অপারেশন খরচাখাতা ব্যক্তিগত ডকুফিকশন
শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক
মোজাফ্ফর হোসেন
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহল্লার সকলে এখন বন্দি। গৃহবন্দি। চারিদিকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। দেশের কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে প্রতিরোধ-যুদ্ধ। কিন্তু এই মানুষগুলোর প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা বা সরঞ্জাম বলতে কিছু নেই। শুধু মাড়োয়ারিপট্টি না, বাঙালি পাড়াগুলোর অবস্থাও করুণ, প্রতিদিন কাউকে না কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, লাশ পাওয়া যাচ্ছে অলিতে গলিতে। কদিন আগেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আর্মির হাতে ধরা পড়েন সাতনালার চেয়ারম্যান মাহতাব বেগ। বিহারিরা তার মাথা কেটে শহরময় আনন্দ উল্লাস করেছে। এ অবস্থায় মাড়োয়ারি ও হিন্দু পরিবারগুলোর মানসিক অবস্থা কল্পনা করা কঠিন। আতঙ্ক আর দুঃস্বপ্নে দিন কাটছে তাদের। কার বাড়িতে লুটপাট হবে, কখন কাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে বলা মুশকিল। দুদিন আগেও ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে তুলে নিয়ে গলা কেটে ফেলে দিয়েছে মহল্লার রাস্তায়। গত সপ্তাহে তুলসীরাম আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া ও রামেশ্বর লাল আগরওয়ালার মতো সম্মানীয় মানুষদের ক্যান্টনমেন্টে কোয়ার্টার গার্ডে আটকে রাখার পর মধ্যরাতে নিসবেতগঞ্জ নিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটে গেল সবচেয়ে বড় ঘটনাটা। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে কাজ করার জন্য ১৮৫ জন মাড়োয়ারিকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল পাকিস্তানি আর্মি। এয়ারপোর্টের মাটি কাটা প্রধান কাজ হলেও একমাত্র কাজ না। আরও একটা কাজ করিয়ে নিচ্ছে এই সুযোগে। একেক সময় একেক জনের ডাক পড়ে মেজরের টেবিলে। বন্দুকের মুখে জিজ্ঞাসা করা হয় কোন ব্যাংকে কত ডিপোজিট এবং কার বাড়িতে কত ভরি সোনা আছে। শোনার পর তাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে ব্যাংকে, লুটপাট করা হচ্ছে বাড়ি।
যারা বাড়িতে আছে তাদের অবস্থা আরও সঙ্গিন। শিশু ও নারীদের সঙ্গে কী ঘটতে পারে, সেটা ভেবেই আঁতকে ওঠে মন। এরই মধ্যে পবন কুমার দাসের বউকে তুলে নিয়ে গেছে বিহারিরা। সাত দিন হলো কোনো খবর আসেনি। কারও মধ্যে এতটুকু সাহস নেই প্রতিবেশী বিহারি বাড়িগুলোতে গিয়ে জানতে চায় তার সর্বশেষ অবস্থা। যে খোঁজ নিতে যাবে, তাকেও যদি তুলে নিয়ে যায়!
পুরো কলোনিতে মৃত্যুর ছায়া, যমদূত যেন বাতাস থেকে সমস্ত অক্সিজেন একটু একটু করে শুষে নিচ্ছে। আর মানুষগুলো অতি কষ্টে অক্সিজেন টেনে টেনে বেঁচে আছে। কোথাও এতটুকু আনন্দ অবশিষ্ট নেই।
কিছুই বুঝে উঠতে পারে না বাড়ির শিশুরা। বড়রা আতঙ্কে কেউ কারও মুখের দিকে তাকাতে পারে না। চারিদিকে পাকিস্তানি সৈন্য, বিহারি এবং বাঙালি দোসর। বিহারি বাড়িগুলোর ওপরে পতপত করে উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। মিথ্যা আশ্বাসটুকু দেওয়ার মতো কোথাও কেউ নেই। নিজেই বাঁচে না, কে কাকে সাহায্য করবে! তা ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করাও মুশকিল।
বাড়ির মেয়েরা সব ঘরের কোণে জড়সড়ো হয়ে দিন কাটাচ্ছে, শিশুরাও গৃহবন্দি, বাবা-মায়েরা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে হার্টবিট সচল রাখার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কীভাবে শেষ চেষ্টা করবে সেই চিন্তায় হাবুডুবু খেতে থাকে যুবকরা। কোনো কূলকিনারা পায় না। কাছে দূরে সবখানে অন্ধকার। আজ হোক, কাল হোক, মরতে যেন হবেই। যেন মরে গেলেই মৃত্যুর আতঙ্ক থেকে মুক্তি!
