বুদ্ধিজীবী হত্যার কাঠামো
আলোকচিত্র : রশীদ তালুকদার
আফসান চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডিসেম্বর মাসে দেশব্যাপী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয়েছিল, সেখানে ডিসেম্বর মাসেও কয়েকজনকে উঠিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। বাংলা বিভাগের শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক রাশীদুল হাসান, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. সিরাজুল হক খান, ড. আবুল খায়ের, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, ডা. আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, গিয়াস উদ্দীন আহমেদ, ড. আবুল কালাম আজাদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, ডা. মোহাম্মদ মুর্তজা, ড. ফয়জুল মাহী, এ কে এম সিদ্দিক, ডা. ফজলে রাব্বি প্রমুখকে আলবদর বাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে যায়।
বুদ্ধিজীবী হত্যা সারাদেশে পরিচালিত হয়। সেখানে শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী
চোদ্দই ডিসেম্বর খুব ভোরে ঘুম ভাঙল মুনীর চৌধুরীর। হাত-মুখ ধুয়ে ধীরেসুস্থে নাশতা করলেন। তারপর আবার বিছানায়। রেডিও ছেড়ে শুয়ে শুয়ে খবর শুনতে লাগলেন। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় পাড়া নিঝুম। মাঝে মাঝে ভারতীয় বিমানের হামলা। দু-একটা গাড়ি ভর্তি পাকিস্তানি সেনা মাঝে মাঝে ছুটে চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় মুনীর চৌধুরীর ফ্ল্যাট যদিও দোতলায়, যুদ্ধের সময় তিনি নিচের একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন। শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনতে শুনতে এক সময় স্ত্রীকে ডেকে বললেন, শোনো, আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা বাকি আছে দেশ স্বাধীন হতে। সে সময় গলার স্বরে তাঁর স্থির বিশ্বাস ফুটে উঠেছিল।
এরই মাঝে স্ত্রী এসে একবার জিজ্ঞেস করলেন তিনি আর এক কাপ চা খাবেন কিনা। সম্মতি জানালেন। তারপর চা খেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। বিছানা ছেড়ে ওঠার পর মুনীর চৌধুরী গোসল করতে ওপরে চলে গেলেন। ময়লা কাপড়-চোপড়ও কিছু খোলেন। কারণ পরিবারের সবাই তখন ভাগাভাগি করে সংসারের কাজকর্ম সারেন। গোসল সেরে এসে স্ত্রীকে বললেন, যাও তোমার জন্য পানি গরম করে রেখেছি। তুমি গোসল করতে যাও। বলে তিনি নিজের ঘরে গিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগলেন। অসুস্থ স্ত্রীও গোসল করতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।
নিশ্চিত মনে চুল আঁচড়াচ্ছেন মুনীর চৌধুরী। বেলা তখন বারো কি একটা। এমন সময় নিচে লোহার গেটে শব্দ শোনা গেল। কে যেন দরজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী উঁকি দিয়ে দেখলেন কম বয়সী কয়েকটি বাঙালি ছেলে দরজা ধাক্কাচ্ছে। মুনীর চৌধুরী সে সময় স্ত্রীকে বললেন, থাক দেখার দরকার নেই। সরে এসো। বলে তিনি আবার চুল আঁচড়াতে লাগলেন। স্ত্রীর সাথে মুনীর চৌধুরীর ওই ছিল শেষ কথা।
এমন সময় নিচে থেকে তাঁর ছোট ভাই ওপরে এসে বললেন, মুনীর ভাই আপনাকে নিচে ডাকছে। মুনীর চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, আমার নাম করে বলেছে? হ্যাঁ।
