ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

নীল নবগনে আষাঢ়গগনে

বৃষ্টি, ময়াসুরের মায়া ও ভোজিনিয়া

বৃষ্টি, ময়াসুরের মায়া ও ভোজিনিয়া
×

প্রচ্ছদ ও কবিতায় ব্যবহৃত শিল্পকর্ম:: রণজিৎ দাস

ধ্রুব এষ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত নক্ষত্রের ছাই আর মহাকাশের ধুলো দিয়ে বানানো পৃথিবী। সেই ছাই আর ধুলো জমা হয়েছিল ৪.৫৪±০.০৫ বিলিয়ন বছর আগে। এই হিসাবকে যদি ২৪ ঘণ্টা ধরা হয়, তবে মানুষের জন্ম নাকি হয়েছে এবং মানুষ মানুষ রূপে আবির্ভূত হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৭ সেকেন্ড আগে।
তাতে আমার কী সমস্যা?
কোনো সমস্যা নাই। আমি কত সেকেন্ড আগে জন্মেছি? দশমিক শূন্য ২ ন্যানো সেকেন্ড আগে? তাতেও কোনো সমস্যা নাই। কত সেকেন্ড আগে বৃষ্টি হয়েছিল? পৃথিবী সৃষ্টির পর? আদিম বৃষ্টি। পুরাণ মতে বারো লক্ষ বছর ধরে সেই বৃষ্টি হয়েছিল। মতান্তরে এক হাজার বছর ধরে। মতান্তরের নমুনা কী! কোথায় বারো লক্ষ বছর আর কোথায় এক হাজার বছর! তবুও মতান্তর। বিজ্ঞান কী বলছে? চার দশমিক চার বিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়ে সেই বৃষ্টি থেমে থেমে লক্ষ কোটি বছর ধরে হয়েছিল। কেউ নাই কিছু নাই শুধু বৃষ্টি, সেই পৃথিবীটা দেখার উপায় নাই কোনো। একসময় থেকে উঁকি দিয়ে আরেক সময়ের কোনো দৃশ্য কি দেখা সম্ভব হতে পারে কখনও? সেটা সম্ভব হলে আমি সেই পৃথিবীটা একবার দেখতে চাইতাম। শুধু পৃথিবী এবং বৃষ্টি। দ্বিতীয় একটা দৃশ্য আছে– চল্লিশ লক্ষ বছর আগের হতে পারে সেটা– গুহায় বসে বৃষ্টি দেখছে আদিম কিছু মানুষ। যদি এই দৃশ্যটা দেখতে পারতাম। কেন?
লায়লা রাগিব-এর কাব্যগ্রন্থ আছে, ‘বৃষ্টি আমার জন্মাবধি দুঃখ মুছে নাও।’ কী সুন্দর নাম। কিন্তু জন্মাবধি বিশেষ কোনো দুঃখ আমার নাই। এ ছাড়া জন্মাবধি দুঃখ মুছতে গেলে নিশ্চয় বৃষ্টিতে ভেজা আবশ্যক। ভিজতে না আমার দেখতে ইচ্ছা করে– আদিম বৃষ্টি। এমনি।
হুমায়ূন আহমেদ বৃষ্টি পছন্দ করতেন। বুকের কাছে লুঙ্গি গিট্টু দিয়ে পরে খালি গায়ে বৃষ্টিতে ভিজতেন। বহুবার দেখেছি। হুমায়ূন আহমেদের বই আছে ‘বৃষ্টিবিলাস।’ গান লিখেছেন, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়...।’
বরষায়। বৃষ্টির দিনে।
মাহমুদুল হক স্যারের ‘বৃষ্টি সিরিজ’ পেইন্টিং মনে পড়ে। অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং। বৃষ্টিমুখর।
পৃথিবীর সঙ্গে একটা মিল আছে বৃষ্টির। পৃথিবী গোল, বৃষ্টির ফোঁটা গোল।
পুরাণের ময়াসুর যদি থাকতেন তার সঙ্গে একবার দেখা করতাম। ঋষি কাশ্যপ ও দানুর ছেলে ময়াসুর। রাক্ষসদের রাজা ছিলেন। মহান শিল্পী ও স্থপতি। মায়াসভা বানিয়েছিলেন, উড়ন্ত নগরী বানিয়েছিলেন, স্থাপত্যবিদ্যা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন– ‘ময়মতম’।
মন্দোদরীর পিতা ময়াসুর। সেই হিসাবে রাবণের শ্বশুর ভদ্রলোক। এই ময়াসুরের নাম থেকেই কিনা মায়া শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে। ময় থেকে মায়া।
মায়া। ইল্যুশন।
আমার কী দরকার ময়াসুরের সঙ্গে?
বৃষ্টি মেঘ থেকে হয়। যন্ত্রামবোধি মেটা এআই বলল, বিভিন্ন সময়ে সাধারণত দশ রকমের মেঘ দেখা যায় আকাশে। সব মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় না। তিন ধরনের মেঘ থেকে হয়। 


