সবকিছুর মাঝেই ভাস্কর্যের হাতের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব স্পষ্ট।

দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়–শান্ত ধূসর প্রেক্ষাপটে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বিমূর্ত রচনার পাথুরে শরীর। আলোকছায়ার মৃদু খেলায় যেন তারা এক একটি নীরব সংলাপের মুখর অনুরণন। গ্যালারির শুভ্র দেয়ালের পটভূমিতে এই সব পাথর যেন মূর্ত হয়েছে শিল্পীর অন্তর্জাগতিক অনুভব থেকে, গড়ে তুলেছে রূপ ও রূপরহিতের এক মোহময় সম্মিলন।

গ্যালারির একদিকে পাশাপাশি তিনটি ছোট শিলাকৃতি যেন দাঁড়িয়ে আছে এক গোপন কথোপকথনে। একটির মাথা যেন সামান্য ঝুঁকে আছে, অন্যটি ছুঁচালো অবয়বে আকাশের দিকে ছুটছে। এই রচনাগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট চেহারায় বাঁধা না থাকলেও তারা স্পষ্টতই প্রকাশ করে মানব অনুভবের গতি, আত্মমগ্নতা, প্রত্যয় এবং কখনও বা দ্বিধা। নিজের সৃজনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ময়নুল ইসলাম পল বলেন, ‘আমি কাজের শুরুতে মিনিমালিস্ট ভাবনায় দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করি। কখনও পাথরের নির্দেশ মেনে চলি, কখনও তাকে নিয়ন্ত্রণ করি। এই দুই অবস্থার সমন্বয়েই আমার কাজের জন্ম হয়। বিষয়গুলো শুধু বর্তমান নয়; বরং দূর অতীতের সময়, অসময় ও মানুষের ইতিহাসকে একসঙ্গে মেলে ধরতে সাহায্য করে। এ ছাড়াও দর্শনার্থীরা এখানে এসে দেখতে পাবেন, কীভাবে পাথরের মতো কঠিন ও নীরব বস্তুর ভেতর থেকেও ফুটে উঠতে পারে শৈল্পিক রূপকথা।’

ইমতিয়ার শামীম প্রদর্শনীটিকে এই জনপদের নাগরিক জীবন ও ভাস্কর্যকেন্দ্রিক চর্চায় এক নতুন পরিসর বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৫ বছরের ভাস্কর্যচর্চায় পল আধুনিকতা ও ব্যক্তিগত নৈঃসঙ্গের পাশাপাশি লোকজ ফর্মের গভীর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন। উপকরণের আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রস্তরের বুকে তুলে ধরেছেন জীবনের নানা আখ্যান। এই অঞ্চলের ভাস্কর্যচর্চার সীমাবদ্ধতাকেই তিনি শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন।’

কিউরেটর নাসিমা হক মিতু বলেন, ‘পলের পাথর তক্ষণ (খোদাই) ভাস্কর্য তাঁর পূর্বের কাঠ তক্ষণ কাজ থেকে খুব ভিন্ন নয়। এখানেও রেখা ও তলের সমন্বয় প্রধান। তবে পাথরের ছোট আকার ও তক্ষণের নিজস্ব প্রক্রিয়া এসব কাজকে দিয়েছে এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। কোনোটি পাথরের শক্ত চরিত্রকে ধরে রেখেছে, আবার কোনোটি যেন মাটির মতো কোমল অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছে।’ উপকরণের প্রতি সংবেদনশীলতা ও তার স্পর্শের অনুভূতিই পলের ভাস্কর্যের মূল শক্তি বলে মনে করেন তিনি।
‘পাথরের বৈভব’ প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে আগামী ১৮ আগস্ট পর্যন্ত, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। 

আরও পড়ুন

×