পাঞ্জাবি পরে তিনি আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেলেন। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি চৌধুরী কিন্তু তখনও আতঙ্কিত হননি। তাঁর স্বামীকে কেউ যে ধরে নিয়ে যেতে পারে এ কথাও তাঁর মনে হয়নি। কারণ যারা তাঁকে ডাকতে এসেছে সবাই কম বয়সী, বাঙালি। তবু লিলি চৌধুরী সিঁড়ি ধরে নিচে নামলেন। দেখলেন মুনীর চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন নিচে। আশপাশে বন্দুক নিয়ে কয়েকটি অল্প বয়সী ছেলে। তিনি শুনলেন, মুনীর চৌধুরী তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের অফিসার কোথায়? এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটি ছেলে তাঁর পিঠের কাছে বন্দুক উঁচিয়ে বলল, আছে, আপনি চলুন। মুনীর চৌধুরী আস্তে আস্তে হেঁটে তাদের সঙ্গে চলে গেলেন।
নোট: একাত্তরে হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিকের হত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ দানের প্রয়াস বোধহয় সাধ্য ও সামর্থ্যের অতীত। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন। আমরা কেবল তার কতিপয় উদাহরণ উপস্থাপন করছি। ১৯৭৩-এ জাতীয় দিবস, বিশেষ সংখ্যায় মুদ্রিত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এই নিবন্ধটি ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ তারিখে ‘আলবদর’দের হাতে নৃশংসভাবে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত।
ড. সিরাজুল হক খান
যুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে তখন ড. সিরাজুল হক খান পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাতের বেলা ফ্ল্যাটের নিচের তলায় থাকতেন। সকালে আবার দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটে চলে যেতেন। ১৪ ডিসেম্বর খুব ভোরে তিনি ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়লেন। একবার ওপরে নিজের ফ্ল্যাটে গেলেন তারপর আবার নিচে নেমে এলেন। এবং সে সময় তাঁর নজরে পড়ল, একটু দূরে আলবদর বাহিনীর কিছু লোক রুমাল দিয়ে এক ভদ্রলোকের চোখ বাঁধছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওপরে উঠে গেলেন। সবাইকে বললেন, ‘ওরা আমাদের এলাকায় ঢুকেছে। তোমরা সাবধানে থেকো।’ তাঁর স্ত্রী তখন তাঁর জন্য নিজের হাতে ওষুধ তৈরি করছেন। তিনি ড. খানকে ওষুধ খেতে ডাকলেন। ড. খান ‘এসে খাব’ বলে নিচের তলায় বোটানির অধ্যাপক জনাব ইসমাইলের ড্রইংরুমে গিয়ে বসলেন। গল্প-গুজব করতে লাগলেন। এদিকে আলবদর বাহিনী ওপরতলায় তাঁর ফ্ল্যাটে এসে ঢুকে জিজ্ঞেস করল– ‘এটা ড. সিরাজুল হকের বাসা?’
‘হ্যাঁ।’
‘তিনি কোথায়?’
‘নিচে গেছেন।’
‘কোন বিভাগের অধ্যাপক তিনি।’
‘শিক্ষা-গবেষণা কেন্দ্র।’
‘হ্যাঁ, আমরা তাঁকেই খুঁজছি।’
এই বলে তারা ড. খানের ভাইকে নিয়ে ইসমাইল সাহেবের ড্রইংরুমে উপস্থিত হলো। ড. খানকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করল। তারপর তাঁকে ঘর থেকে বাইরে এনে, তাঁর পকেটের রুমাল দিয়ে চোখ বেঁধে অচেনা গন্তব্যের দিকে নিয়ে চলল। পরিবারের সবাই তাকিয়ে রইল বিমূঢ় হয়ে। ড. খান স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, নিচে থেকে এসে ওষুধ খাবেন। স্ত্রীর সঙ্গে ওই ছিল তাঁর শেষ কথা। কিন্তু ওষুধ খেতে তিনি আর ফিরে আসেননি।
শহীদুল্লা কায়সার
এমনিতে শহীদুল্লা কায়সার খুব কথা বলতেন। কিন্তু যেদিন যুদ্ধ শুরু হলো সেদিন থেকে তিনি চুপ। সারাদিন টেনশনে থাকেন। যুদ্ধের আগে তাঁকে অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। কারণ তিনি ব্যস্ত ছিলেন একটি উপন্যাস রচনায়। তাই তিনি বলতেন, ‘যুদ্ধ আমাকে দেখতে হবে। কারণ তথ্যগুলো আমার উপন্যাসে লাগবে।’
চৌদ্দই ডিসেম্বর। সকালবেলায় দেখা গেল বিদেশি দূতাবাসের নম্বরপ্লেট লাগানো একটি গাড়ি এসে শহীদুল্লা কায়সারের বাড়ি থেকে একটু দূরে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ গাড়িটা সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর এক সময় চলে গেল। সকাল নয়টা-দশটার দিকে সদরী ইস্পাহানীর টেলিফোন।
‘কী করব কায়সার সাহেব?’
