ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

নীল নবগনে আষাঢ়গগনে

পুরাতন হৃদয়

পুরাতন হৃদয়
×

শিল্পকর্ম:: রণজিৎ দাস

রণজিৎ দাস

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চিত্রকর্মে বৃষ্টি নানানভাবে আঁকতে চেয়েছি। প্রথম যখন আর্ট কলেজে পড়ছি, প্রথম বর্ষে, অনেক বৃষ্টির ছবি এঁকেছি। তখন খুব সাধারণ বিষয়বস্তু বেছে নিতাম। বৃষ্টির ভেতর রিকশায় করে মানুষ যাচ্ছে, বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় যাচ্ছে লোকজন। আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন শিল্পী দেলওয়ার হোসেন; খুব ভালো চিত্রশিল্পী ছিলেন। যদিও এখন তাঁর নাম কাউকে বলতে শুনি না অথচ আমাদের অনেক ঋণ তাঁর কাছে; আমার আঁকা তিনি অনেক পছন্দ করে অন্যদের দেখাতেন। আমাকে উৎসাহ দিতে আমার আঁকা বৃষ্টির ছবি তিনি বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার খুব প্রিয় স্মৃতিগুলোর ভেতর এটা একটা। 
প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ একভাবে কাটল। তৃতীয় বর্ষ থেকে আমরা জলরং শুরু করি। তখন একটু বিস্তৃত কাজ করতে শুরু করেছি। সেগুলোও বাস্তবধর্মী ছিল। গ্রামের বৃষ্টিস্নাত দৃশ্যচিত্র এঁকেছি, নদীতে নৌকা যাচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে। শহুরে অলিগলির বৃষ্টি এঁকেছি। একসময় সময়ে বৃষ্টি বিষয়টি আমার কাছে ‘ফলিং অবজেক্ট’ হিসেবে ধরা দিতে শুরু করে। জানালার এপাশ থেকে দেখছি, ওপাশে ফলিং অবজেক্ট— আমার আঁকা এমন একটি ছবি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি যে ধরনে আঁকছি, সেখানে বৃষ্টিস্নাত ব্যাপারটা মিনিমালিজমে ধরা পড়েছে। হয়তো একটা ওয়াশ দিয়ে সেটাকে গড়িয়ে পড়তে দিলাম। 
বৃষ্টির ভেতর বেশ কিছু মজার দৃশ্য বা দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়। গ্রামে ও শহরে দৃশ্যগুলো আলাদা। শহরে যেমন, বৃষ্টির সময়, রাতে যদি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকাই মনে হবে চাঁদ নেমে এসে ওখানে স্থির হয়ে আছে। এভাবে বৃষ্টি অনেক দৃষ্টিজাত বিষয় তৈরি করে। বৃষ্টির বিশেষ কিছু ছবি আমি ইতালিতে এঁকেছিলাম। সেখানে প্রদর্শিত হয়েছে। বৃষ্টিস্নাত মুখ– এ ধরনের। এমন কিছু ছবি বাংলাদেশের পটেও আঁকা হয়েছে। 
বৃষ্টির সঙ্গে রোমান্টিসিজম জড়িত। এই রোমান্স নানান স্থানে, দৃশ্যে, শব্দে ধরা দেয়। যখন গ্রামে যেতাম টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতাম। সেও এক রোমান্টিক ব্যাপার। যখন আমি এঁকেছি, তখন মনে সুর উঠেছে। আবার যখন রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছি; রবীন্দ্রনাথের তো বর্ষার অপূর্ব সংগীত রয়েছে; তখন মন ছবি এঁকেছে। আমার আঁকা ও সংগীত এভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। 
বৃষ্টির আছে রকমফের
বৃষ্টি কিন্তু অনেক রকমই আছে। আমাদের এখানে জলবৃষ্টি। তেমনই কাশ্মীর বা ভুটানে আমি দেখেছি বরফবৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মায়া আরেক মাত্রার। আমাদের এখানে বৃষ্টি অর্ধস্বচ্ছ পর্দা তৈরি করে। সেখানে তুষারবৃষ্টির ভারী পর্দা নামে। তুষারবৃষ্টি এগিয়ে আসছে, আপনি দেখতে পারছেন একটা কাক ডাকছে। বৃষ্টি যখন চলে এলো, সব দৃশ্য ঢেকে গেল, কাক ঢেকে গেল। আপনি তার ডাক শুনতে পাচ্ছেন কিন্তু আর দেখতে পারছেন না। এ আরেক অনুভূতি। 
অনেকটা আমাদের দেশের মতোই বৃষ্টি পেয়েছিলাম রোমে। রোমে কিন্তু ওদের বর্ষায় মহাসাগরীয় হাওয়ার প্রভাবে আমাদের দেশের মতোই বৃষ্টি হয়। ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে এমন দেখিনি। বৃষ্টির ভেতর আমরা ভেনিসের পথে ছিলাম, নৌযানে। অপূর্ব সব দৃশ্য দেখেছি। 


