ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত

মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত
×

মূল : লাসলো ক্রাসনাহরকাই অনুবাদ : সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

পর্ব :: ৪

“সংস্কৃতি হলো একটা কোড– যেটা পড়লেই বোঝা যায় মানুষ কী চায়, কীসে ভয় পায়, আর কোথায় যেতে চায়”
               অথবা
“পছন্দ করো আর না করো– আমরা মঙ্গলে যাব… পৃথিবীকে বাঁচাতে নয়, মানুষকে বাঁচাতে”

~

পানি নেই– এই নাও, একটু ভদকা– তেষ্টায় কাজ দেয়– তুমি কাতরিয়ো না– বুঝতে পারছি তুমি কষ্টে আছো– আমিও আছি– পাত্তা দিও না– আমার কথা শোনো, সংস্কৃতি হলো একটা কোড, সেই কোড, যা পড়লে বোঝা যায় মানুষ কেমন, কী চায়, কী ভালোবাসে, কীসে ভয় পায়, কাকে ভালো বা খারাপ মনে করে, তাদের লক্ষ্য কী, ইত্যাদি; আগেকার দিনে বুকে চাপ অনুভব করলে মানুষ নিশ্চিতভাবে ধরে নিত–  ঘুমের মধ্যে একটা ভূত এসে বুকে চেপে বসেছে, পরে যখন ঘুরে ঘুরে উড়ে পালিয়ে যেত সে খুশি হতো যে খুব সামান্যতেই সে বেঁচে গেছে, আর এখন আমরা জানি এটা নিছক এসিড রিফ্লাক্স, আমরা অনেক কিছুই জানি, আমরা অনেক বেশি যুক্তিবাদী হয়েছি, কিন্তু মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক কমে গেছে, তাছাড়া আমরা এখন নিজেদের অনেক দ্রুত পাল্টাতেও পারি, 
মধ্যযুগের মানুষ আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে রাস্তায় হাঁটত, তাদের জুতোর তলা ছিল খুব অমসৃণ, খুব পাতলা, ফুটপাত বলতে তেমন কিছু ছিল না– বড়জোর এবড়োখেবড়ো পাথর, সবকিছুই পায়ে বিঁধত, তাই তারা হাঁটতে গেলে প্রথমে পায়ের আঙুল নামাত, তারপর গোড়ালি, অথচ এখন আমাদের হাঁটার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা–
কী দাঁড়াল? প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কারণে জৈবিক পরিবর্তন?– হ্যাঁ, ঠিক তাই, এখন তো হাঁটতে হাঁটতেও ফোন থেকে চোখ তোলা যাচ্ছে না,  ফলে আড়চোখে দেখা শক্তিশালী হয়েছে হয়তো, কিন্তু বিপদের অনুভূতি কমে গেছে, তুমি চাও আমি ডেটা দিই? না? ঠিক আছে, তাহলে দিচ্ছি না, সময়ের কথাই ধরো, আমরা সবাই সময়ে বিশ্বাস করি, ঘড়ি দেখে চলি, দিন পরিকল্পনা করি, দশ মিনিট পরে কী করব বা দশ-বিশ বছর পরে কী করব, এখনই ঠিক করি, অথবা রোবটের কথা ভাবো, দেখ, তাদের অস্তিত্ব এখন বাস্তব, – ভয়... ধুর, মানুষ কেন তাদের কেন ভয় পাবে, রোবটকে দিয়ে সেই কাজগুলোই করানো হয়– যেগুলো সব সময়ই বিরক্তিকর ছিল অথচ করতেই হয়, দেখো, আমরা যদি রোবট ব্যবহার করি, তাহলে কী পাই?