ফুটবল ও লাতিন আমেরিকার কবিতা
ভাষান্তর: মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
হুয়ান পাররা দেল রিয়েগোর জন্ম ১৮৯৪ সালে পেরুর মন্তেভিদিওতে। কিন্তু যৌবনের প্রারম্ভেই লাতিন আমেরিকার সেই সময়ের সাহিত্যের তীর্থভূমি উরুগুয়ের লিমাতে চলে আসেন। যুক্ত হন বিশ শতকের আঁভা-গার্দ বা বিপ্লবী কাব্য-আন্দোলনের সঙ্গে। লিমাতে তখন চলছিল পরাবাস্তববাদ, ফিউচারিজম ও আধুনিকতার ঢেউ। লাতিন আমেরিকার কবিতাকে তিনি আধুনিকতার দিকে অনেকখানি এগিয়ে দেন। লাতিন আমেরিকার প্রকৃতি ও জনস্পন্দনে সমৃদ্ধ তাঁর কবিতা। ভ্রমণ করেছেন প্রায় সমগ্র মহাদেশ। কবি সিজার ভায়েহো তখনও খ্যাতিমান হয়ে ওঠেননি, কিন্তু তরুণ কবি রিয়েগো অনন্য সব কবিতার সুবাদে পুরো অঞ্চলে দ্রুত পরিচিতি পেয়ে যান।
বিশ শতকের প্রথমদিকে লাতিন আমেরিকায় প্রথম ইউরোপীয় ফুটবলের আবির্ভাব ঘটে। মহাদেশজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই অঞ্চলের কোনো লেখক ফুটবলের প্রভাব এড়াতে পারেননি। রিয়েগো নিজেও ছিলেন ফুটবলের খুব অনুরাগী। এখানে ফুটবল নিয়ে তাঁর একটি কবিতা উপস্থাপিত হলো। কবিতা দুটি লাতিন আমেরিকাজুড়ে জনপ্রিয়। কবিতাটি ফুটবলের জনপ্রিয়তা নিয়ে লেখা। অনূদিত কবিতাটির উৎস তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘পোয়েজিয়া’, আমাকে স্প্যানিশ থেকে বাংলা অনুবাদে সহায়তা করেছেন স্প্যানিশ কবিবন্ধু অধ্যাপক নরমা গঞ্জালেস।
ফুটবলের স্তবগাথা
বল হাসে আর গান গায়!
বলটি শিস কাটে, আকাশে ওড়ায় ডানা!
ধুলোবালি যেন তুলোর সর্প, ফুঁসে ওঠে
চনমনে সেই খেলোয়াড়ের পিছু পিছু ছোটে,
এক লাফে সে নিজেকে নিয়ে গেছে অনেক উঁচুতে।
বল হাসে আর গান গায়!
বল শিস কাটে, আকাশে ওড়ায় ডানা!
এই বিকেলটা যেন তার রঙিন ছাতা, মেলে ধরেছে
সেই মাঠের ওপরে, যেখানে খেলোয়াড়েরা বল নিয়ে মগ্ন
জন-উল্লাসের এই উৎসবে :
ত্রিশ হাজার হাসি হাসি মুখ, আর নারীদের পোশাক
বাতাসে স্নিগ্ধ বার্তা পাঠায়
ঠিক কোথায় জানি না, তীব্র উত্তেজনায় তারা
থরথর কাঁপে।
কিন্তু হঠাৎ বেজে ওঠে সেই মোহন বাঁশি,
এখনি শুরু হবে খেলা, বাতাসে বার্তা ছড়ায়।
সবাই চুপ... এরপর শোনা যায় উল্লাসধ্বনি
অবশেষে শুরু হয় আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ
বলটি লাফিয়ে ওঠে,
নেচে নেচে এক পা থেকে অন্য পায়ে ঘোরে,
আকাশের বুকে অ্যাক্রোবেটিক আনন্দের ছন্দ
বলটাকে চোখে প্রায় দেখাই যায় না।
সাদা আর লাল জার্সির সেই খেলোয়াড়
হঠাৎ উন্মাদনায় মাতে,
সম্মিলিত আক্রমণের জাদুতে আনন্দে এঁকেবেঁকে
আঁকে গতিময় ছবি
একজনের পাশে অন্যজন, আবেগের বশে রুখতে গিয়ে
মাটিতে ছিটকে পড়ে আর কাঁপতে থাকে... হায়!
