ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

জেসিকা

জেসিকা
×

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

উম্মে মুসলিমা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যামেরিকান ইমিগ্রেশন পুলিশ দেখলাম অনেককেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছে। আমার পাসপোর্টে সিল দেওয়ার আগে ক্যামেরার দিকে তাকাতে বলল আর জিজ্ঞাসা করল, ‘ক্যালিফোর্নিয়ায় কেন?’ আমি দুহাত উঁচু করে নাচের ভঙ্গিতে বললাম, ‘টু সি মাই নিউবর্ন গ্র্যান্ডসন’। সে মৃদু হেসে ‘কংগ্র্যাচুলেশনস’ বলে পাসপোর্টে ধুপধাপ সিল দিয়ে ফিরিয়ে দিল।
আমি নাতির মুখ দেখে দীর্ঘ ছাব্বিশ ঘণ্টার জার্নির ক্লান্তি ভুলে গেলাম। ছুটে গিয়ে কোলে নিতে যেতেই আমার মেয়ে সাবধানবাণী উচ্চারণ করল–
‘উহুঁ, এখনই না। আগে কাপড়চোপড় চেঞ্জ করে হাতমুখ ধুয়ে এসে কোলে নাও। এতটা অধীর হয়ো না মা, ছ’মাস তোমাকেই কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে। আগে বলো বেবি দেখতে কার মতো হয়েছে?’ 
আমি আমার মেয়েকে চিনি। যদি সত্যি কথা বলি যে বেবি দেখতে বেশির ভাগই তার বাবার মতো, তাহলে আমার মেয়ে নির্ঘাত বলে বসবে–
‘একজন নারীবাদী লেখক হয়ে তুমি এমন পিতৃতান্ত্রিক কথা কী করে বলো? দেখো না, ওর চোখ, চুল, কপাল– অবিকল আমার মতো!’ 
আমি কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে বললাম– ‘অবিকল তোমার মতো।’ 
আমি আমার জামাতা অয়নের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, তার মুখে দুর্ভাবনা সরে গেছে। সে আড়ালে ছোট্ট করে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচাল।
আমার মেয়ে তার অফিস থেকে তিন মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছিল। সামনের সপ্তাহে জয়েন করবে। জামাতা অয়ন বলল–
‘মা চিন্তা করবেন না। আমার দেড় মাস বন্ডিং লিভ আছে। আমি আপনাকে সাহায্য করব। তা ছাড়া আমরা একজন ন্যানিও খুঁজছি।’ 
‘বন্ডিং লিভ কী?’
‘ওই তোমরা যাকে পিতৃত্বকালীন ছুটি বলো সেইটাই বন্ডিং লিভ মা’– বলে আমার মেয়ে তার ছেলেকে আমার কোলে ছেড়ে দিয়ে সোফার ওপর দুই পা মেলে অয়নের বাড়িয়ে দেওয়া কফির কাপে নিশ্চিন্তে চুমুক দিল। কবে আমার বাচ্চা হয়েছে, তাদের কীভাবে মানুষ করেছি বেমালুম ভুলে গেছি। তা ছাড়া এ দেশে বাচ্চার হাজার পদের জিনিসপত্রের সব খটোমটো নাম শুনে আমার নিজেকে কেমন অশিক্ষিত মনে হতে লাগল। মেয়ে যদি বলে ‘মা, ঘুমালে বাবুর সোয়াডেল ঠিক আছে কিনা দেখে রেখো। হাত বেরিয়ে গেলে মুখে খামচি দিয়ে দিতে পারে।’  
সোয়াডেল আবার কী জিনিসরে বাবা! আড়ালে গিয়ে গুগল সার্চ দেব, বানান কী তাও তো জানি না। ‘সি’ না ‘এস’ দিয়ে শুরু? মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলে নিশ্চয় যথারীতি ঝাড়ি–
‘দেশে-বিদেশে এত চাকরি করেছ, আর সোয়াডেল মানে জানো না!’