– অবসর সময়; খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ; পড়াশোনার ফাঁক; নতুন কিছু শেখার দরজা; স্বীকার করছি, আমি নিজেও সব সময় তা কাজে লাগাই না, কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে– আজকের দিনে, জোর দিয়ে বলছি, আজকের দিনেই হাতে একটু ফাঁক পেলেই আমরা তা কোনো না কোনো কিছু দিয়ে ভরতে চাই,  অথচ খুশি হওয়ার জন্য এত কিছু লাগে না– শুধু বেঁচে থাকা, টিকে থাকা, সুস্থ থাকা, গাছের পাতায় আলো ঝলমল করা দেখা, ঝরনার কলকল শোনা, পায়ের চারপাশে লম্বা ঘাসের মৃদু শব্দ অনুভব করা–এসবই তো আসল প্রাপ্তি– এগুলোই সত্যিকারের আনন্দ, এক ধরনের বিস্ময়কর অর্জন– যাকে আমরা ভবিষ্যতের আশায় ঠেলে দিই, হয়তো একজন তথাকথিত ‘ভবিষ্যদ্বিদ’-এর মুখে এ কথা শুনতে অদ্ভুত লাগে, কিন্তু এটাই বাস্তব; ভাবো তো– আমরা এমন এক প্রজাতি, যারা যন্ত্র ব্যবহার করি– আর জীবজগতের ইতিহাসে এই প্রথম, কোনো যন্ত্র ব্যবহারকারী প্রজাতি যারা নিজের কাজটাই যন্ত্রের হাতে তুলে দিচ্ছে, রোবট আসলে আকর্ষণীয়– কারণ তারা ডিজিটাল সংস্কৃতিকে বাস্তব জগতে এনে দিচ্ছে, তারা অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে উন্নত হচ্ছে, তারা যা শিখছে, তা আর হারিয়ে যাবে না– বরং তারা ক্রমেই আরও বুদ্ধিমান হবে; রোবটের বিকাশ অবশ্যম্ভাবী– যেমনটা আমাদেরও হয়, অবশ্য রোবট প্রথমে ভয়ের মনে হতে পারে, কিন্তু চাকা, টেলিস্কোপ, বাষ্পীয় ইঞ্জিন, দ্রুতগামী গাড়ি, উড়োজাহাজ– এসবও তো প্রথমে ভয়েরই ছিল, তালিকা আর বাড়ানোর দরকার নেই, নতুন জিনিস শুরুতে আমাদের অচেনা লাগে, তাই ভয় জাগে; কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই– ব্যবহার করি, আর ব্যবহার করতে করতে একসময় ভালোবেসেও ফেলি– তাই মেনে নেওয়াই ভালো– রোবটের কাজ আমাদের সাহায্য করা, তারা আমাদের জন্যই এসেছে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, রোবটের তো কোনো বাসনা নেই, কোনো আবেগও নেই, সে কি তোমাকে প্রলুব্ধ করবে? তারপর গুলি করবে? কেনই-বা করবে? ভয় পেও না– সব ঠিক হয়ে যাবে। বরং, হয়তো আরও ভালোই হবে,
–আমার তেষ্টা পেয়েছে–
বললাম তো শুধু ভদকা আছে, না চাইলে ঠিক আছে, ঘা ধোয়ার জন্য ব্যবহার করবে? একদমই না, এটা মূল্যবান ভদকা, পরে পানি আসবে, শান্ত থাকো, এই অভিশপ্ত গ্র্যাডগুলো প্রায় শেষ হয়ে এলো, ব্যথা হলে হোক, ব্যথা ভালো, তার মানে শরীর লড়ে চলেছে, লড়তে থাকুক, আমার কথা শোনো, তুমি ভালোই আছ, 
এবার আসি টাকায়, কীভাবে আমরা টাকা ব্যবহার করি, হ্যাঁ, আমরা এটা ব্যবহার করি ঠিকই, কিন্তু আসলে আমরা বুঝি না টাকা কী জিনিস, আমরা ভাবি এটা কোনো বাস্তব বস্তু, কারণ টাকা হাতে ধরা যায়, মনে করি হাজার রিভনিয়ার নোটটাই হলো টাকা, অথচ বহু আগে থেকেই এটা শুধুই কাগজ, এর মূল্য কি সোনার ওপর নির্ভরশীল নয়? তাহলে কিসের ওপর? আর এখানেই আসি মূল বিষয়ে, সুতরাং একটু মনোযোগ দাও, টাকা বহু আগেই ভার্চুয়াল হয়ে গেছে, আজকের দিনে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি, অনুমান করা কঠিন নয় যে ক্রিপ্টোকারেন্সি আমাদের সমাজে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলবে, আজ আমরা এটা জানি, তাই এটা কোনো অস্বাভাবিক দাবি নয়, আসল প্রশ্ন হলো এটা কীভাবে আরও ভালোভাবে করা