ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

শিক্ষানীতি ও দলীয় রাজনীতি মিশে যাচ্ছে

শিক্ষানীতি ও দলীয় রাজনীতি মিশে যাচ্ছে
×

খালেদ হোসাইনি [জন্ম: ৪ মার্চ ১৯৬৫]

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আফগান-মার্কিন লেখক খালেদ হোসাইনি এ দেশের পাঠকদের কাছে কাইট রানার ও থাউজেন্ডস স্লেন্ডেড সান বইটির মাধ্যমে সুপরিচিত। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের সেইন্ট ফ্রান্সিস শহরের স্কুলগুলোয় খালেদ হোসাইনির বই কাইট রানার নিষিদ্ধ করা হয়। এ বিষয়ে সাংবাদিক ম্যাডিসন ম্যাকভ্যানের মুখোমুখি হন লেখক খালেদ হোসাইনি। সাক্ষাৎকারটি গণমাধ্যম মিনেসোটা রিফর্মারে ২১ মার্চ ২০২৫-এ প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর হুমায়ূন শফিক।

ম্যাডিসন ম্যাকভ্যান: বইটির প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, আমার ইংরেজি শিক্ষকের ক্লাসরুমের বুকশেলফ থেকে ‘দ্য কাইট রানার’ বইটি প্রথমবার হাতে পাই। পড়ার পর বইটির প্রেমে পড়ে যাই আমি। এরপর আপনার অন্য সব বইও পড়েছি। সেগুলো আমার মনে গভীর দাগ কেটে গেছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
খালেদ হোসাইনি: শুনে নিজেকে বেশ বুড়ো মনে হচ্ছে। তবে আপনার প্রশংসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
lসেইন্ট ফ্রান্সিসে ‘দ্য কাইট রানার’ নিষিদ্ধ করার পেছনে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, এখানে যৌন সহিংসতার চিত্রায়ণ রয়েছে। বিশেষ করে গলির ভেতর হাসানের ওপর অন্য ছেলেদের সেই পাশবিক নির্যাতনের দৃশ্য। আপনি যখন উপন্যাসটি লিখছিলেন, তখন এই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনার বর্ণনায় কেবল শারীরিক লাঞ্ছনা নয়, বরং যৌন সহিংসতাকেই কেন বেছে নেওয়া জরুরি মনে করেছিলেন?
llআমি জানতাম যে গলির সেই দৃশ্যটি এই উপন্যাসের মূল ভিত্তি। এটি মূলত একটি যৌন সহিংসতার রূপ। কারণ, এটি শেষ পর্যন্ত অন্য একজন মানুষের ওপর নিজের কর্তৃত্ব ও ইচ্ছা জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার একটি ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। ওই গলিতে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের ভেতরকার সামাজিক উঁচু-নিচুর ভেদাভেদটা খুব স্পষ্ট ছিল। শিকার হওয়া ছেলেটি ছিল এক নিপীড়িত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্য, আর অপরাধী ছিল আফগানিস্তানের সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠীর এবং অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের সন্তান। ফলে সেখানে মর্যাদার এক বিরাট ব্যবধান ছিল। আমি যখন আফগানিস্তানে গিয়েছিলাম, তখন অনেকেই আমাকে বলেছিলেন যে আটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা আসলে পশ্চিমা বিশ্বের হুকুমই তামিল করেছিলেন; যাকে রোনাল্ড রিগান ‘শয়তানের সাম্রাজ্য’ বলেছিলেন। একবার যখন পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ হাসিল হলো; অর্থাৎ হাসান যখন আমিরের জন্য সেই ঘুড়িটি জিতে আনল, তখন পুরো দেশটিকে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার মুখে ফেলে দেওয়া হলো। অনেক আফগান দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি বোঝাতে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁদের মনে হয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব যেন গলির ওপাশ থেকে উঁকি দিয়ে সব দেখছিল। তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। আমি খোদ আফগানদের মুখ থেকেই শুনেছি যে পশ্চিমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমীকরণটা কেমন ছিল এবং কতটা পরিত্যক্ত তারা বোধ করেছিলেন। তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল। সময় ফুরিয়ে গেলে তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে একা ফেলে যাওয়া হয়েছিল। তাই ওই দৃশ্যটি কেবল সাধারণ মারধরের ঘটনা হতে পারত না। সেই মুহূর্তটিকে হতে হতো এতটাই বীভৎস এবং নারকীয়, যা এই চরিত্রগুলোকে আমূল বদলে দেবে এবং বড় হওয়ার পরও তাদের তাড়া করে বেড়াবে।
lযখন বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন কি আপনি ভেবেছিলেন যে ২০-২৫ বছর পার হওয়ার পরও এটি এভাবে আলোচনার ঝড় তুলবে?
llআমি ভেবেছিলাম বিতর্কটা মূলত আমার নিজের দেশের আফগান পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কারণ এই বইয়ে এমন কিছু প্রসঙ্গ আছে, যা আমাদের সমাজে কথা বলার অযোগ্য (ট্যাবু) বলে বিবেচিত। যেমন, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ জাতিগত সংঘাতের বিষয়টি সেখানে এক ‘প্রকাশ্য গোপন সত্য’, যা নিয়ে কেউ সচরাচর মুখ খোলে না।
তাই আমি ভেবেছিলাম জাতিগত এই উত্তেজনার নগ্ন চিত্রায়ণ আফগান পাঠকদের মনে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। বাস্তবে তা-ই হয়েছিল। তবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে ফ্লোরিডা বা মিনেসোটার হাইস্কুলগুলো থেকে আমার বই নিষিদ্ধ করা হবে। 
lবইটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনার এমন কোনো বিশেষ স্মৃতি আছে? যা আপনাকে এখনও নাড়া দেয়? 
llএমন অনেক ঘটনা আছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সরাসরি আমার কাছে এসে বলেছে যে তারা শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এই বইটি পড়া তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হলেও, তাদের মনের ক্ষত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। কেউ কেউ বলেছে যে তাদের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক খুব তিক্ত ছিল, আমিরের লড়াই দেখে তারা নিজেদের সম্পর্কের টানাপোড়েন বুঝতে পেরেছে।

