ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আহমদ রফিক [১৯২৯–২০২৫]

রবীন্দ্রভুবনে পতিসর

রবীন্দ্রভুবনে পতিসর
×

হাসনাত আবদুল হাই

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথের পল্লীবিষয়ক চিন্তা ও পরিকল্পনা তাত্ত্বিক রূপ পায় তাঁর দীর্ঘ রচনা ‘স্বদেশী সমাজ’ (১৯০৪) প্রবন্ধে। এই বিষয়ে যে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হতে শুরু করে, তার প্রমাণ দেখতে পান আহমদ রফিক পরবর্তী পরিপূরক রচনা ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’য় (১৯০৫)। 

সৃজনে ও মননশীলতায় বাসভূমি ও পরিবেশের প্রভাব যতটা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্য লেখক-শিল্পীদের জীবনে কমই পরিলক্ষিত হয়। ছেলেবেলা থেকে তারুণ্যের বয়সকাল পর্যন্ত জোড়াসাঁকোর সাংস্কৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছিল তাঁর রুচি এবং শিল্পবোধ। যৌবনে জমিদারির কাজে শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পতিসরে বিভিন্ন মেয়াদের বাস তাঁকে দিয়েছিল প্রকৃতি ও মানুষের নিকট সাহচর্য। নগর সংস্কৃতি থেকে দূরের এই জীবনযাপনের প্রভাব পড়েছে তাঁর লেখায় এবং চিন্তাভাবনায়। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনে তাঁর জীবনযাপন, সৃষ্টি ও বহুমুখী কর্মকে বলা যায় শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর পর্বে অর্জিত অভিজ্ঞতার প্রসারণ ও সমৃদ্ধায়ন।
শিলাইদহ, সাজাদপুর এবং শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বের বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর নিজের লেখায় এবং অন্যের গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থে। তুলনায় পতিসরে তিনি যে ক’বছর ছিলেন তাঁর ওপর লেখা তুলনামূলকভাবে কম। রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিক পতিসরে রবীন্দ্রভুবন খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে। কাজ শুরু করার পর তিনি বুঝলেন যাতায়াতের কষ্ট এবং সরেজমিন তথ্যের অভাবে রবীন্দ্রগবেষকদের ইচ্ছে থাকলেও রবীন্দ্রনাথের পতিসর পর্বের ওপর বিশদভাবে কিছু লেখা হয়নি। তথ্য কেন অপ্রতুল তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভূমিকায় তিনি লিখেছেন: ‘পঞ্চাশের দশকে জমিদারি উঠে যাওয়ার পর পতিসর যেন বেওয়ারিশ হয়ে যায়। অভিভাবকহীন, অসহায়, দুস্থ পতিসর। ... তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে কাছারিবাড়ি ও তার বিষয়-আশয় সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিয়ে। বিন্দুমাত্র ইতিহাসচেতনার প্রমাণ দেয়নি পাকিস্তান আমলে পূর্ববঙ্গীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ। ফলে নিশ্চিহ্ন হয়েছে জমিদারি পরিচালনাসংক্রান্ত মূল্যবান দলিল-দস্তাবেজ, চিঠিপত্র এবং অন্যান্য উপকরণ।’
আহমদ রফিক তথ্যের অনুসন্ধানে পতিসর কাছারিবাড়িতে সরকারের রাজস্ব বিভাগের তহশিল অফিসে গিয়ে কোনো তথ্য পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। একইভাবে অসফল হয়েছে তাঁর নাটোরের রাজস্ব অফিসে পতিসরে রবীন্দ্রনাথের জমিদারিবিষয়ক তথ্য পাওয়ার প্রচেষ্টা। এমনকি রাজশাহী জেলা রাজস্ব অফিসেও তল্লাশি করে কোনো ফল দেয়নি। শেষ চেষ্টার মতো পতিসর ও আশেপাশের হাটে ঢেঁড়া পিটিয়ে অর্থের বিনিময়ে তথ্য গ্রহণ করা হবে জানিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনও এই গবেষণাকাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেনি, এ কথা ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন আহমদ রফিক। 


রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার লাভের পর পতিসরের (কালিগঞ্জের) প্রজাদের দেওয়া মানপত্রটির আলোকচিত্র ছাড়া সেখান থেকে তিনি আর কোনো তথ্য পাননি। এই প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের জীবনীকারদের কয়েক খণ্ডের রচনাতেও পতিসর সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্যগত দুষ্প্রাপতা সত্ত্বেও ‘যা কিছু আছে’ তাই নিয়ে পতিসরের রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রানুরাগী মহলে উপস্থিত করাটা ইতিহাস- বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তাঁর কাছে। এই ‘যা কিছু’র মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা এবং কতিপয় রবীন্দ্রগবেষকের সূত্র। তিনি প্রাপ্ত তথ্যের সদ্ব্যবহারে কোনো ত্রুটি থাকতে দেননি, এই দাবির ভিত্তিতে লিখেছেন ‘রবীন্দ্রভুবনে পতিসর’ (১৯৯৮)। তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে অযথা গালগল্প জড়ো করা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা হয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন পাঠককে। প্রথম দৃষ্টিতে পতিসর-কালিগ্রামে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং সেখানকার পরিবেশ রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি, এ কথা ১৩ এবং ১৭ জানুয়ারি তারিখে স্ত্রীকে লেখা তাঁর চিঠি থেকে জানা যায়। আহমদ রফিক অনুমান করেছেন রাস্তার ঝামেলা, চলনবিলের বিশাল বিস্তার এবং পতিসরের কাছে নাগর নদীর ক্ষীণকায়া দৃশ্য তাঁর বিরূপতার কারণ হতে পারে। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের লেখা (ছিন্নপত্র) থেকে দেখতে পেয়েছেন পতিসর অতি দ্রুত তাঁর মন জয় করে নিয়েছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় পতিসরে পৌঁছানোর পর প্রায় প্রতিদিন ইন্দিরা দেবীকে লেখা তাঁর চিঠিতে। যেখানে দেখা যায় পতিসরের গ্রাম, নাগর নদী এবং প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা। নাগর নদীর পানিতে যে শ্যাওলা দেখে রবীন্দ্রনাথ প্রথমে অস্বস্তি বোধ করেছিলেন, সেই শৈবালে ‘সরস নবীন কোমলতা’ দেখে মুগ্ধ হতে তাঁর সময় লাগেনি। পতিসরের নাগর নদীর ঘরোয়া সৌন্দর্য আবিষ্কারের পর ক্ষীণস্রোতা এই নদীকে ভালোবেসে তিনি লেখেন ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’। এমনকি যে চলনবিলের অসীমতা দেখে তিনি হতাশ হয়েছিলেন, সেই বিলের বিস্তার তাঁকে নদীর দুই তীর বন্ধনীর মধ্যকার সৌন্দর্য সম্পর্কে ভাবতে দিয়েছিল। তিনি ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন: ‘এইবার এই বিলের পথ দিয়ে কালিগ্রামে আসতে আসতে আমার মাথায় একটি ভাব পরিষ্কাররূপে ফুটে উঠেছে।’ (ছিন্নপত্রাবলী, পৃ ১৬৬, বিশ্বভারতী, ১৩৯৯)।
পতিসরে এবং আশেপাশে কৌতূহল নিয়ে ঘোরার সময় কখন কোন কবিতা (মধ্যাহ্ন, সন্ধ্যা ইত্যাদি), গান (আমি কান পেতে রই ইত্যাদি) বা গল্প (প্রতিহিংসা, শাস্তি ইত্যাদি) এবং কাব্যনাট্য (বিদায় অভিশাপ) লিখেছেন তার উল্লেখ করেছেন আহমদ রফিক। সাধারণভাবে পতিসর তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রভাব ফেলেছে নিসর্গ সৌন্দর্যের বিচিত্র প্রতিভাসে। শিলাইদহ বা সাজাদপুরে এই বৈচিত্র্য ছিল না। পতিসরে চলনবিলের অসীমতার পাশাপাশি ছিল ছোট নদী নাগরের গার্হস্থ সরলতা, যে বৈপরীত্য তাঁর কবিমনকে সচকিত করে সৃজনের বিচিত্র পথে চালিত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর ভাববাদী রোমান্টিক মনের এই বিচরণে রাশ টেনে ধরেছিল কাছে থেকে দেখা পতিসরের মানুষদের হীন-স্বাস্থ্য এবং কঠিন দারিদ্র্য। শিলাইদহে পদ্মায় বোট দিয়ে ঘোরার সময় জনপদ ও দুই তীরের গ্রামীণ মানুষের জীবন তাঁর নিকটদৃষ্টিতে আসেনি, তিনি কেবল দূর থেকেই দেখেছেন। পতিসরে নিসর্গের সৌন্দর্য তাঁর রোমান্টিক মনে যে আলোড়ন তোলে, তা যুগপৎ অবসিত হয় নদীতীরবর্তী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে। আহমদ রফিক লিখেছেন: ‘ঐ ভাববাদিতার ঢেউ কদিনের মধ্যেই ভিন্ন এক বাস্তবের টানে দূরে চলে যায়।’ রবীন্দ্রনাথের লেখায় এবং চিন্তাভাবনায় যে দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্য দেখা যায়, তার উৎস রয়েছে পতিসরের গ্রামীণ জীবন-জনপদ এবং  প্রাকৃতিক পরিবেশের বৈপরীত্যে বলে মনে করেন তিনি। এই উপসংহার তাঁর পতিসরে রবীন্দ্রভুবন অনুসন্ধানের বড় সূত্র। এখানেই তাঁর পতিসর গবেষণার মৌলিকত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থের যে কটি কবিতা পতিসরে লেখা সেখানে বস্তুসত্যের তুলনায় ভাবসত্যের ভার অনেক বেশি। পাশাপাশি ‘চৈতালি’র কবিতায় তিনি দেখতে পান নিরাভরণ, নিরাবেগ বিষয় উচ্চারণ। পতিসর পর্বের কবিতা ‘দুই বিঘা জমি’ রবীন্দ্রনাথের ভাববাদী কাব্যচেতনার বিপরীত মেরুতে বলে তিনি রবীন্দ্রনাথ যে দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি হন সৃজনশীলতায় তার এটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। এই দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের ফলেই যে রবীন্দ্রনাথ পতিসরে কৃষকদের দারিদ্র্য দূর করার জন্য ধাপে ধাপে গ্রহণ করেন পল্লী উন্নয়নের কাজ, আহমদ রফিকের গবেষণা-বিশ্লেষণ এই উপসংহারে আসে। তিনি দেখান কীভাবে বিভিন্ন স্তরে পল্লীহিতৈষী দল তৈরি করে রবীন্দ্রনাথ রাস্তাঘাট নির্মাণ, স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ডিসপেন্সারি চালু করেন। কৃষকদের আয় বৃদ্ধির জন্য উন্নতমানের বীজ ব্যবহার, সার জৈব সার প্রয়োগ ইত্যাদি জনপ্রিয় করার জন্য গঠিত হয় সমবায় পদ্ধতি। অ-কৃষি খাতে আয় বৃদ্ধির জন্যও গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন সমবায়। এইসব কাজে অর্থের বিনিয়োগের কথা ভেবে এবং মহাজনদের ঋণের ফাঁদ থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি পতিসরে স্থাপন করেন কৃষি ব্যাংক, যা ভারতবর্ষের কোনো গ্রামাঞ্চলে সেই প্রথম। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ চালু করে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রবীন্দ্রনাথ যে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে দায়িত্ব দিয়েছেন, সে কথাও বলেছেন আহমদ রফিক। গ্রামের দুঃখ-দারিদ্র্যের বিষয় তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। তাই জমিদারিটাকে অনেকটা কল্যাণী রাষ্ট্রের মতো ধরে নিয়ে সমবায়ী মডেলে পঞ্চায়েতধর্মী পল্লীসমাজ ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা রবীন্দ্রনাথের মনে এসেছিল বলে তাঁর ধারণা। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পল্লী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রেরণার কথা উল্লেখ করে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন পতিসরে আসার পর গ্রামীণ জনপদের মানুষ ও নিসর্গের সংস্পর্শেই এসে রবীন্দ্রনাথের জীবনে সাহিত্যে ও কর্মের ধারা পাশাপাশি চলতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের পল্লীবিষয়ক চিন্তা ও পরিকল্পনা তাত্ত্বিক রূপ পায় তাঁর দীর্ঘ রচনা ‘স্বদেশী সমাজ’ (১৯০৪) প্রবন্ধে। এই বিষয়ে যে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হতে শুরু করে, তার প্রমাণ দেখতে পান আহমদ রফিক পরবর্তী পরিপূরক রচনা ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’য় (১৯০৫)। এরপর আহমদ রফিক দুঃখের সঙ্গে বলেছেন রবীন্দ্রনাথের পল্লী উন্নয়ন ও স্বদেশী সমাজ গঠনের চিন্তা সমকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সাড়া জাগাতে পারেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে জনসাধারণ নয়, তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তার শ্রেণিস্বার্থের জন্য রবীন্দ্রনাথের পল্লী উন্নয়ন তথা কৃষক শ্রেণির আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিষয় সুনজরে দেখতে পারেনি। আর বিদেশি শাসকের পক্ষে তো এ চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথাই না।’ পতিসরে রবীন্দ্রনাথের জীবনযাপন, সাহিত্যচর্চা এবং পল্লী উন্নয়নের তথ্য বিশ্লেষণের জন্য আহমদ রফিক ব্যবহার করেছেন প্রধানত তাঁর লেখা ‘ছিন্নপত্র’। এখানে তাঁর কৃতিত্ব হলো এই যে তিনি বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করেছেন এক দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের তত্ত্ব। এর আগে কেউ এই তত্ত্বের ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় না। এখানেই রবীন্দ্রগবেষক হিসেবে আহমদ রফিকের সাফল্য। 

আরও পড়ুন

×