যেমন ছবি আমরা দেশের বাড়িতে যাওয়ার সময় ফেরিতে থাকাকালে দেখতে পেতাম।
বৃষ্টি কিন্তু শুধু দৃশ্য নয়, অনুভূতিও। যে কোনো কিছুই দুইভাবে ধরা পড়ে। দৃশ্য ও অনুভব। বাড়িতে শুয়ে আছি, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এমন অনুভূতি হয়েছে যেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি ভিজছি। ভেজার কিছু স্মৃতি আমার সহধর্মিণী শিল্পী তন্দ্রা দাসের সঙ্গেও ছিল। তবে বৃষ্টি নিয়ে ওর আলাদা কোনো আগ্রহ ছিল না। বসন্ত ছিল ওর প্রিয় ঋতু। তবু আমাদের বৃষ্টিভেজা অনেক স্মৃতি আছে। দৃশ্য সরে গেছে। সেসব এখন অনুভবের অংশ। 
এক ঝড়ের স্মৃতি
আমরা থাকতাম শহরে। মাঝে মাঝে গ্রামে যেতাম। আমার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। তখন বোধহয় স্কুল শেষ করেছি। টাঙ্গাইলে গেলে সব জ্ঞাতি-ভাইবোন এক হতাম। বেশ আনন্দ হতো। আমরা গেলে ওরা একটা চড়ুইভাতির মতো করত। সেবার বর্ষা। সেবারও ঠিক হলো চড়ুইভাতি হবে। 
বাড়ির কাছে একটা বাঁওড় ছিল। সেই বাঁওড় থেকে একটা খাল গিয়ে মিশেছে নদীর সঙ্গে। যখন বর্ষায় জল ফুলে উঠত, সেই খাল দিয়ে প্রবল বেগে এসে মিশত বাঁওড়ের জলে। জেলেরা তখন খালে ধর্ম জাল পেতে দিত। সেই জালে মাছ পড়ত প্রচুর। 
চড়ুইভাতি করব বলে সেই খালে মাছ ধরা জেলের খোঁজ পড়ল। এমন একজনকে আমরা পেয়েও গেলাম। একটি ছেলে, প্রায় আমারই বয়েসী। তার বাবার জাল পেতে মাছ ধরছি। তাদের নৌকা আছে। বাবা গেছে শহরে। সেদিন মাছ ধরা ও দেখাশোনার দায়িত্ব তার। 
আমরা গিয়ে বললাম, “এখানে আজ আমরা পিকনিক করব। তুমি যে মাছ ধরবে সেগুলো আমরা নিতে চাই। আর রান্না করব তোমার নৌকায়।” 
ছেলেটা রাজি হলো। ধর্মজাল তোলা হলো। অনেক নলা মাছ উঠেছে, অর্থাৎ রুই মাছের বাচ্চা। আবার জাল নামানো হলো। 
মুরগির ব্যবস্থাও ছিল। তখন চড়ুইভাতিতে এর-তার বাড়ি থেকে নানান কিছু আনা হতো। সবকিছু যে চেয়েচিন্তে নিয়ে আসা হতো তা কিন্তু না। আর এতে মাসি পিসিদের নীরব সায় ছিল। শিশুদের আনন্দে কেউ বাধা হতো না। মুরগির ব্যবস্থাও কী উপায়ে হয়েছে তা কেউ জিজ্ঞেস করেনি। 
যা হোক, নৌকায় রান্নার জোগাড়যন্ত্র চলছিল। এর ভেতর কিন্তু মেঘ ঘনাচ্ছে। ঝড়জল এগিয়ে আসছে। চারদিকে তারই আভাস। 
আমাদের এক-আধটু ভয় করছিল না তা নয়। কালো মেঘ আমার মনে একটা একটা আধিভৌতিক আবেশ তৈরি করে। একেকবার মনে হলো দানবীয় কিছুর আগমনের থমথমে অপেক্ষায় আছে প্রকৃতি। 
হঠাৎ প্রবল তুফান উপস্থিত হলো। আগুন বাঁচানো কঠিন। রান্না করবে কীভাবে। নৌকা টলছে। রাতারাতি তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। বাতাসে প্রবল দাপটে অত বিরাট ধর্মজাল ভেসে উঠে বাঁশ ভেঙে জাল ছিঁড়ে মুহূর্তে সব তছনছ। প্রলয় উপস্থিত। আমি শহুরে মানুষ। ধারণাও ছিল না কী করব এখন। 
কোনোক্রমে সবাই নিজেকে বাঁচালাম। চড়ুইভাতি মাথায় উঠল। 
সেই ছেলেটা বড় কষ্ট পেল। তার জাল ভেঙে গেছে। আজ বাবার কাছ থেকে দায়িত্ব পেয়েছিল, কী জবাব দেবে? 
