কঙ্কাল, বদ্ধ সমাজের প্রতিচ্ছবি
নাসিমা আনিস
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কঙ্কাল গল্পে নার্সিসিস্ট হৃদয়, দৈহিক রূপসৌন্দর্যের হদিস পেয়েও কঠিন সামাজিক নিষ্পেষণে কনকচাঁপার করুণ পরিণতিতে পাঠকহৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। গল্পে রবীন্দ্রনাথের ভাষা, শব্দ, বাক্য, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, অনুভূতি ও রোমান্টিকতার এক চরম নিদর্শন মেলে যাতে লেখকের আত্মায় এক শাশ্বত নারীহৃদয়কে আবিষ্কার করা যায়, নারীহৃদয়ের অধিষ্ঠান ছাড়া এই গল্প লিখিত হওয়া অসম্ভব। যত বেদনাবহই হোক না কেন, কঙ্কালের দেহধারী কনকচাঁপার মৃত্যু শেষ পর্যন্ত তাকে সৌন্দর্যের রানী হিসেবে যেমন অধিষ্ঠিত করে, তেমনি একই সঙ্গে সনাতন ধর্মের কৌলিন্যপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মূর্তিমান প্রতীকও করে তোলে।
অতি অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেলে কনকচাঁপা যাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিল, তাকে সে যমের মতো ভয় পেত, ‘যখন মানুষ ছিলাম এবং ছোটো ছিলাম তখন এক ব্যক্তিকে যমের মতো ভয় করিতাম। তিনি আমার স্বামী।’ তারপরই উপমাটি যদি খেয়াল করি, ‘মাছকে বড়শি দিয়া ধরিলে তাহার যেমন মনে হয় আমারও সেইরূপ মনে হইত। অর্থাৎ, কোনো এক সম্পূর্ণ অপরিচিত জীব যেন বড়শিতে গাঁথিয়া আমাকে আমার স্নিগ্ধগভীর জন্মজলাশয় হইতে টান মারিয়া ছিনিয়া লইয়া যাইতেছে– কিছুতেই তাহার হাত হইতে পরিত্রাণ নাই।’
এই বাক্য দুখানা দিয়ে আসলে কনকচাঁপা আমাদের কী বোঝাতে চাইছে। বুদ্ধিমান পাঠকের না বোঝার কোনো কারণ আছে?
১৮৯০ সালে ১০/১১ বছর বয়সী ফুলমণি দাসীর কথা আমরা মনে করতে পারি, স্বামী কর্তৃক যৌন নির্যাতিত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে যার মৃত্যু ঘটে। এই রকম তখন এবং তারও পরে অহরহই হয়েছে। এই ঘটনা কোনো কারণে লোকসম্মুখে প্রকাশ পেলে এবং কিঞ্চিৎ আলোড়ন তৈরি হলে পরের বছর ১৮৯১ সালে এই বিষয়ে একটি আইন পাস হয়। এই আইনে মেয়েদের (বিবাহিত বা অবিবাহিত) সম্মতিতে যৌন সম্পর্কের আইনি বয়স ১০ থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়। যদিও তখন রক্ষণশীল সমাজ এই আইনের বিরোধিতা করে, শিক্ষিত প্রভাবশালী লোকেরাও এই বিরোধীদের দলে ছিল। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই গল্পের রচনাকাল ফাল্গুন ১২৯৮; যা ইংরেজি ১৮৯২ সালের প্রথমদিক। এই গল্প লেখার সময় লেখকের মনে থাকা স্বাভাবিক, অল্পদিন আগে ফুলমণির মৃত্যু এবং সদ্য পাস হওয়া আইন এবং রক্ষণশীল সমাজের বিরোধিতার কথা। বল্লালী বালাই, গৌরী দান কৌলিন্যপ্রথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, কী বিষবৃক্ষ বপন করছে, নারী জীবনের সেই বিভীষিকা সমাজে কী রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তা চাক্ষুষ না করলে এই গল্প তৈরি হয়।
সে যাক, গল্পের কঙ্কালের দেহধারী কনকচাঁপা এক গভীর রাতে ফিরে আসে, যারা তার কঙ্কাল নিয়ে অস্থিবিদ্যা অর্জনে ব্রতী হয়েছিল একদা, তাদেরই একজনকে গভীর রাতে নিজের জীবনগল্প বলতে।