আবার তড়িদাহতের মতো তীব্র বেগে উঠে দাঁড়ায়।
বেজে ওঠে অফসাইডের বাঁশির ছোট্ট শিস,
বলটি আবার মাঠে গড়ায়,
ক্ষণিকের জন্য আকাশের বুকে এঁকে দেয় রামধনু,
কখনও মৃগী রোগীর মতো ছটফট করে লাফিয়ে ওঠে
সেই পায়ে বলটি নিয়ে তারা মাটিতে নকশিকাঁথা বোনে।
কিন্তু এখন নীল আর সাদা জার্সির আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী
বলটা নিয়ে দৌড়ুচ্ছে... দৌড়ুচ্ছে... দৌড়ুচ্ছে... দৌড়ুচ্ছে...
ওদিকে একা দাঁড়িয়ে থাকা গোলকিপার শিহরিত, কম্পমান,
সামনেই ফুলব্যাক, তবু সে উঁচুতে লাফিয়ে ওঠে
মুহূর্তের জন্য সূর্যের বুকে ভাস্কর্যের মতো চিত্ররূপময়
এদিকে উড়ন্ত রকেটের মতো বলটি
আকাশের উঁচুতে নক্ষত্রের মতো থমকে থেকে
আবার মাটিতে আছড়ে পড়ে, ঢাকের আওয়াজ তোলে।
নতুন করে আবার সে জেগে ওঠে
তার বৈদ্যুতিক সঞ্চরণে
(বিকেলের গান গাওয়া আলো এবার ফুরিয়ে আসে...
পাখিরা উত্তর দিকে উড়ে যায়...
আকাশের বুক চিরে বুঝি ছুটে চলে ধূসর একটা ট্রেন...)
আর সে কী করতালি, হঠাৎ পুরো গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ে
ঠিক যেন শ্যাম্পেনের বোতলের কর্ক খোলার তীব্র শব্দ হয়,
বলটি চাঁদের কানে কানে কী যেন বলতে যায়
মাটিতে ফিরে আসার সময় আবার হাসতে থাকে
এবার পুরো মাঠ উন্মত্ত, অধীর,
তার ডানাওয়ালা হালকা গতিতে তারা কেঁপে কেঁপে ওঠে
বলটি শিস দেয়, পালিয়ে যায় আর ধাক্কা খায়
এই বুক থেকে সেই পিঠে, সেই পিঠ থেকে এই মাথায়,
আলোর তৃষ্ণায়, স্নায়বিক উত্তেজনায়,
সূর্যের নিচে সোনা ও মাটির কোনো নাটুকে দল
হঠাৎ তলোয়ারের আঘাতের মতো ছুটে যায়
গোল… গোল… গোল!
ফুটবলের সবকিছুই এক-একটি চমৎকার কবিতা,
সূর্যের আলো, পুরুষালি হাওয়া আর দিগন্ত
দিনের সেই নীল হাসির মাঝে মানুষের হৃদয়কে
গাছের সবুজ ডালের মতো সতেজ করে তোলে
গতির পরিপূর্ণ মহাকাব্য ফুটবল,
এ হলো বহুমুখী সৃজনী ডানার ঝটপট চঞ্চলতা:
নাটক, সংগীত, ভূদৃশ্য, তীব্র সূর্য,
জ্যামিতির মতো বল বাতাসের বুকে হেঁটে বেড়ায়
মাটিতে ছবি আঁকে, রঙের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পেশির জাদুকরী উৎসবে সবাই মেতে ওঠে,
এই হলো আমাদের আমেরিকা…,
আজ সে চিৎকার করে গোধূলির সামনে
মস্ত বড় সোনালি ট্রাম্পেট নিয়ে শুভ আগমনী ঘোষণা করছে!
ক্রুশ আর কামানের সাদা-কালো ইউরোপের মুখোমুখি
ফুটবল আজ দাঁড়িয়ে।
রহস্যজনক সেই কথাটা মনে রেখো
আমি জানি না রুবেন নাকি পেরোর আদেশে
তোমাদের বলে যাই:
আকাশের ওই চাঁদটা আসলে একটা ফুটবল
রঙিন পোশাকের অন্য ফুটবলারদের সে
বিকেলের সূর্য হয়ে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে। v
- বিষয় :
- কবিতা
