সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র ‘নয়নচারা’
দুর্ভিক্ষের শহরে স্মৃতির মুদ্রা বিনিময়
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ [১৫ আগস্ট, ১৯২২–১০ অক্টোবর, ১৯৭১]
অলাত এহ্সান
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় ছিয়াত্তর বছর আগে (১৯৪৯ সাল) প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসের শুরুতেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ লিখেছেন, ‘শস্যহীন জনবহুল এ-অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেরিয়ে পড়বার ব্যাকুলতা ধোঁয়াটে আকাশকে পর্যন্ত যেন সদাসন্ত্রস্ত করে রাখে। ঘরে কিছু নেই। ভাগাভাগি, লুটপাট, আর স্থানবিশেষে খুনাখুনি করে সর্ব প্রচেষ্টার শেষ।’ যেন দেশভাগ-উত্তর দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সাহিত্য প্রতিবেদন লিখছেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূত-ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, কোন প্রশ্ন কখনও কখনও অর্থনৈতিক সংকটকেই ছাপিয়ে যাবে, তার ইঙ্গিত দিয়ে ওই উপন্যাসেরই একটি বাক্য লিখেছেন, ‘শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধর্মের চেয়ে টুপি বেশি।’ যেমনটা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ‘নয়নচারা’ গল্পেও, ‘আর দেহের সাথে জমির কোনো যোগাযোগ নেই, যে-হাওয়ায় তারা চঞ্চল কম্পমান, সে-হাওয়াও দিগন্ত থেকে উঠে-আসা সবুজ শস্য কাঁপানো সূক্ষ্ম অন্তরঙ্গ হাওয়া নয় : এ-হাওয়াকে সে চেনে না।’ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর লেখায় ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য এমন অনেক ইঙ্গিত, প্রশ্ন রেখে যান। এই প্রশ্নকে আমরা এড়াতে পারি না।
১৯৪৫ সালে প্রকাশিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘নয়নচারা’ দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা। অর্থনীতিবিদেরা বহু গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, আধুনিক সময়ে দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়, বরং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ। এই সময়ে দুর্ভিক্ষ যতটা না সম্পদের অভাবের কারণে, তার চেয়েও বেশি সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যের কারণেই দুর্যোগ ঘটে। বিশ্বরাজনীতি সচেতন লেখক ওয়ালীউল্লাহ্ সেটা অজানা নয়। আজকের দিনে ভারসাম্যহীন বিশ্বব্যবস্থায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে শঙ্কা, আলোচনা তাই আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর কর্মজীবনের শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দূতাবাসে কাজ করেছেন। ফলে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে জানাবোঝা তাঁর কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ‘নয়নচারা’য় গ্রামের ঘরবাড়ির, নদীর, সহানুভূতির, শস্যের, ভরা পেটে নক্ষত্র দেখার স্মৃতি নিয়ে আসা কিশোর আমু শহরের বাস্তবতায়, ক্ষুধায়, দুরাচারের সঙ্গে যুঝে উঠতে চেষ্টা করে। যেন পকেটভর্তি গ্রামের ওইসব ঐশ্বর্যমণ্ডিত স্মৃতি মুদ্রার মতো সঞ্চিত আছে তার। শহরের প্রতিটি বাস্তবতার সঙ্গে তা খরচ করে নিজের জন্য একটু আশ্রয় করে নিতে চাইছে। হালের সায়েন্সফিকশনগুলো যেমন দেখায়, মানুষগুলো রোবটের মতো বৈদ্যুতিক চার্জ ছাড়া চলতেই পারে না, করুণ-কঠিন বাস্তবতায় আমুর অবস্থাও তাই। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন’ বলতে পারা আমু যেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ দেখছে। তাতে কারও মনে আঘাত লাগলে আমুর জিজ্ঞাসা, ‘জানো, সারা আকাশ আমি বিষাক্ত রুক্ষ জিহ্বা দিয়ে চাটব, চেটে-চেটে তেমনি নির্মমভাবে রক্ত ঝরাব সে-আকাশ দিয়ে– কে তুমি, তুমি কে?’ এই ‘তুমি’ কি কলাকৈবল্যে ভোগা মানুষকে বলছেন লেখক?