একদিন মেয়ে বারান্দা থেকে বলল–
‘মা বাবুর সুইংয়ে প্যাসিফায়ার পড়ে আছে দিয়ে যাও না।’
ল্যাও ঠেলা! সুইং না হয় বুঝলাম, প্যাসিফায়ার কেয়া রে কালিয়া? মনে পড়ে গেল শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ উপন্যাসের ভিলেন বিলাসবিহারীর চাকরের প্রতি সেই হুংকার– ‘এই শুয়ারকা বাচ্চা, এক কুরসি লে আও।’ চাকরের ‘শুয়ারকা বাচ্চা’ শব্দের সাথে পরিচয় ছিল কিন্তু কুরসি কী জিনিস তা জানা ছিল না। আমার সেই অবস্থা। অয়ন  বলল– ‘মা, এটা বাচ্চাদের মুখে দিলে বাচ্চারা প্যাসিফাইড বা শান্ত হয়ে যায় বলে এর নাম প্যাসিফায়ার।’ ও হরি! তো চুষনি বললেই তো হয়রে বাপ!
অবসর গ্রহণের পর সকালে ওঠার অভ্যাস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়ে আমাকে ডাকে না। কিন্তু ঘুঘুর ডাকে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঢাকা শহরে ঘুঘু ডাকে না অথচ বে-এরিয়ায় সাতসকালে ওরা ডেকে যায়। এক হপ্তান্তের সকালে শুনি মেয়ে-জামাতার কক্ষ থেকে ঘুঘুর ডাক আসছে। ওমা! আমার নাতি কবে কবে ঘুঘুকে নকল করতে শিখল? কদিন পরপর নতুন নতুন ক্যারিকেচার হাজির করে। বারান্দায় কোলে নিয়ে দাঁড়ালে জিব বের করে বাতাস খায়। আমি তখন ওকে জীবনানন্দ ডাকি। বারান্দার গাছে বাতাসে ফুলেরা দোল খায়, বাবু আমার কোলে ফুলের মতো দোলে। আমি ওকে দোদুলচন্দ্র বলি। আমার কফির কাপে থাবা দিতে এলে আমি ওকে বলি থাবা বাবা। বাতাসে ঝুলানো ঘণ্টা বাজলে ও খিলখিল করে হাসে। অয়ন ডাকে খিলখিল কাজি। ওর নিজের একখানা নাম আছে, আমিই রেখেছি– অন্ত্যমিল, কিন্তু সে নামে ওকে কমই ডাকা হয়। কেবল হসপিটালে ওর সিরিয়াল এলে নার্স যখন ডাকে– অ্যান্টামিল! তখন আমার মেয়ের মন খারাপ হয়ে যায়। বলে– এ দেশে সহজ উচ্চারণের নাম রাখাই ভালো। বাংলাদেশ হলে তো এসএসসির রেজিস্ট্রেশনের সময়ও নাম পরিবর্তন করা যায়। এ দেশে 
পেট থেকে পড়ার আগেই নাম ঠিক করে রাখতে হয়। মেয়ের মন খারাপ হলে আমারও ভালো লাগে না। আরে বাবা! নাম রাখার সময় তো বলেছিলে কী আনকমন সুন্দর নাম! মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে–
‘মা, মন খারাপ করো না। এদের নামও তো খটোমটো। দেখো, আমাদের বাবুর আগে যে বাচ্চাটার সিরিয়াল ছিল তার নাম কুইনটন, কিন্তু ওরা ডাকল কুইনান। যেন কুইনাইন হা হা!’ মেয়ে আমাকে সান্ত্বনা দেয়।
অয়নের বন্ডিং লিভ শেষ হয়ে আসছিল। ওরা অনলাইনে ন্যানি খুঁজছিল ছেলের জন্য। ওদের ছেলে টানতে আমার কষ্ট হয় বা আমার পরিশ্রম বেশি হয়ে যায়– এটা আমার মেয়ে-জামাতা চাচ্ছিল না। আমি যে ক’মাস আছি সে সময়ের মধ্যে বাবু যেন ন্যানির সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায় সেটাই ওদের চাওয়া। 
‘তোমাকে কিছু করা লাগবে না। তুমি শুধু কফি খাবে, লেখালেখি করবে আর বসে বসে নেটফ্লিক্স দেখবে’– মেয়ে আমাকে চুমো খেয়ে বলল।
‘কিন্তু ওরা কি অন্তুকে আমার মতো ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে পারবে?’