আমরা চাঁদা তুলে ওকে বাঁশ কিনে দিলাম। কিন্তু জালটার ব্যবস্থা তাকেই করে নিতে অনুরোধ করেছিলাম। রাজি হলো ছেলেটা। 
সেদিনের ঝড়জল আমার মনে স্থায়ী রেখাপাত করে আছে।   
টুকরো স্নাত স্মৃতি
গ্যালারি কায়ার প্রথম আর্ট ট্রিপে থাইল্যান্ডের কোহ সামেত দ্বীপে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার শিক্ষক ও জলরঙের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হামিদুজ্জামান খান। 
হামিদ স্যার আমার দীর্ঘশ্বাসজুড়ে। আমার সৌভাগ্য, তাঁর স্নেহ পেয়েছি। কোহ সামেতের নিসর্গ বর্ণনাতীত। সেখানে চমৎকার এক রিসোর্টে আমরা উঠেছিলাম। একদিন বেশ আয়োজন করে বৃষ্টি নামল। রিসোর্টের ভেতর খানিকটা খোলা অবকাশে আমি আর আমার স্যার এক প্রতিযোগিতায় নামলাম। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে বেশি আঁকতে পারে। 
এই স্মৃতি ভোলার নয়। হামিদুজ্জামান খান কিংবদন্তি বহুপ্রজ শিল্পী। বিপুলা সৃষ্টি রেখে গেছেন। সারাক্ষণ কাজ করতেন। 
দুজনে দ্রুত হাত চালাতে থাকি। বেশ একটা সাড়া পড়ে যায়। এমন আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যে ভোলার না! 
একসময় আমার কাগজ শেষ হয়ে গেল। দেখলাম দূরে কী একটা কাগজ বুঝি গড়াচ্ছে। বললাম, “স্যার আমি ওটা নিয়ে আসি?” 
আমার ভেতর একটা শিশু ছটফট করছিল। স্যার বলল, “হ্যাঁ নিয়া আসো, আঁকো।” আঁকলাম। 
কে জিতেছিল? হাহাহা, কেউ হারেনি। দুজনই সমান সমান এঁকেছিলাম। 
সিলেটে আমার বোনের বাড়ি। এক আষাঢ়েই বোধহয় সেখানে ছিলাম। সুরমা নদীর ওপর যে বৃষ্টি দেখেছি, বিখ্যাত সিলেটি বৃষ্টি, তারও কি কোনো তুলনা আছে? কিংবা লালা খালখ্যাত সারী নদীর ওপর বৃষ্টির স্মৃতিও কখনো ভোলার মতো না। 
গৌতম চক্রবর্তীর উদ্যোগে আরো গিয়েছিলাম কালিম্পংয়ের নেওরা ভ্যালিতে। সেখানে নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের এক দারুণ সমন্বয় তৈরি হয়েছিল। অগ্রজদের ভেতর আমি ছাড়া ছিল শিল্পী শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, শিশির ভট্টাচার্য্য ছিলেন। নবীনদের ভেতর ছিল আনিসুজ্জামান, সোহাগ পারভেজ, তারেক আজিম, আলপ্তগীন তুষার ও আরও কেউ কেউ। সেখানে বৃষ্টিও ঝরেছে, বরফও পড়েছে। সংগীতে, সৃষ্টিতে অপূর্ব সময় কেটেছিল।
আরেকবার বৃষ্টি আমাদের পেয়ে গেল বান্দরবানের এক রিসোর্টে। সেখানে বৃষ্টি আর রোদের যুগপৎ প্রদর্শনীতে আমি বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। কক্সবাজারের এক আর্টক্যাম্পে আমার আঁকা একটা ছবি প্রকৃতির ইশারায় হঠাৎ হাত ফসকে পড়ে গেল বৃষ্টির ভেতর। তারপর অল্প জলে তলিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তুলে আনলাম। 
হায়, গেল তো ছবিটা! 
স্বর্গীয় কৌতুক। ছবি নষ্ট তো হলোই না, উল্টো প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওয়াশে এক আশ্চর্য দীপ্তি পেয়ে গিয়েছিল! এবং ঢাকায় ফিরে গৌতমের প্রদর্শনীতে সেটাই সবার আগে বিক্রি হয়ে যায়। 

আরও পড়ুন

×