তার জগতে একমাত্র পুরুষ বলতে ছিল এক দাদা যিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিবাহ করবেন না। তারপর এলেন শশিশেখর, দাদার বন্ধু, যিনি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে এসে তাদের পারিবারিক ডাক্তারের দায়িত্ব পালন করেন। বাইরের যুবক বলতে কনকচাঁপা কেবল শশিশেখরকেই জেনেছিল এবং ভালোবেসেছিল। কনকচাঁপার জ্বর হলে শশিশেখর তার নাড়ি টিপে দেখতে চাইলে কনকচাঁপাও তার নাড়ির খবর পেয়ে বুঝতে পারে তারা পরস্পরকে পছন্দ করে। ক্রমে ডাক্তার তাদেরই বাড়ির নিচতলায় ডাক্তারখানা খুলে বসলে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হওয়া অবারিত হয়। শশিশেখর তার গল্প করার সঙ্গী হলে ডাক্তারখানার অনেক ঔষধপত্র বিষয়েও তার ধারণা হয়, বাঁচার ওষুধ, মরার ওষুধ। এইভাবে চলতে পারল না বেশি দিন। একদিন সে দেখতে পেল শশিশেখর দাদার জুড়ি গাড়ি ধার নিয়ে সাজ করে কোথায় যায়। দাদা বলেন শশিশেখরের বিয়ে। সেই বিয়েতে সে বারো হাজার টাকা পণ পাবে।
ডাক্তারখানা থেকে কনকচাঁপা কিছুটা গুঁড়াবিষ জোগাড় করে রাখে। চারিদিকে তখন বিয়ের আয়োজন; সত্যি বলতে আয়োজক স্বয়ং কনকচাঁপা, বাদ্য-বাজনায় দুই বন্ধু একটু পান করতে বসলে শশিশেখরের পানপাত্রে একটু গুঁড়া মিশিয়ে দেয়, একটু রাখে নিজের জন্য। রাতে সে বেনারসি পরে, সমস্ত গহনায় নিজেকে সাজিয়ে তোলে, কপালে বড়ো করে সিঁদুর দিয়ে বকুলতলায় বিছানায় বাসর সাজায়। চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্না। তার মনে হয়, এই বাসরে লোকে যখন তাকে সকালবেলা পাবে তখন তার ঠোঁটের কোণে যেন হাসিটুকু লেগে থাকে। কিন্তু অনন্ত বাসরঘরে সে এই অন্তিম হাসিটুকু নিয়েই উপস্থিত থাকার বদলে দেখতে পায় তিনজন শিক্ষার্থীর সামনে মাস্টার মশাই তার বেত নির্দেশ করে তারই অস্থির নাম বলে যাচ্ছেন! কিন্তু পাঠক বুঝে নিতে পারে তার প্রার্থিত সেই হাসিটুকু সমাজের মানুষের প্রতি কনকচাঁপার প্রবল অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই না, যে সমাজ তাকে একবারও একটা সহজ জীবন দিতে ব্যর্থ। এই গল্পকে অতিপ্রাকৃত, আধিভৌতিক, মনস্তাত্ত্বিক গল্প বলা হলেও একই সঙ্গে আত্মপ্রেমের গল্প বলাও অসংগত হবে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ কি বিংশ শতাব্দীর পুরোটা কি আজও আমাদের বদ্ধ সমাজে পুরুষের লালসার যত কলা আছে তার সর্বোচ্চ, যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে নারীকে ঘিরে। এক অবিকশিত মানুষ নারী, কিছুই পারে না সে! কবে কোন কুৎসিত নিয়ম হলো, তা যদি পুরুষের লালসা চরিতার্থ করার পক্ষে থাকে তো চলুক অনাদি কাল, তাতে নারী রসাতলে যাক, মৃত্যু হোক কোনো সমস্যা নাই! তা না হলে বল্লাল সেনের প্রায় হাজার বছর আগের নিয়ম কেন বিংশ শতাব্দীতেও পালন করে যাবে সংসার!
নারী জাতির পরম সৌভাগ্য যে সে তমসায় কিছু মহান ঋষিতুল্য মানুষ সেই বদ্ধ সমাজে এসেছিলেন, তারা চেষ্টা করেছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছিলেন নারীকে উদ্ধার করতে। একটি পূর্ণাঙ্গ নারীহৃদয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মেছিলেন তার প্রমাণ আমরা তাঁর সাহিত্যে হামেশাই পাই। কঙ্কাল তার তেমনি একটি অনবদ্য সৃষ্টি। সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে তিনি কনকচাঁপাকে ধারণ করেছিলেন।
- বিষয় :
- গল্প