কায়সার সাহেব তাঁকে অভয় দিলেন।
বেলা তখন তিনটা। বারান্দায় স্ত্রীর সঙ্গে বসে আছেন তিনি। এমন সময় দেখলেন টুপি মাথায় একটি লোক একদৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘তুমি ভিতরে যাও, দেখো না লোকটা কীভাবে তাকিয়ে আছে।’
সন্ধ্যা ছটা। শহীদুল্লা কায়সার বসে বসে খবর শুনলেন। এক সময় কাজের লোককে ডেকে বললেন, ‘আমার জন্য দুটো রুটি বানিয়ো।’ শহীদুল্লা কায়সার প্রায়ই স্ত্রীকে বলতেন, ‘দেখো, আমাকে যে কোনো সময় নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং সব সময় আমার জন্য কিছু কাগজ-কলম আর সিগারেট রেখে দেবে। আর কিছু টাকা।’ শহীদুল্লা কায়সার আরও বলতেন, ‘আমি একজন সাংবাদিক। তারা আমাকে যাই করুক মারবার সাহস পাবে না।’
কাজের লোককে তিনি রুটি বানাবার কথা বলছেন এমন সময় দরজায় ধাক্কা। মিলিটারি এসেছে। মিলিটারি এসেছে এ সংবাদ পেয়েই তিনি ইস্পাহানীকে টেলিফোন করলেন। কী কথা হয়েছে কেউ জানে না। শুধু দেখা গেল সংক্ষিপ্ত কথা শেষ হওয়ার পর তিনি চুপচাপ টেলিফোন রেখে দিচ্ছেন।
আলবদররা এদিকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তিনি বললেন, দরজা খুলে দাও। এ কথা বলে ওপরে বেডরুমে গেলেন, স্ত্রীকে বললেন, শিগগির আমাকে কিছু টাকা দাও। বলেই তিনি প্যান্ট পরতে লাগলেন। তাঁর স্ত্রী তখন বললেন, ‘টাকা দিতে বলে তুমি যাচ্ছ কই?’ শহীদুল্লা কায়সার বললেন, ‘না একটু ভালো পোশাক পরে নেই।’
স্ত্রী তাঁকে ঘরের বাইরে যেতে দেবেন না। কিন্তু তিনি যাবেনই। স্ত্রীকে বললেন, ‘আমাকে না পেলে ওরা বাসার সবাইকে মারবে।’
ইতোমধ্যে যিনি দরজা খুলে দিয়েছেন, তাঁকে আলবদররা সিঁড়ির কাছে বেঁধে রেখে সোজা দোতলায় উঠে তাঁর বেডরুমে ঢুকে পড়ল। বেডরুমটা বেশ বড়। অন্য এক দরজার কাছে শহীদুল্লা কায়সার দাঁড়িয়ে। ঘরের মাঝামাঝি তাঁর স্ত্রী। আলবদররা ঘরে ঢুকে শহীদুল্লা সাহেবকে দেখতে পেল না। তাঁর স্ত্রীকে একলা ঘরে দেখে তারা বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করল। এমন সময় পর্দার কাছ থেকে শহীদুল্লা কায়সার সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কাকে চান?’
‘আপনার নাম কী?’ তারা পাল্টা জিজ্ঞেস করল।
‘শহীদুল্লা কায়সার।’ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত ধরল। ‘আপনার সাথে কথা আছে’ বলে তারা তাঁকে বারান্দায় নিয়ে গেল। এদিকে বাসাজুড়ে হইচই চিৎকার। আলবদররা তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় শহীদুল্লা কায়সার কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো যাচ্ছিই। আপনারা আমার হাত ধরবেন না।’ এ বলে তিনি একবার পেছন ফিরে সবাইকে দেখতে চাইলেন। কিন্তু আলবদররা তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
সূত্র: অষ্টম খণ্ড, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র
১৯৭১: গণনির্যাতন-গণহত্যা: কাঠামো বিবরণ ও পরিসর, সম্পাদনায় আফসান চৌধুরী
- বিষয় :
- বুদ্ধিজীবী