সেদিন একসঙ্গে পাক মিলিটারি, বিহারি, বাঙালি দোসরদের আসতে দেখে মাড়োয়ারি পাড়ার লোকজন ভয়ে আঁতকে ওঠে। নিশ্চয় কাউকে তুলে নিতে আসছে! কিংবা এমন বীভৎস কিছু করবে যা তারা আগে কখনও প্রত্যক্ষ করেনি!
কিন্তু না, সেদিন আর কাউকে তুলে নিতে আসেনি। বাড়িঘর লুটপাট বা এমন কিছু করতে আসেনি। হুমকি-ধমকিও দেয়নি। তাদের কথা শুনে মাড়োয়ারি পাড়ার লোকজনের মনে হয় স্বয়ং ভগবান এই মানুষগুলোকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাদের কথা অবশ্য কারোরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। নিজেদের মধ্যে পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল।
তবে কথাগুলো শুনে ওদের শুকনো প্রাণে স্বপ্ন জেগে ওঠে। সত্যি যদি এটা ঘটে তাহলে এ যাত্রা তারা সবাই বেঁচে যাবে। আর একজনেরও ক্ষতি হবে। বিমানবন্দরের কাজে তুলে নিয়ে যাওয়া লোকজনকেও ছেড়ে দেওয়া হবে।
পাকিস্তানি মিলিটারি ও বিহারিদের সাথে আসা বাঙালিদের মধ্যে মকছেদ আলী ভালো করে বুঝিয়ে দেয় সবকিছু।
ওরা চলে গেলে ঘরে ফিরে ব্রজেন দাশ তার মা আর বোনকে বলে, ব্যাগ গোছাতে শুরু করো। আগামী রোববার আমাদের মুক্তি। আমরা সবাই ভারতে চলে যাব।
সুখন সরকার তার বউ-মেয়েকে বলে, আর আমাদের ভয় নেই, সব গুছিয়ে নাও। বহন করার মতো কিছু জামাকাপড় আর দু-তিন বেলার মতো খাবার। আর কিছু লাগবে না।
ঘুড়ি হাতে গৃহবন্দি শিশুকে বুকে তুলে নিয়ে বাবা বলে, কদিন পরই আমরা ঘুড়ি উড়াব। শিশুটি আনন্দে লাফিয়ে ওঠে শুনে। মায়ের ব্যাগের সঙ্গে জেদ ধরে ঘুড়িটিও সে সঙ্গে নেয়।
যুবক হরেশ এতদিন পর ভালো করে তার বোনের দিকে তাকায়। কদিন আগে বাবাকে তুলে নিয়ে গেছে। মা মরা দু ভাইবোন এখনও বাবার অপেক্ষা করছে। তবে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে উড়ো খবর পেয়েছে। কদিন পরই নিরাপদে ভারতে চলে যেতে পারবে। কিন্তু যাওয়ার পর যদি বাবা ফিরে আসে! তাই খুশির সংবাদেও তারা খুশি হতে পারে না। হরেশ ভাবে, বোনকে পাঠিয়ে সে থেকে যাবে।
মিলিটারি, বিহারি ও বাঙালি দোসররা এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে, পাকিস্তানি সৈন্যরা হিন্দু ও মাড়োয়ারিদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেবে। এজন্য তারা জলপাইগুড়ি অব্দি স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। ট্রেনটি ১৩ জুন সকাল ৭টায় সৈয়দপুর থেকে চিলাহাটি হলদিবাড়ি সীমান্তের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। অবিশ্বাস্য শোনালেও এই মুহূর্তে খবরটি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে। বিকেল থেকে বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যরা মাইকিং করে জানাচ্ছে। জুনের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ ধরে মাইকিং চলল।
স্বয়ং মানুষরূপে অবতার নেমে এসেছে পৃথিবীতে, হিন্দুপাড়ার মানুষগুলো ভাবে। আনন্দ হয়, আবার ভয়ও করে। বাতাসে যে মিশে আছে ভয়ের অক্সিজেন! কিন্তু অবতাররূপী মানুষগুলো বারবার আশ্বস্ত করছে। মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ। বিপদে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ওরা অভয় দিয়েছে, কারও কোনো ক্ষতি হবে না। সবাইকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে সীমান্তে। কেউ চাইলে সঙ্গে দুয়েকটা হাঁস-মুরগিও নিতে পারবে। এরই মধ্যে এয়ারপোর্টের কাজে তুলে নিয়ে যাওয়া সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
২.