‘ওরা এসবে পাকা। ওদের অভিজ্ঞতা আছে।’
সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল-বিকেল বাবুর যাবতীয় কাজ করাসহ ওর সাথে খেলা, বাইরে ঘুরিয়ে আনা, জিনিসপত্রের নাম শেখানো– এসবের জন্য ন্যানি সাপ্লাই কোম্পানির সাথে ওরা কথা বলছিল। বেশির ভাগই মেক্সিকান মেয়ে পাওয়া যায়। একদিন বিকেলে একজন ইন্টারভিউর জন্য এলো। সে তেমন ইংরেজি জানে না। তাকে ইংরেজিতে প্রশ্ন করা হলে সে এআইয়ের সাহায্য নিয়ে সেটা স্প্যানিশে কনভার্ট করে উত্তর দেয়। তো বাচ্চার দেখাশোনার জন্য তার মা-বাবার সাথে ফোনে যোগাযোগ সবচেয়ে জরুরি। আমার মেয়ে দুঃখিত বলে তার যাতায়াতের খরচ দিয়ে বিদায় করল। আমি যাওয়ার আগে তার নাম জিজ্ঞাসা করলাম। সে অখুশি মুখে বলল– ল্যাওড়া। আমার ভারি খারাপ লাগল। মনে হলো মেয়েটি রেগেমেগে গালি দিল। বাংলাদেশে আমাদের গ্রামাঞ্চলে শব্দটির অর্থ অশ্লীল। পরে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল ‘মা, ওর নাম লোরা। ওরা ওভাবেই উচ্চারণ করে।’  মর জ্বালা!
এরপর যে মেয়েটিকে ন্যানি হিসেবে নির্বাচন করল আমার মেয়ে-জামাতা সে-ই জেসিকা। জেসিকা পাংকু গোছের। হাত পিঠ গলায় ঘন ট্যাটু করা। জিব, নাক, চোখের পাশ ফুড়িয়ে সোনার পিন পরানো। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ। হোয়াইট অ্যামেরিকান। আমরা ভাবি যারা কেয়ার গিভার বা বেবি সিটার তারা বোধহয় গরিব-গুর্বো, অল্প লেখাপড়া জানা। প্রথমদিন মেয়ে জিজ্ঞাসা করল–
‘জেসিকা, তোমার গাড়ি কোথায় রাখলে?’
‘তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টে গেস্টদের গাড়ি রাখার জন্য যে স্পেস আছে সেখানে।’ 
আমি অয়নের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। অয়ন চুপিচুপি বলল ‘মা, হতেও পারে সে বিএমডাব্লু হাঁকিয়ে এসেছে।’ আমার নাতিবাবু প্রথম দিন থেকেই তাকে পছন্দ করা শুরু করল। আমার একটু ঈর্ষা হলো বৈকি। জেসিকা ওকে ঘাড়ের ওপর মাথা রেখে ঘুম পাড়াতে গেল, আমি বললাম–
‘বেবি ওভাবে ঘুমায় না। ওকে বুকের মধ্যে চেপে রেখে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়’
‘তুমি চিন্তা করো না। ও ঠিক ঘুমাবে’।
ঠিক। শুনলাম জেসিকা সুর করে ঘুমপাড়ানি গান গাচ্ছে–
‘হাশ লিটল বেবি ডোন্ট সে এ ওয়ার্ড 
মামা গন্না বাই ইউ এ মকিং বার্ড...।’ 
আমাদের ঘুম পাড়াতে লাগে দশ-বারো মিনিট। জেসিকা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে বাবুর খাবার তৈরি করতে গেল। আমি হা হা করে উঠলাম–