যায়, এর পদ্ধতি আছে, নিয়ম আছে– শুধু উৎসাহ থাকলেই হয় না, অনেক জ্ঞান লাগে, আর সেই জ্ঞানের জন্য দরকার বিস্তৃত দৃষ্টি, কারণ জানতে হবে ক্রিপ্টো কী, আর কী নয়, কী কাজে লাগে, আর কী কাজে লাগে না; মাস্কের মতো কিছু মানুষ আছেন– যাদের কাছে, বিশেষ করে ইউক্রেনের প্রসঙ্গে, আমরা নানা কারণে কৃতজ্ঞ, তিনি যা সমর্থন করেন, তার অনেকটাই যেন স্বপ্নের মতো শোনায়, ক্রিপ্টো জগৎকে বুঝতে যেমন দরকার স্বচ্ছ দৃষ্টি, তেমনি দরকার একটু স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাও, এখন তুমি হয়তো প্রশ্ন করতে পারো– এই ক্রিপ্টোকারেন্সি আসলে কী? পুরোটা কি একটা জালিয়াতি? ছুঁয়ে দেখা যায় না, দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব নেই– তাহলে আমরা কীভাবে বলি যে এটা আছে? এর উত্তরে বলা যায়– ক্রিপ্টো জগতের পেছনে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি আছে– সেটা হলো ব্লকচেইন, সাম্প্রতিক ইতিহাসের সেরা আবিষ্কারগুলোর একটি, ঠিক আছে, আমরা এটা বুঝি না, কিন্তু বোঝার দরকারও নেই, কারণ ব্যবহার করতে বোঝা লাগে না, ঠিক যেমন টিভি দেখার সময় জানা লাগে না যে পর্দায় এক ভগ্নাংশ সেকেন্ডে একটা আলোর বিন্দু দৌড়ে বেড়াচ্ছে, তাই ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে এর অন্তর্নিহিত প্রযুক্তি বোঝা জরুরি নয়, শুধু ব্যবহার করলেই চলে, ক্রিপ্টো, আমার মতে, নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে, উদ্ভাবনের ব্যাপার, ক্রিপ্টো আর ব্লকচেইন মিলে এমন একটি কার্যকর মডেল, যা কিছু বিশেষ গুণাবলি সম্ভব করে, যেমন সত্যতা, শনাক্তযোগ্যতা, আর বিপুল নমনীয়তা, বা যদি বলো, বৈশ্বিকতা, আমাদের বর্তমান টাকার দৈহিক সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু হলে, কিংবা আরও প্রসারিত হলে, ক্রিপ্টোকে আরও নির্ভরযোগ্য করবে, বৈশ্বিক সমাজে আরও গভীরভাবে গেঁথে যাবে, আর তখন স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এই সত্তার প্রবর্তক ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সামাজিক মূল্যে রূপান্তরিত করেছে, 
এখানে আবার থামতে হলো, কারণ আরও নতুন শব্দ, আরও জোরে বিস্ফোরণ ট্রেঞ্চের বাইরে, এবার তিনটি গ্র্যাড থেকে একসঙ্গে ছোড়া হচ্ছে, মানে ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র, তারপর হঠাৎ নিস্তব্ধতা, একটা বিরতি, যেখানে দূরের মাঠে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে, সে একটু অপেক্ষা করল কী হয় দেখতে, কিছুই হলো না, শুধু পাখির আওয়াজ, তাই আবার শুরু করল– পছন্দ করো আর না করো, আমরা মঙ্গলে যাব, পছন্দ করো আর না করো, মঙ্গলকে উপনিবেশ করব, কারণ করতেই হবে, পৃথিবীকে বাঁচাতে নয়, পৃথিবী ঠিকই থাকবে, মানুষকে বাঁচাতে হবে নিজেদেরই, কারণ এখানে আমরা একটা ফাঁদে আটকে আছি, এর থেকে বেরোতেই হবে, তাই তো আমরা মঙ্গলের দিকে যাচ্ছি,
[ক্রমশ]

আরও পড়ুন

×