আর মাত্র একটা দিন। দিন বলতে মাঝে শুধু একটা রাত। পরদিন ভোরেই ট্রেন। ট্রেন তো না যেন ভগবানের বাহন। ভগবান নিজে পাঠাচ্ছেন বিপন্ন বিপর্যস্ত মানুষগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে।
সবাই যখন প্রস্তুত, কোনোভাবে রাতটা কাটানোর অপেক্ষা, এরই মধ্যে মকছেদ আলীর বউ পারুল জেনে গেল কিছু একটা। সরল বিশ্বাসে সে তার স্বামীকে জানিয়ে দিল তার আশঙ্কার কথা। আর সেটাই কাল হলো। পারুলকে ঘরের মধ্যে আটকে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে বের হয়ে যায় মকছেদ। পকেটে চাবিটা নিয়ে নিতে ভোলে না। সামান্য একটা ভুল এতদিনের পরিকল্পনা খাটাখাটনি সব নস্যাৎ করে দিতে পারে।
মকছেদ কার হয়ে কাজ করছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না পারুলের। সে শুধু জানে, মাড়োয়ারি জয়প্রকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মকছেদ। পার্টনারশিপে ব্যবসাও করেছে কিছুদিন। আজ যা সহায় সম্পদ হয়েছে মকছেদ ও পারুলের, সবকিছু জয়প্রকাশের অনুগ্রহে হয়েছে।
বন্ধু জয়প্রকাশের পরিবার বিপদে পড়তে পারে, এমন কিছুই করবে না মকছেদ, এই সরল বিশ্বাসটুকু পারুলের তখনও ছিল। এই বিশ্বাস থেকেই জয়প্রকাশ মকছেদের অনুরোধে রাজি হয়েছে যেতে। জয়প্রকাশের ভরসাতেই মাড়োয়ারি কলোনির সকলে সম্মত হয়েছে। না হলে এখানে মরে যেত তবু পাকিস্তানি আর বিহারি দোসরদের বিশ্বাস করত না ওরা।
স্বামীকে অবিশ্বাস না করলেও পারুল পুরো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। সে বুঝে উঠতে পারে না ওদের পুরো মতলবটা কী, এতগুলো মানুষকে নিয়ে কী করবে পাকিস্তানি সৈন্যরা। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারে, ওই ট্রেনে ওঠা ওদের জন্য ঠিক হবে না। একটা কিছু হচ্ছে এই মানুষগুলো ঘিরে, আর সেটা ভালো কিছু না।
সন্ধ্যারাতে মকছেদের থালে ভাত তুলে দিতে দিতে পারুল বলেছিল, জয়প্রকাশকের বউকে সে সাবধান করে দেবে। মকছেদও যেন যেতে বারণ করে দেয় জয়প্রকাশকে। মকছেদ তখনও কোনো কথা বলেনি। খাওয়াটা শেষ করে আচমকা পারুলের হাত ধরে ঘরের ভেতর ধাক্কা দিয়ে বাইরে থেকে ছিটকিনি তুলে দেয়। তালাটার পাশেই পেরেকে ঝুলছিল।
৩.
সকাল ১০টায় ট্রেন। রাতেও মাড়োয়ারি কলোনিতে কোলাহল আর হইচই। এই ট্রেন কোনোভাবেই ফেল করা যাবে না। এই ট্রেনই ওদের নিশ্চিত করবে বেঁচে থাকার লাইসেন্স। সংখ্যায় ওরা ৪৫০ জনের সামান্য বেশি। বেঁচে থাকার পাল্লা যেন পরস্পরের মধ্যে, কে আগে স্টেশনে পৌঁছায়, কে আগে ট্রেনে ওঠে! এক পরিবার আরেক পরিবারকে সহযোগিতা করে বটে কিন্তু কোনোভাবেই কেউ কারও পেছনে পড়তে চায় না। যদি সকলের জায়গা না হয়!
