ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

অচিন বাঁশির সুর

অচিন বাঁশির সুর
×

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

আশরাফ উদ্দীন আহ্‌মদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধানে একটু সোনা-সোনা রং ধরলে দেখা যায় ঝাঁক-ঝাঁক নানান রঙের পাখি। টিয়াপাখিও আসে দূরদেশ থেকে। হরেক পাখির কলরবে মুখর থাকে ধানজমিন। সোনা সোনা ফসলের মাঠ তখন পূর্ণ যৌবনা তম্বী তরুণী। অঙ্গজুড়ে তার মাতৃত্বের গৌরব। পাখির মনজুড়ে তখন অন্যরকম আবেগ। ইঁদুরের মতো পাখিও নতুন নতুন সঙ্গীসাথি খুঁজে যায়। ভালোবাসার মিনতি আর কাকুতি উপেক্ষা করতে পারে না নারী পাখিগুলো। দল বেঁধে ফসলের মাঠে উড়ে উড়ে এসে বসে। পাখিদের কলকাকলিতে ভরে ওঠে আসমান-জমিন। হালকা রোদ্দুর আর মিষ্টি বাতাস ধানগাছের গায়ে হেলান দেয়। মন উদাস হয়ে যায় নদেরচাঁদের। একটা তরলা বাঁশের আড়বাঁশি হাতে বিলের মাছের মতো ছুটে বেড়ায়, সিঙমারা থেকে সাব্বিতলা-ঝুমুরগাঁ-কাঠগোলা-দুগ্গাদহ-বিড়ালমারী, ওপারে নদীপারে নয়নতলীবাজার। ঘুরে বেড়ায় পাখির মতো, ভেসে যায় মাছের মতো হেথায়-হোথায়।
বাজারের শেষপ্রান্তে ঢালু পায়ে চলা পথ নেমে গেছে ত্রিমোহনী বিলে। শীতের মৌসুমে কোটি পাখির মেলা বসে। দু’দশ মাইলের গাছে-গাছে আগমনি পাখিদের আশ্রয় দেখে মন ভালো হয়ে যায় তল্লাটের মানুষজনের। নদেরচাঁদ চারদিকে ঘুরে-ঘুরে ওদের দেখভাল করে। ভ্রমণপিপাসুদেরও পাখি শিকার করতে দেয় না কোনোভাবে। দেখে চোখের তৃপ্তি মেটাও, খুন কেন করবে তাদের? পাখির রক্তে কেন ভিজবে মাটি-জমিন? নদের চাঁদের আড়বাঁশির সুর দূরকে কাছে টানে। কী আছে ওর সুরে... বিমর্ষ মনপ্রাণ কেমন শান্ত হয়ে যায় আলতাদীঘির কালো স্বচ্ছ শীতল জলের মতো। সুর ছড়িয়ে যায় আকাশে-বাতাসে সাতরঙা রংধনু যেন। আহা কী আনন্দ কী সুবাস আকাশে-বাতাসে। এমন দিনে ঘরে কার মন বসে, ঘর কি পারে মনকে ভালো করে দিতে। মনের খুশিকে কানায়-কানায় ভরিয়ে তুলতে।
নদেরচাঁদ ঘরছাড়া এক পাগলপনা টাইপের বাউন্ডুলে। ওর কোনো ঘর নেই, নেই সাকিন-ঠিকানা। কোথা থেকে এসেছে, কোথায় তার ভেসে চলা, জানে না কিছুই সে। গ্রামের জোতদার তালুকদারের বড় ছেলে নেকাব্বর ওকে কুড়িয়ে পেয়েছে বাইজিতপাড়ার ওপাশে মহাশ্মশান, সেখানের এক মরা বিলের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে ছিল। যখন ওকে উদ্ধার করে সারা গায়ে পচা প্যাকের দুর্গন্ধ। আর মুখে সাতকালের চোনা বাংলা মদের গ্যাঁজানি। মুখ দিয়ে ভুরভুর করে সে গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। বমি করা পচা ভাতের মাখামাখি গায়ে। খিস্তি করতে-করতে ডাঙায় তুলে এনে বাড়িতে ঠাঁই দেয় ওই পাগলাকে। সেই থেকেই বহাল তবিয়তে আছে। বাজারের মোকাম পাহারা দেয়। বাড়ির গরু-বাছুর দেখভাল করার তো একজন রাখাল-বাখাল আছেই, সে সঙ্গে ওই পাগলারও জায়গা হবে না-বা কেন। দরকার হোক বা না হোক তাতে কী আসে যায়, থাকুক না আরেকজন। সবার হলে ওরও হবে না বা কেন দুটো দানাপানি।
নদেরচাঁদ বড় বেশি মনিবভক্ত। সেখালি চৌকিদারের খোঁয়াড়ে রাখা গরু সেদিন যেভাবে ছিনিয়ে এনেছিল, তাতেই নেকাব্বর তালুকদার বুঝেছে নদেরচাঁদ মানুষ ভালো। মনের ভেতর এখনও কয়লা মাটি ধুলো জমেনি। ওমন এক ভোলাভালা ছেলেকে সে যে কুড়িয়ে পেয়েছে এবং তাদের সাথে এখন বেশ আছে, তাতেই-বা কম কিসের। বাঁশির সুর দিয়ে বাড়ির সমস্ত মানুষকেও বেশ বশীকরণ করে ফেলেছে আন্দাজ করা যায়। হয়তো এ কারণে মানুষে বলে বাঁশিতে জাদু থাকে। জাদু কি বাঁশিতে থাকে, সুরে থাকে। সে সুর মধুর হয় দূরের মানুষকে কাছে টেনে আনে। মন মাতিয়ে তোলে সাত গাঁয়ের মানুষের। হয়তো তাই, নয়তো সবই মনের খেয়াল। 
কুকুরডাঙার ওদিকে সীমারানীর মদের ভাটি। সন্ধ্যে হতে না হতে কত জোগাল বাগাল কামলা ছুটে যায় ট্যাঁকে টাকা গুঁজে। সেদিন ধানের মোকামের ম্যানেজার তাহাবুল মুন্সী বলেছিল নেকাব্বরকে। কুকুরডাঙার সীমারানী জ্যান্ত কুত্তা বটে, টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না...
নেকাব্বর বলে ওঠে, টাকার জন্য সবার ওই একই মূর্তি!
–সে কী কথা!
–কথা আবার কি, টাকাই তো মানুষের সবকিছু... 
তাহাবুল কিছুদিন নেকাব্বরের সঙ্গে গ্রামের বাইরে রাঁধানগরের দিকে কোনো এক স্কুলে পড়েছে, সেই সূত্রে বন্ধু। সে কারণে নেকাব্বরকে মালিকের চেয়ে বন্ধু হিসেবে মনে করে বেশি। আবার শোনা যায় তেলেঝোলে কোথায় নাকি রক্তের সম্পর্কও আছে খানিক। সে যা-ই হোক, এখন কিন্তু সে মালিক, তারপরও বন্ধুত্বের সুযোগ ছাড়ে না। নেকাব্বর বলে ওঠে, তা তুমি ওদিকে আজকাল খুবই যাও নাকি শুনছি...
–হ্যাঁ তা বলতে পারো, বিয়েশাদি করিনি, কী করব বলো!
–বিয়ে করতে নিষেধ করেছে কে, বিয়ের বয়স তো কোন কালে চলে গেছে।
–সেটাই তো কথা, নাহ বিয়ে আর করছি না প্রতিজ্ঞা করেই তো ওদিকে আর যায়নি বন্ধু।
–বেশ ভালো করেছো!
–কিছু কি বললে আমাকে...
–না বলছিলাম বিয়ে না করে ভালোই করেছো একখান।
–কিন্তু তোমরা তো বিয়ে করে ঘরকন্না ভালোই করছো...
–ওই অবধি সুখ, বিয়ে না করেই ভালো আছো বরং...