১. নিম্বোস্ট্র্যাটাস মেঘ, ২. কিউমুলোনিম্বাস মেঘ, ৩. স্ট্র্যাটাস মেঘ। আষাঢ় মাসের বৃষ্টি?–নিম্বোস্ট্র্যাটাস ও কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে হয়।
কাল আষাঢ়ের ১ তারিখ। আষাঢ়স্য প্রথম দিবস, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। কাল কি বৃষ্টি হবে? আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে হবে। বিশ্বাস নাই। যদি না হয়?
ময়াসুরকে এজন্য চাই। ময়াসুর আদিম এক আষাঢ়ের মেঘ ও বৃষ্টির মায়া বানিয়ে রাখবেন কাল সারাদিন। গুহায় বসে আমরা কয়েকজন আদিম মানুষ সেই বৃষ্টি দেখব। লক্ষ কোটি বছর ধরে দেখব। মায়া।
পুরাণে ময়াসুরের মৃত্যুর কথা নাই, লোকবিশ্বাস ময়াসুর এখনও জীবিত আছেন, পাতালে থাকেন। কাল যদি বৃষ্টি না হয় পাতালে যাব।

১৪.০৬.২৬

বৃষ্টি হয় নাই। আমি পুরানা পল্টন লাইনে থাকি। পুরানা পল্টনে আজ বৃষ্টি হয় নাই। রাত এখন ৯টা ৪৮। একটু পর ফিফা বিশ্বকাপের আজকের খেলা শুরু হয়ে যাবে। স্পেন বনাম কেপ ভার্দে। কেপ ভার্দে স্পেনকে হারাতে পারলে বৃষ্টি হতে পারে। বেশি হয়ে গেল?
কোথায় স্পেন কোথায় কেপ ভার্দে?
জার্মানি দুই দিন আগে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়েছে।
খেলা শুরু হয়ে গেছে। ১৪ মিনিট ৪২ সেকেন্ড হয়ে গেছে। কোনো দল গোল করতে পারে নাই।
২১ মিনিট ২১ সেকেন্ড : ০-০।
হাইড্রেশন ব্রেক। এই বিশ্বকাপের নয়া ন্যারেটিভ। পান বিরতি বা পানি বিরতি। প্লেয়াররা এই বিরতিতে পানি পান করবে।
৩২ মিনিট ২৪ সেকেন্ড : ০-০।
৪৫ মিনিট প্লাস বাড়তি ৫ মিনিট : ০-০।
৪৭ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড : ০-০।
৫৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ড : ০-০।
৬৬ মিনিট ১৭ সেকেন্ড : ০-০।
দ্বিতীয় দফা হাইড্রেশন ব্রেক।
৭৬ মিনিট ৫২ সেকেন্ড : ০-০।
৮০ মিনিট ০৫ সেকেন্ড : ০-০।
৯০ মিনিট প্লাস বাড়তি ৫ মিনিট।
৫ মিনিটের ৪ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড : ০-০।
খেলা ড্র! এবং এটা সেরা!
আজকের রাতটা ভোজিনিয়ার! কেপ ভার্দে দলের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার!
পুরানা পল্টনে এখনও বৃষ্টি হয় নাই। আরও রাতে হতে পারে। বৃষ্টির ঘ্রাণবাহী ঠান্ডা হাওয়া আছে। তাও যদি বৃষ্টি না হয়?
আষাঢ় মাসে বৃষ্টি না হলে সেটা আষাঢ় মাসের বেইজ্জতি। আমি কী করব, আমি ঘুমাই। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে পাতালে যাব না, কেপ ভার্দের ভোজিনিয়াকে নিয়ে কোন পত্রিকা কী লিখে পড়ব।

১৫.০৬.২০২৬

সকাল ১১টা ২৪।
পুরানা পল্টনে এখনও বৃষ্টি হয় নাই। পুরানা পল্টনে বৃষ্টি না হলে আমি কী করে বলি বৃষ্টি হয়েছে?
আকাশ মেঘলা হয়ে আছে বটে, মার্জার মার্জারিনীয় গর্গর মক করছে মেঘের দল– বৃষ্টি হতে পারে– বিশ্বাস হচ্ছে না– মনে হচ্ছে মায়া– ময়াসুর মেঘ বানিয়ে রেখেছেন– মৃত নক্ষত্রের ছাই আর মহাকাশের ধুলো দিয়ে বানানো মায়ার পৃথিবী বৃষ্টিতে ভিজবে।

১৬.০৬.২০২৬ 

আরও পড়ুন

×