‘করো কী করো কী? ফলের সাথে ফর্মুলা মিল্ক দিও না। ওর মায়ের রেখে যাওয়া দুধ দিয়ে মেশাও’
‘এখন থেকে ফর্মুলা অভ্যাস না করলে কদিন পর তো বেবি মামা’স মিল্ক পাবে না। আমি তোমার মেয়ের সাথে কথা বলেছি। তুমি চিন্তা করো না’– জেসিকা হেসে আমার পিঠে হাত বুলায়। বলে–
‘গ্রান্ডমারা অলওয়েজ পজেসিভ। আমার মা-ও এ রকম।’ 
আমার মেয়ে বলে দিয়েছে ওদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ না করতে। ওরা বিরক্ত হয়। আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল জিজ্ঞাসা করতে– ‘হ্যাগো তোমরা ক’ ভাইবোন? তোমার কি বিয়ে হয়েছে? বাচ্চা আছে? তুমি তোমার মায়ের সাথে থাকো বলেছ। তোমার বর কোথায় থাকে?’ এসব দস্তুর নয় এ দেশে। সে যদি নিজে থেকে কিছু বলে তাহলে বেশ হয়। আবার এটাও জিজ্ঞাসা করতে মুখ চুলকায়– ‘আচ্ছা তুমি যে তোমার ট্যাটুর মধ্যে এখানে-ওখানে এম বি দুটো অক্ষর খোদাই করেছ– তা কেন?’ রসনা সংযত করি। যা ইচ্ছে তাই করুক বাবা। বাবুকে ঠিকঠাক যত্ন নিলেই হবে। আমি আর ক’দিন?
আমার মেয়ে জামাতা জেসিকার পারফরম্যান্সে খুব খুশি। ওরা বেশ নিশ্চিতমনে অফিস করে। উইকএন্ডে বাবুকে নিয়ে আজ ইয়োসেমিটি পার্ক তো কাল লেইক টাহো, নাহয় কাছেপিঠে হাফ মুন বে ঘুরে বেড়াই। ভালোই কাটছিল দিনগুলো যেদিন না জেসিকা বলে বসল– ‘আমি একটা সরকারি প্রি-স্কুলে চাকরি পেয়েছি। সামনের সপ্তাহে অন্ত্যমিলকে ছেড়ে চলে যেতে হবে।’ 
‘অন্ত্যমিল’ উচ্চারণ করল ঠিক আমাদের মতো করেই। অ্যান্টামিল নয়। এ সপ্তাহে আর দুদিন আসবে সে। সবার মন খারাপ হয়ে গেল। আহা! বাবু ওকে নিশ্চয় মিস করবে! আমিও কি করব না? আমার মেয়ের বয়সী মেয়েটার প্রতি স্নেহ দানা বেঁধে উঠেছিল। অথবা আমরা বাঙালিরা বোধহয় এমন কোমলপ্রাণেরই। 
আমার মেয়ে আবার ন্যানি খুঁজতে শুরু করল। অফিসেও নাকি দুনিয়ার কাজ। তার ওপরে বাবুর জন্য বুকের দুধ পাম্প করে রেখে যেতে হয়। পাম্প মেশিন অফিসেও নিয়ে যায়। বুক ভারি হয়ে উঠলেই অফিসে মাদার’স রুমে বসে পাম্প মেশিন সেট করে কাজ করতে থাকে। সে রুমে দুধ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ থাকে। কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম থাকে। এমনকি থরে থরে স্যানিটারি ন্যাপকিনও রাখা থাকে। আমার নিজের কথা মনে পড়ে যায়। আমি যখন প্রথম ঢাকায় সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জয়েন করি তখন অফিসের টয়লেটে টিস্যুপেপার দূর অস্ত স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার জন্য একটা ঝুড়ি ছিল না। তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে যখন যোগদান করলাম তখন অফিসে দু’ঘণ্টা পর বুক ভারি হয়ে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হতো। একদিন তিন ঘণ্টা যাবৎ একটা মিটিং শেষে উঠে দেখি আমার ব্লাউজ-শাড়ি দুধে সয়লাব। এখন এখানে কত সুবিধা। আমার মেয়ে অফিস থেকে আইস বক্সের মধ্যে দুধের প্যাকেট ভরে এনে ফ্রিজে সংরক্ষণ করে। পাম্প মেশিন চার্জে রাখতে হয়। ভোরে উঠেও পাম্প করে সারাদিনের জন্য ফ্রিজে রেখে যায়। নাতি আমার মায়ের দুধ ছাড়া বাইরের দুধ গিলতে চায় না।
বাবুকে জেসিকা ইচ্ছে করে ফিডারে ফর্মুলা মিল্ক দিয়েছিল একদিন। বাবু মুখ ভরে নিয়ে পুরোটাই জেসিকার মুখে ফুউ করে ছুড়ে দিয়েছিল। জেসিকা চলে যাবার একদিন আগে আমার মেয়ের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, অয়নের অফিস টুর, ন্যানি খুঁজে বের করার ঝামেলায় মেয়ে আমার সকালে ব্রেস্ট পাম্প করে প্যাকেট ফ্রিজে না তুলেই চলে গেল। আমিও লক্ষ্য করিনি। দুই ঘণ্টা ওই দুধ বাইরে রাখলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। জেসিকা বলল– 
‘তোমার মেয়ে আজ খুব ব্যস্ত থাকবে। ওকে দুধের বিষয়টা জানাইও না। আমি দেখি কী করা যায়’
‘সিরিয়াল গুলিয়ে খাওয়াবে নাকি?’
‘তুমি মুভি দেখো। আমি ব্যবস্থা করছি। বেবির খাওয়ার টাইম এখনও দেড় ঘণ্টা পর’।
আমার অস্থির লাগছিল। মুভিটা শেষ না করেই আমি বাবুর রুমে গিয়ে দেখি জেসিকা বাবু কেউ সেখানে নেই। জেসিকা ওকে একবার করে বাইরে ঘুরাতে নিয়ে যায়। ক্লাব হাউসের সামনে একটা ওয়াটার ফল আছে সেটা দেখলে বাবু খলখলিয়ে হাসে। কিন্তু বাবুর তো খাবার টাইম হয়ে গেছে। আর এ অসময়ে তো বাবুকে বাইরে নিয়ে যায় না জেসিকা। বিকেলের দিকে যায়। আমি কোনোমতে একটা গরম কাপড় চাপিয়ে ক্লাব হাউসের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগলাম। হাতে ফোন বাজছে। মেয়ের কল। ধরলাম না। মেসেজ এলো– ‘মা, মিটিং শেষ। একটু পরেই রওনা দিচ্ছি। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব আশা করি। আমার গুটুন কী করে? চিন্তা করো না, আমি পৌঁছেই ওকে খাওয়াব। আজ পাম্প করিনি আমার অবস্থা কেরোসিন!’ আমি পাগলের মতো ওয়াটার ফলের চারপাশ ঘুরছি। ডাকছি ‘জেসিকা জেসিকা হ্যোয়ার আর ইউ?’ কাল চলে যাবে জেসিকা। ওকি বাবুকে নিয়ে পালাল? এ দেশে তো এটা সম্ভব নয়। কিন্তু পাংকু টাংকুদের কি বিশ্বাস করা যায়? আমার বুক কাঁপছিল। চোখ ঠেলে পানি আসছিল। কোথায় আমার আদরের ধন? আমি আমার মেয়েকে কী জবাব দেব? কী দরকার ছিল আমার মুভি দেখার?