–ওহ যা বলছিলাম, তোমার ওই জাদুর বাঁশির নদেরচাঁদকে সেদিন দেখলাম তো কুকুরডাঙার সীমারানীর চটিতে...
চোখ চড়কগাছে ওঠে নেকাব্বরের। তাহাবুলের কথা অবিশ্বাস করতে পারে না। দিনে দিন ছোড়াটা বেশ জাঁহাবাজ ফোরটুয়েনটি হয়ে উঠছে। শাসন বারণ কিছুই মানতে চাই না। তারপরও ওর ওপর একটা টান অনুভব করে সর্বদা। কোথা থেকে যে টানটা আসে, তা আজও আন্দাজ করতে পারে না। ওর চোখ, ওর মুখে কিসের একটা মায়াবী ছায়া লেগে আছে, যা দেখে যে কারও ভালো লেগে যায়। রক্তের বা আত্মীয়তার কোনো গেঁড়ো নেই, তারপরও বিনা সুতোর একটা বাঁধন লক্ষ্য করে।
একদিন নদেরচাঁদ বলে, আমি খুঁজে যাই...
নেকাব্বর প্রশ্ন করে, কারে খুঁজে মরিস রে পাগলা।
–সে তো অনেক কথা, কিন্তু আমি খুঁজে যাবই...
–কে সে কারে...
এতটা কাছ থেকে দেখেও ওকে চিনতে পারে না নেকাব্বর। কী খোঁজে সে। ওর উদাসীন চোখে কিসের এক মোহ, কিসের মায়া এতটা। জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করলেও আর বলার সময় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে বড় বেশি খাবি খেতে থাকে। কুকুরডাঙার সীমারানীর সাথে ওর কোনো সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। নয়তো কেন সে ওখানে গেছে, বাংলা মদের টানে কি যেতে পারে! যতদূর জানে সীমারানী তো মাঝবয়সী, শরীরের খিদে অনেক আগেই সাঙ্গ হয়েছে ওর। তা’লে কিসের জন্য নদেরচাঁদ ওর শ্যাওলাপানা যুক্ত পুষ্কুনিতে ডুব দিতে যাবে। নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। সে কারণ খুঁজে যায় সে।
ডুমুরতলীর ইটগোলার দিকে চৈতালি মেলা বসে, গ্রামীণ মেলা, দিনেদিন মেলা বিশাল আকার ধারণ করছে। সাঁওতাল নারীদের আগমন বেশি হয়, এ সময় নাকি তাদের কোনো একটা পরব। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা মিলেমিশে মেলা আরও ব্যাপক হচ্ছে আজকাল। নদেরচাঁদ একরাত্রে মেলায় যায় যাত্রা দেখার নেশায়। যাত্রা তার শরীরের শিরায়-শিরায়। বাঁশি বাজানো যেমন ওর নেশা, যাত্রা দেখাও একপ্রকার নেশায় বলা যায়। মাঝরাত্রি শেষ হয়ে গেলেও নেকাব্বর তালুকদার বোঝে না কোথায় যেতে পারে। রাত্র অনিন্দ্রা কেটে যায়। সুবেহ সাদিকের পরপর বাড়ির প্রাচীর টপকে নদেরচাঁদ বাড়ি ঢোকে। এবং মুখোমুখি নেকাব্বরকে দেখেই থমকে যায় সে। হাতের বাঁশি মাটিতে পড়ে যায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুজনে। অনেকটা সময় এভাবে যাওয়ার পর নদীর স্রোতের মতো বেগবান হয় তারপর। আর কিছু বলে না। কয়েকদিন কথা বলা বা মুখোমুখি দেখা হওয়া একেবারে বন্ধ ছিল, কিন্তু নদেরচাঁদ তার কাজ ঠিকই চালিয়ে যায়। দিনও কারও পড়ে থাকে না। চলতে থাকে চলতেই থাকে, নদী যেমন আপন বেগে পাগলপারা। নদেরচাঁদের বাঁশির সুর কানে বাজে। দূর পথিক থমকে দাঁড়ায় ওর মোহন বাঁশির সুর শুনে।
একদিন নেকাব্বরের মেজো মেয়ে সোনাভান বলে, চাঁদ তুমি কি আমাকে বাঁশি দেবে, আমিও সুর তুলব...