অনেকে বলেছে যে তারা মুসলিমদের সম্পর্কে বা আফগানিস্তান সম্পর্কে কিছুই জানত না; এই বইটি তাদের পৃথিবীর একটি অংশকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে। একেকজন পাঠক বইটিকে একেকভাবে গ্রহণ করেন। তবে যারা উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছে, তারা যখন হাসান ও আমিরের মাঝে নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়, তখন সেই অনুভূতিগুলো আমার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে।
l‘বুক-লুকস’ নামক যে ওয়েবসাইটটির ওপর ভিত্তি করে সেইন্ট ফ্রান্সিস বই নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তারা মূলত যৌন সহিংসতার কারণেই একে ‘বিপজ্জনক’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে। আপনার কি মনে হয়, আসলেই কি কারণটা কেবল যৌন সহিংসতা? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো বিষয় কাজ করছে?
llতারা বলে যে এটি শিশুদের রক্ষার জন্য করা হচ্ছে। আমার কাছে এটি একটা অসৎ যুক্তি মনে হয়। কারণ এই যে বই নিষিদ্ধ করার হিড়িক–চলুন সত্যিটা স্বীকার করি, সেইন্ট ফ্রান্সিসের ঘটনাটি আসলে এক ধরনের সেন্সরশিপই। এর সঙ্গে শিশুর নিরাপত্তার খুব একটা সম্পর্ক নেই। এর আসল উদ্দেশ্য হলো ভিন্নমত বা ভিন্ন সংস্কৃতির বইগুলোকে সরিয়ে দেওয়া, যা হয়তো ওই সব পর্যালোচনাকারীর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না। বর্তমানে শিক্ষানীতি ও দলীয় রাজনীতিকে পরিকল্পিতভাবে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘বুক-লুকস’-এর মতো ওয়েবসাইটগুলো গ্রন্থাগারিক বা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামতের তোয়াক্কা করে না। তথাকথিত ‘উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের’ ব্যক্তিগত ও সংকীর্ণ আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে বই বাছাই করা হয়। শিশুদের রক্ষার দোহাই দিয়ে আসলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
lশেষ প্রশ্ন। সম্প্রতি ভালো কী বই পড়েছেন?
llআমি এখন অ্যান্ড্রু সলোমনের ‘ফার ফ্রম দ্য ট্রি’ পড়ছি, যা আমাকে একজন উপহার দিয়েছেন।
এ ছাড়া আগে কখনও ট্রুম্যান ক্যাপোটির ‘ইন কোল্ড ব্লাড’ পড়া হয়নি। সম্প্রতি সেটি পড়ে আমি রীতিমতো মুগ্ধ। কী অসাধারণ লেখা! আর জোন ডিডিওনের ‘স্লাউচিং টুওয়ার্ডস বেথলেহেম’ পড়লাম, ক্যালিফোর্নিয়ার জীবন নিয়ে দারুণ কিছু প্রবন্ধের সংকলন এটি। 

আরও পড়ুন

×