কিশোর আমুর কাছে তার গ্রামের একটা নদীর স্মৃতি আছে, ময়ূরাক্ষী। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার নদীটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। ব্রাহ্মণী, দ্বারকা কোপাই, কুশকর্ণী নদী ও বক্রেশ্বর নদ এর থেকেই তৈরি। ফলে নদীটা কখনও জলশূন্য ছিল না, পারের মানুষগুলোও নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ভেতর দিয়ে কখনও মাছ-ভাত ছাড়া ছিল না। সেই নদীর স্মৃতির ধারক আমু নিজেকে দেখে একটা রুক্ষ কালো পথের ধারে। স্মৃতি থেকে সে ‘ভাবছে যে এরই মধ্যে হয়তো-বা ডিঙির খোদল ভরে উঠেছে বড়-বড় চকচকে মাছে– যে-চকচকে মাছ আগামীকাল চকচকে পয়সা হয়ে ফিরে ভারি করে তুলবে জেলেদের ট্যাক।’
‘ট্যাক’ মানে কোমরে বাঁধার মতো কাপড়ে তৈরি টাকা রাখার ব্যাগ। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েও পরে ছেড়ে ওয়ালীউল্লাহ্ যে অর্থনৈতিক-বাস্তবতার বিষয়ে সচেতন হবে, তা প্রায় প্রত্যাশিত। অতি মুনাফামুখিতা যে বাণিজ্যকে শেষ পর্যন্ত মানবঘাতী করে তুলবে, সেটা তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা থেকেই আসে। ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পাঞ্চল, বন্দরগুলো লাখ লাখ শ্রমিক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, একই সময় লাখ লাখ টন খাবার আমাজন নদীতে ফেলে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবু অনাহারী মানুষকে দেওয়া হচ্ছে না, পণ্যে চাহিদা কমে যাবে বলে। ওয়ালীউল্লাহ্ তা অজানা ছিল না। গল্পের আমু তেমনি গ্রামে যাপন করা কতগুলো ধারণা দিয়ে শহর, মানুষকে বুঝতে চাইছে। তার কাছে, ‘আশ্চর্য কিন্তু একটা কথা: শহরের কুকুরের চোখে বৈরিতা নেই। (এখানে মানুষের চোখে, এবং দেশে কুকুরের চোখে বৈরিতা।)’ ফুটপাতে আমুকে মাড়িয়ে যাওয়া লোকটি অন্ধ নাকি, ভেবেই আমু ‘মনে-মনে হঠাৎ হাসল একচোট’, আত্মপ্রবোধের মতো প্রশ্ন করে, ‘অন্ধ না হলে অমন করবে কেন? দেখতে পেত না যে সে মানুষ?’ দিঘল কালো চুল মানেই তার কাছে ‘নয়নচারা গাঁয়ের মেয়ে ঝিরার মাথার ঘন কালো চুল।’ দানশীলা নারী মনে হতেই সে প্রশ্ন করে, ‘নয়নচারা গাঁয়ে কি মায়ের বাড়ি?’
যে পথে পাশে আমু পড়ে থাকে আরও অনেকের সঙ্গে, সেই পথে ঘরে পৌঁছানো যায় না। আর ঘর যদিও দেখা যায়, তবে কিছুতেই পৌঁছানো যাবে না সেখানে। ফলে নদী ভেবে যে পথের পাড়ে বসে আছে আবু একদিন ভেসে যাবে বলে, তার প্রশ্ন তৈরি হয়, ‘প্রশস্ত নদী তাকে নিয়ে যাবে ভাসিয়ে, দূরে বহুদূরে– কোথায় গো? যেখানে শান্তি– সেইখানে? কিন্তু সেই শান্তি কি বিস্তৃত বালুচরের শান্তি?’ কারণ সে নয়নচারা গ্রামে ঘাসের ওপর শুয়ে তারাগুলো দেখেছে, তার নিচে ছিল ঢালা মাঠ, ভাঙা মাটি, ঘাস, শস্য, আর ময়ূরাক্ষী। কিন্তু শহরের তারাগুলোর নিচে খাদ্য নেই, দয়ামায়া নেই, রয়েছে শুধু হিংসাবিদ্বেষ নিষ্ঠুরতা, অসহ্য বৈরিতা। সেখানে ‘সে মরেছে, ও মরেছে; কে মরেছে বা কে মরছে সেটা কোনো প্রশ্ন নয়।’ দুর্ভিক্ষের বাস্তবতায় গল্পটা লেখা হলেও গল্পজুড়ে বীভৎসতার চিত্রায়ণ এতে নেই। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে, এই যে না বলে সব বলে দেওয়া এটা কলকাতার ‘কল্লোল’।
- বিষয় :
- দুর্ভিক্ষ