–তুমি পারবে না গো...
–কেন পারব না, তুমি শিখিয়ে দেবে, দেবে না! 
–শিখিয়ে দেব...
–আমি তো নিজেই কোনোদিন শিখিনি।
–তুমি তা’ লে কীভাবে ওমন করে সুর তোলো...
–জানি না তো!
–সত্যিই তুমি জানো না...
–না গো না...
নেকাব্বরের মেয়ের কথা শুনে চাঁদ কোনো কথা না বলে শুধু বাঁশিটা এগিয়ে দেয় তার দিকে। সেদিনও আকাশে ছিল সপ্তমীর চাঁদ। রাতটা বড় চঞ্চল করেছিল সোনাভানকে। চাঁদ যে তাদের বাড়ির বাঁধা মুনিষ সে কথা ভাবতে ইচ্ছে করছিল না একটুও। চাঁদের বাঁশি হাতে নিয়ে, বাঁশির গায়ে হাত দিয়ে সাতটি ফুটো দেখে ফিরিয়ে দেয় তারপর। সোনাভানের বুক ফেটে নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে হলেও আর বলতে পারেনি। বাঁশের বাঁশি দেখে মন আপনা থেকেই ভালো হয়ে যায়। ওর বুকে কত উথালপাথাল সুর, যা শুনে মনপ্রাণ হারিয়ে যায় কোন্ সুদূরে। চাঁদের সুরে কি যেন এক বিষ নাকি সুধা মাখা আছে। সত্যিই কি মায়া নাকি ইন্দ্রজাল ছড়ায় ওর সুর। সোনাভান কেমন যেন মিশে যায় বাঁশির সুরে। সে’ রাত্রের পর সোনাভান আর কখনও চাঁদের কাছে যায়নি। নদেরচাঁদ সে তো নদীর দেশের মানুষ। নদীতেই ভেসে বেড়ায়। ওর সাথে কিসের এত মিতালি সোনাভানের। নেকাব্বরের কানে তারপরও কথাটা যায়। তার দিন পাঁচেক পর নদেরচাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাঁশির সুর আর বাতাসে দোলা খেয়ে-খেয়ে ভেসে বেড়ায় না। তল্লাটের মানুষগুলোও তেমন অধীর হয়ে থাকে না বাঁশির সুর শুনতে। মানুষ-নদী বাঁশি-সুর সময় হয়তো এভাবে সব পর করে দেয়। গাছের পাখিরাও সুরের মানুষটির কথা আর মনে রাখেনি। পাখিরা রাত্রের আলো গায়ে নিয়ে ঘরে ফেরে, আবার ফজর বেলায় কোথায় হারিয়ে যায়, কোন দূর বহুদূর তেপান্তরে নাকি কোন্ সুদূর দেশ-বিদেশে।
আচমকা এতদিন ভরদুপুরবেলা নেকাব্বরের মেজো মেয়ে সোনাভান দেখে নদেরচাঁদ তার ঘরের পেছনে আতাগাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আছে। ভয়ে চিৎকার করে ডাকাডাকি করলে গ্রামের মানুষজন তাদের বাড়ি এসে ভিড় করে। তারপর তারা থানা পুলিশে খবর না দিয়ে মৃতদেহ নামিয়ে দেখে, সেটা নদেরচাঁদের নয়। সোনাভান লক্ষ্য করে দেখে, তার বাপ নেকাব্বরের লাশ। নেকাব্বর তালুকদার কেন এভাবে দড়িতে ঝুলতে গেল সাত গাঁয়ের মানুষ ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায় না। মানুষজন বেশি দিন ওসব নিয়ে আর ভাবে না। যে যার কাজে নিজেকে হারিয়ে ফেলে তারপর।