ক্লাব হাউসের স্বচ্ছ কাচের জানালা ভেদ করে আমার তৃষিত চোখ দেখতে পেল বাবুকে কোলে নিয়ে বুকে চেপে সোফার মধ্যে বসে আছে জেসিকা। আমি হাঁফ ছেড়ে খানিকক্ষণ ঝরনাটার সামনে বসলাম। পানির ছিটা এসে আমার ক্লান্ত মুখে স্বস্তির প্রলেপ ছড়াচ্ছিল। নিশ্চিত পায়ে আমি ক্লাব হাউসের দরজার দিকে পা বাড়ালাম। আমি দরজা নক করলে সে ঘুমন্ত বাবুকে ঘাড়ের ওপর তুলে নিয়ে দরজা খুলে দিল। জেসিকা ওর চোখের পানি লুকাতে পারেনি। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসলাম।
বাসায় ঢুকে জেসিকা বাবুকে শুইয়ে দিয়ে চলে গেল। পরপরই আমার মেয়ে অস্থির হয়ে ঢুকে বলল– 
‘ফোন ধরো না কেন মা? ফোন না ধরলে আমি বাবুর জন্য অস্থির হয়ে পড়ি, বোঝনা? আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। বাবু কই?’ আমি ড্রইংরুমে বাবুর মনিটর সামনে নিয়ে বসে আছি। মনিটরে দেখলাম বাবু চোখ মেলে পা দাপাচ্ছে। দুজনই ছুটে গেলাম ওর কামরায়। মেয়ে বুকে টেনে নিয়ে খাওয়াতে গেল। সে মুখ সরিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। 
‘ওর পেট ভরা মনে হচ্ছে। ফর্মুলা দিয়েছ নাকি আজকে?’ আমার মেয়ের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন।
‘জেসিকা এককাপ মিক্স ফ্রুট দিয়েছে মনে হয়।’ আমি মিনমিন করে বললাম। 
মেয়ে বলল– 
‘জেসিকার জন্য খারাপ লাগছে। বাবু এত পছন্দ করত ওকে। আবার যে কাকে পাবো?’
আমি বললাম ‘জেসিকা আজ ওর জীবনের করুণ কাহিনি শুনিয়েছে আমাকে।’
‘তুমি শুনতে চেয়েছিলে?’ মেয়ে খেঁকিয়ে উঠল। 
‘নাহ। ও নিজেই বলল। একটা ফিলিস্তিনি রিফিউজি ছেলেকে ও ভালবেসেছিল। ওরা দুবছর একসাথে ছিল। ওদের একটা বাবু হয়েছিল। বাবুর নাম মুস্তাফা বখতিয়ার। দেখোনি ওর ট্যাটুর মধ্যে এখানে-ওখানে এম বি লেখা? নামটা উচ্চারণ করল একদম আমাদের মতো করে। মুস্তাফার এক বছর হলে ওর বাবা তার মা বাবাকে বাচ্চা দেখাতে নিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। জেসিকা আর কোনো হদিস পায়নি। সে এ দূতাবাস ও দূতাবাস পাগলের মতো ঘোরাঘুরি করেছে। ফিলিস্তিনি কমিউনিটির একজন নেতা গোছের মানুষকে জেসিকা কয়েকবার অনুরোধ করেছে। তিনি বলেছেন ‘ইসরায়েল আমাদের সব ছেলেকে মেরে ফেলছে। আমাদের এখন ছেলে দরকার। তোমার ছেলে স্বাধীন ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করবে।’ 
মেয়ে আমার মুখের দিকে খানিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল– ‘মা, তুমি কি কোনো মুভি দেখছিলে আজ?’ 
‘কেন, এটাকে তোর কোনো মুভির গল্প মনে হচ্ছে?’ আমি একটু রেগেই গেলাম।
‘ও হে গল্প লেখক, ভালোই তো প্লট সাজিয়েছ। কিন্তু আমার ছেলে কেন ব্রেস্টফিড করছে না? ওকে ধরো আমি পাম্প সেট করি’– বলে মেয়ে দ্রুত উঠে গেল। 
মনে মনে বললাম ‘বাবু এখন দু’ঘণ্টা খাবে না। আমি ক্লাব হাউসের কাচের জানালার বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখেছি জেসিকা বাবুকে স্তনদান করছিল আর জেসিকার দু’চোখে ছিল জলের ধারা।’ 

আরও পড়ুন

×