ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

‘সংগীতকে চিত্রে রূপ দিয়েছি’

‘সংগীতকে চিত্রে রূপ দিয়েছি’
×

রনজিৎ দাস [জন্ম: ১ মার্চ ১৯৫৬]

হামিম কামাল  

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর গ্যালারি কায়ায় চলছে শিল্পী রনজিৎ দাসের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘কাঠি, ড্রয়িং অ্যান্ড আদার্স’। শিল্পীর সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে প্রদর্শনীর ছবিগুলোর পেছনের গল্প, দর্শন, সামগ্রিক শিল্পভাবনাসহ শিল্পীজীবনের নানান দিক। আলাপনে হামিম কামাল  

lশিল্পী, কেমন আছেন? প্রদর্শনীর নাম ‘কাঠি, ড্রয়িং অ্যান্ড আদার্স’। আঁকার মাধ্যম হিসেবে কাঠির ব্যবহার নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।
llভালো আছি, ধন্যবাদ। প্রদর্শনীর এই নাম গৌতম চক্রবর্তীর দেওয়া (চিত্রশিল্পী গৌতম চক্রবর্তী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা শিল্পীদের অন্যতম দেবদাস চক্রবর্তীর সন্তান এবং গ্যালারি কায়ার স্বত্বাধিকারী)। এখানে বেশ কিছু ছবি আমি টুথপিক দিয়ে এঁকেছি। বিভিন্ন জিনিস দিয়েই ছবি আঁকা যায়। শিল্পীদের পৃথক করণকৌশল আছে এবং এ নিয়ে আলাদা নিরীক্ষার প্রবণতা ও কৌতূহলও তীব্র। শিল্পী আমিনুল ইসলাম শেষের দিকে গাছের পাতা দিয়ে ছবি এঁকেছিলেন। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ারও এমন আলাদা করণকৌশল ছিল, যার অনেকখানিই আমাদের অজানা। এমনও দেখেছি, শিল্পী চুলে রং মেখে, মাথা ক্যানভাসে ঘষছেন। আবার দেখেছি ক্যানভাসে পুরু করে রং লেপে তার ওপর হাতুড়ি পেটাচ্ছেন। রং ছুরিতে মেখে ক্যানভাসে অনন্য সব টেক্সচার তৈরি করছেন, ছবিও আঁকছেন। ছবি আঁকার ধারা এখন চিরায়ত ঐতিহ্যবাহী ধারা থেকে সরে এসেছে অনেকটাই। তরুণ শিল্পীরা ক্যানভাসের মধ্যেই তামার পাত, লোহাসহ নানান ধাতব বস্তু, পাথর প্রভৃতি ব্যবহার করছেন। শিল্পী নানান মাধ্যমে এভাবে নিজেকে যাচাই করতে চান। তুলি দিয়ে তো সবাই আঁকে। আমিও তুলি ব্যবহার করি, এখানেও করেছি। কাঠিও ব্যবহার করেছি।
lকিছু ছবির পেছনের কথা জানতে চাই। এখানে ঘোড়ার ছবি, মানবমুখ এসব মূর্ত-বিমূর্ত ফর্মে এসেছে। কোথাও ছবি পুরোপুরি বিমূর্ত। কোথাও নিসর্গ। নিসর্গের ছবিগুলোয় পর্যবেক্ষক যেন বিরাট প্রান্তরে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছেন। পোর্ট্রেটগুলোর কুশীলবরাও যেন নিঃসঙ্গ।
llনিঃসঙ্গতার যাপন আমার কাছে ধ্যানের মতো। মানুষ যখন ধ্যানস্থ থাকে, যখন প্রার্থনায় থাকে, সাধনায় থাকে, তখন সে নিঃসঙ্গতম। কেউ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, কেউ নিঃসঙ্গতা বেছে নেন। আমার স্বজন বিয়োগের পর–স্ত্রী, পুত্র–নিঃসঙ্গতা আমার কাছে এসেছে, অতঃপর আমি একে স্বাগত জানিয়েছি। 
lশ্রদ্ধা, প্রিয় শিল্পী। পোর্ট্রেটগুলো দেখে চরিত্রগুলো পর্যবেক্ষকের ঘনিষ্ঠ কেউ। শিল্পী যেন তাদের কাছ থেকে দেখছেন। যখন নিসর্গ এঁকেছেন, মনে হচ্ছে এর সঙ্গে বুঝি পর্যবেক্ষকের শারীরিক সান্নিধ্য নেই। কেমন বহুদূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখা!
llহ্যাঁ, যখন মানুষ বা প্রাণীকে দেখেছি, তখন কাছ থেকে দেখেছি, বুঝেছি। তাই সেসব ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ থেকে আঁকা। প্রকৃতিকে দেখেছি যখন, দূরে দাঁড়িয়ে তার সম্যক রূপ ধরতে চেয়েছি। নিসর্গের ছবি তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। 
lআপনার প্রায় ছবিতে, টেক্সচারে, বিশেষ করে অচেনা অক্ষরের আঁকবাঁক দেখতে পাই। এর পেছনের ভাবনাটা জানতে চাই। 
llহ্যাঁ, কাজটা আমি অনেক আগে থেকেই করি। কাঠি বা তুলি দিয়ে বর্ণের মতো রেখা, প্রতীক, চিহ্ন এঁকে যাওয়া। ছোট শিশুরা অনেক সময় মনের খেয়ালে আঁকিবুঁকি করে। বিষয়টি আমার মনে হয়তো ছাপ ফেলেছে। আবার রবীন্দ্রনাথ লেখার ফাঁকে ফাঁকে যেভাবে শিল্পসংগতভাবে অনেক লেখা কেটেছেন, কোনো লেখা আড়াল করেছেন, সেখানে নানা ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। সেসব যখন দেখেছি হয়তো আমার অবচেতন মনে ছাপ পড়েছে। পৃথিবীর অনেক অক্ষরের সঙ্গেই আমার পরিচয় নেই। অপরিচিত অক্ষরও মনে প্রিয় আবহ বা সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে। কখনও সেই আবহ তৈরি করতে চেয়েছি। আমি গান করি। অনেক অপ্রচলিত মিউজিকাল নোটও ছবিতে ব্যবহার করেছি। সংগীতকে চিত্রে রূপ দিয়েছি। বিশেষ করে শেষ দিকে, ২০২৬-এর ছবিগুলোয়। 
lঘোড়ার প্রাধান্য দেখছি। আকৃতিতে বিশেষ পার্থক্য নেই, তবে রং ও উপস্থাপনে ভিন্নতা আছে। বিশেষ কোনো পক্ষপাত আছে ঘোড়ার প্রতি? 
llআসলে ছাত্রাবস্থায় ঘোড়া দেখেছি ও এঁকেছি প্রচুর। আর্ট কলেজে পড়াকালে সত্তরের দশকটা পেয়েছি। কলেজের উল্টো দিকে ছিল রেসকোর্স ময়দান, ঘোড়দৌড় হতো। তখন কাছ থেকে দেখার ব্যাপারটা ঘটে। ফার্স্ট ইয়ারে আমাদের অ্যানিম্যাল স্টাডি ছিল। গরু-ঘোড়ার পেছনে কম দৌড়াতে হয়নি। বড় হয়েছি পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে।