নদেরচাঁদের সাথে নেকাব্বর যে এভাবে হারিয়ে যাবে কেউই কি তা জানত! শ্রাবণের বৃষ্টির দিন শুরু হয়, কদম ফুলের দিকে তাকিয়ে সোনাভান অনেক অনেক কিছু ভেবে যায়। ওর ভাবনাগুলো বড় এলোমেলো এখন। কোনো কথা আর সেভাবে গুছিয়ে বলতে পারে না। দিনমান বৃষ্টির বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুমোট কালো আকাশ দেখে। পাখিরা ডাকে না অনেকদিন যেন।  
হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় কী এক নাম না জানা মিষ্টি ফুলের সৌরভ নাকে ধাক্কা দেয়। বাঁশির সুর যেমন আর আসে না, তেমনি বাপের বাজপড়া কণ্ঠস্বর ভেসে আসে না। কোথায় সব মিলিয়ে গেল। নদীর দেশের মানুষেরা কত সরল হয়, নদীর মতো নিরবধি সুর ধরে বয়ে যেতেই জানে। যাওয়া পথে কত শ্যাওলা কচুরিপানা জঙ্গলের মুখোমুখি হয়, তাতে কী, সবকিছুই সরিয়ে ভেসে যায় আপন গন্তব্যে। এভাবে যেতে-যেতে তারপর যেতে-যেতেই জীবনের দিশা খুঁজে পায়। জীবন হয়তো এভাবেই সোনার ফ্রেমে বাঁধা না থেকে উড়ে-উড়ে যায়। পাখির মতো...অতিথি পাখিরা যেমন উড়ে যায় আবার শীতে ফিরে আসে চেনা সে দেশে।
পরের বার চৈতালি উৎসবে ডুমুরতলীর ইটখোলার মাঠে নদেরচাঁদের দেখা মেলে। বাসন্তী অপেরায় বংশীওয়ালা নদেরচাঁদের উপস্থিতি লক্ষ্য করে নেকাব্বর তালুকদারের খালাতো ভাইয়ের ছোট শ্যালক গুলটে। গুলটে ছিল একটু ভেজাল মাল। বিয়েশাদি করেনি বলে এদিক-ওদিকে চষে বেড়ানো ছেলে। একবার তো কোনো যাত্রাপেরায় নাচনেওয়ালীকে প্রেমে মজিয়ে পালিয়ে এসেছিল। সে এক মস্ত  ফিরিস্তি। গুলটেকে দেখে নদেরচাঁদ প্রথমে না চেনার ভান করেছিল নাকি! কিন্তু খুব বেশি আড়াল করতে পারেনি।
–তুমি আমার দুলাভায়ের খালাতো ভায়ের খাস লোক, চিনব না আমি তোমাকে বাপধন।
–আহা সে কথা বলছিনে, বড় বিপদে আছি গো!
–তা তুমি ওভাবে পালিয়ে গেলে কেন বলো তো?
–কোথায় পালিয়ে যাব, হেতালখালী বাজারের ওদিকে এক পাটের আড়তে কাজ নিয়েছিলাম, এক অমাবস্যার রাত্রে মালিকের ক্যাশবাকসো চুরি হলো, আর আমাকে পাছায় লাথি মেরে পুলিশে দিল...
–পুলিশে দিল তোমাকে।
–তাই তো বলছি ছাড়া পেয়ে বাসন্তীতে যোগ দিলাম, পেটের দায় বড় কি না...
পরিমলের বাঁশ-বাঁখারির ঘেঁষা চায়ের স্টলে বসে কথা হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। চায়ের পানি কেতলিতে টগবগ করে ফুটছে। আগুনের আঁচে পরিমলের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে ক্রমগত।
–কী বলব শালা দেশটা সুদখোর-মুনাফাখোর আর হারামখোরদের হাতে চলে গেছে...
নদেরচাঁদের অকস্মাৎ এমন কথা শুনে গুলটে বলল, তাতে তোমার কী, সে যার হাতেই যাক না কেন।
–না দেশ নিয়েও তো চিন্তা করতে হবে, জেলহাজতে ছিলাম কয়েক মাস, ওখানে শালা নানান কিসিমের মানুষের মেলা, নানান রঙের ছড়াছড়ি যাকে বলে...