ওইসব জায়গায় সরদঘাট থেকে গুলিস্তান সর্বত্র টমটমের যাতায়াত। বংশাল প্রভৃতি জায়গায় তো মানুষ ঘোড়া পালত। দেখেছি ছুটন্ত ঘোড়া, ক্লান্ত অবসন্ন ঘোড়া, তাদের বিশ্রাম। মনে ছাপ ফেলেছে, এঁকেছি। বিশেষ পক্ষপাত নেই। 
lনিসর্গের ছবিতে প্রায়ই দেখছি শূন্যস্থানকে আপনি দারুণ ব্যবহার করেছেন। রং চাপানো হয়নি, তবু তারা ছবির অংশ হয়ে গেছে। এর দর্শন কী?
llদর্শন শব্দটিকে কেন্দ্র করে বলি, ছবি আঁকতে প্রথমে আমাদের দেখতে হয়, এরপর তা ধারণ করি, সব শেষে প্রকাশ করি। আমার গ্রামের নাম বেরাই। টাঙ্গাইলে, লৌহজং নদীর ধারে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ নিবিড় গ্রাম। ছোটবেলায় যখন গ্রামের বাড়ি যেতাম, প্রকৃতি ও জনপদের বিপুল সব দৃশ্য ধরা দিত। আবার কিছু দৃশ্য বাড়ির জানালা দিয়ে দেখা, কিছু গ্রামের কোনো বটগাছের নিচে বসে দেখা। হাট বসত, নদী ধরে পালতোলা নৌকা যেত। দেখতাম সুবিশাল প্রান্তর। শূন্য। আরিচা গোয়ালন্দ ঘাট হয়ে যখন পদ্মা নদী পার হতাম ফেরিতে চড়ে, বিশালত্বের আরেক নমুনার সামনে উপস্থিত। রেলিং ধরে কিনারে দাঁড়িয়ে দূরের দিগন্ত দেখেছি তখন। দেখেছি বিরাট চর। সেই চর পেরিয়ে বহুদূরে, গ্রামের একটা রেখা বুঝি দেখা যায়! প্রকৃতির ক্যানভাসের অনেকটাজুড়ে এই বিশালত্ব উপস্থিত। ওপরে আকাশ নিচে ভূমি, ওপরে আকাশ নিচে জল! যা দেখেছি, সেই দৃশ্যগুলো মনে ছাপ ফেলেছে। যখন ছবি আঁকতে বসেছি, সেই বিশালত্ব আমি সাদা ছেড়ে দিয়েছি। 

আরও পড়ুন

×