–নেকাব্বর গলায় দড়ি দিয়েছিল, তুমি কি জানতে পেরেছিলে।
–সে তো জেলে বসেই খবরটা পায় গো! কিন্তু গলায় দড়ি কেন দিল, নাকি অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকেই কেউ ঝুলিয়ে দিয়ে, স্বেচ্ছায় মরণ বলছে...
গুলটে একটু হোঁচট খায়। অসম্ভব কিছুই নয়। ভায়ে-ভায়ে শরীকে-শরীকে ওমন কত ঘটনা দেশ-সমাজে হরহামেশায় ঘটছে, কে তার খবর রাখে। বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কৃষ্ণচূড়া-রাঁধাচূড়া গাছের দিকে তাকিয়ে অনেকটা সময় পর গুলটে তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, সোনাভানের সঙ্গে তোমার কি জমজমাট প্রেম হয়েছিল... 
নদেরচাঁদ মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে যায়। হঠাৎ একটা ট্রেন জেব্রাক্রসিং পার হয়ে ছুটে যায় গন্তব্যে। তেঁতুলতলা মোড়ে ক’দিন আগে একটা পিকআপভ্যান লোকাল ট্রেনের সাথে ধাক্কা খায়। গরুবোঝাই পিকআপভ্যানটি উল্টে তিনটে গরু মরে, আর ড্রাইভারসহ দুজন রাখাল মরে যায় মুহূর্তে। তারপর থেকে তেঁতুলতলার নাম পাল্টে হয়েছে মরণতলা। গুলটের কথা শুনে নদেরচাঁদ কী বলেছিল, আমরা কেউই আর শুনেনি। তবে গুলটে গ্রামে এসে বেশ জোরেশোরে রটিয়ে দেয়, যে নদেরচাঁদ নাকি সোনাভান বিহনে বৈরাগী হয়ে গেছে।
তারপরও একটা প্রশ্ন রয়ে যায়। কিন্তু উত্তর দেবে কে? উত্তর দেওয়ার মুরোদ কার-বা আছে। তবে কামারপাড়ার পটোল জ্যাঠা বলেছিল, হরি হরি... কালে-কালে আর কত কিছু যে দেখব-শুনব, বাতাসে এখন প্রেমও উড়ে বেড়ায় পাগলা...
ইঁদুর-ছাড়পোকা-উঁকুনমারা বিষটু ফেরিওয়ালা পটোল জ্যাঠার কথা শুনে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়েই বলে ফেলে, নদীর দেশের মানুষ নদীতে ভেসে বেড়াই গো, প্রেম ভালোবাসাও যে নদীর মতো ভেসে বেড়াই, তা বা কে জানত ঠাকুর!
ঘাটের পারানি মনুমাঝি তখনও কান খাড়া রেখে শুনে বলে ওঠে, সে যা বলেছে, সব ভালো যার শেষ ভালো তার...
শেষ ভালো বলতে কী বোঝায় বোঝে না মানুষ। কিন্তু ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো মানুষের জীবনকাহিনি। জীবনের ধারাপাত।
মাঘের একঝলক রোদের বুকে বুক মিলিয়ে আকাশ ভাতের মাড়ের মতো নির্বাক তাকিয়ে তখনও। নতুন খোয়া ফেলা সড়ক ধরে সাইকেল ঠেলে গুলটে দক্ষিণমুখী নয়নতলী বাজারের দিকে চলে যায়। আজ নাকি হপ্তার হাট। বেলাশেষে হাটে গেলে মজা দ্বিগুণ, একসঙ্গে অনেক বন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া যায়। সময়ও মানুষকে আলাদা সম্মান দেয়। বাতাসে তখনও তরলা বাঁশির সুরেলা সুর ভেসে ভেসে আসে। সুরটা বড় মধুর, কানে সে সুর যেন সুধা ঢেলে দেয়। 

আরও পড়ুন

×