মানুষগুলো আগের রাত থেকেই স্টেশনের দিকে ছুটতে থাকে। শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে দুয়েকটি মুরগিও হয়তো কেউ কেউ হাতে নেয়। মনে করে কবুতরের খাঁচাটা ছেড়ে দিয়েছে সত্য রঞ্জন কর্মকার, কাল থেকে ওরাও মুক্ত। খুলে দিয়েছে ছাগলের গলার দড়ি, যাতে খাবারের কষ্ট না পায়। কেউ কেউ ছুটে যাচ্ছে আবার, মুরগির খাঁচাটাও খুলে এসেছে কিনা নিশ্চিত হতে! ভিটে ছেড়ে যাবে না বলে যে শীতারাম পণ্ডিত বেঁকে বসেছিলেন, তাকেও জোর করে তুলে নিয়েছে ছেলেরা। বেঁচে থাকলে ভিটে হবে। বেঁচে থাকার এত বড় সুযোগ আর আসবে না। পিতাকে বুঝিয়েছে। যারা খুনি তারাই আজ নিজ থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই মহৎ কাজটির জন্য ওদের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেছে সকলে। সময় যেন এগোতে চায় না।
অনেক রাত জোড়া দিয়ে দিয়ে ইলাস্টিকের মতো লম্বা করে টেনে ধরা সেদিনের সেই রাত কোনো এক সময় শেষ হলো।
প্রায় ৪৭০ জন মানুষ পৌঁছে গেল স্টেশনে।
সকাল ৮টা নাগাদ ৪টা কম্পার্টমেন্ট নিয়ে ট্রেন ভেড়ে প্ল্যাটফর্মে। চোখের সামনে ট্রেন, তারপরও সকলের চোখেমুখে মুদ্রিত থাকে সংশয় আর অবিশ্বাস। প্রত্যেকে যেন প্রত্যেকের হৃৎকম্পন ঘড়ির কাঁটার মতো শুনতে পায়। এরই মধ্যে মেজরের হুকুম এলো, সবাই এক কম্পার্টমেন্টে উঠবে না। প্রথম দুই বগিতে পুরুষরা উঠবে, পরের দুই বগিতে নারী ও শিশুরা। সবাই উঠে পড়লে জানালা-দরজা সব বন্ধ করে দাও।
কোনো প্রশ্ন না করে হুটোপুটি করে উঠতে শুরু করল সকলে।
এরই মধ্যে নারীদের কেবিন থেকে ২০ থেকে ২২ জন তরুণীকে তুলে নিয়ে আর্মির গাড়িতে করে ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেয় পাকিস্তানি বিহারি ও বাঙালি দোসররা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। মুখ খুললেই গুলি চলে যাবে পেটের ভেতর। মকছেদের লোকজন বলে যাচ্ছে একটানা। হাতে দেশি অস্ত্র।
মায়ের চোখের সামনে, বাবার সামনে, ভাইয়ের সামনে তাদের মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাথরচোখে তাকিয়ে আছে মেয়েরা, পাথরচোখে তাকিয়ে আছে পরিবারের মানুষগুলো। এখনই ট্রেন ছেড়ে দেবে, তারা জানতেও পারবে না তাদের মেয়েরা কোথায় আছে, আর বেঁচে আছে কিনা!
সারারাত আনচান করেছে মকছেদের বউ পারুল। বিপদে পড়লে মানুষের কোনো বুদ্ধিই কাজ করে না। পারুল অস্থির হয়ে এটা-সেটা কত চিন্তা করেছে, কিন্তু কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বাস্তবায়নযোগ্য কোনো চিন্তাই যেন তার মাথায় আসে না। একবার মনে হয়, তার ভেতর দৈবশক্তি আছে, সে ফুঁ দিয়ে সব বাধা অতিক্রম করে পৌঁছে যাবে স্টেশনে। না। আবার মনে হয়, ফুঁ দেওয়ার দরকার নেই, সে মনে মনে কথা বলবে জয়প্রকাশের স্ত্রী গৌরী বউদির সঙ্গে। গৌরী বউদির তার মনের কথা পড়তে পেরে সবাইকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়বে। কিন্তু না, মনের কথা চালাচালির মতো ধাতস্থ সে কিছুতেই হতে পারে না। পীর বংশের মেয়ে সে। জায়নামাজে বসে থাকে। যেন আল্লাহর নাম নিয়ে দুনিয়াদারির সবকিছু ভুলে ধ্যানে বসলেই মনের সব বাসনা পূরণ হয়ে যাবে।
ঘরের ভেতর থেকে তালা ভাঙা সম্ভব না। বাড়িতে আর কেউ নেই যে তাকে সহযোগিতা করবে। আছে এক ছেলে, নয়ন, তাও মাত্র ন বছর বয়স। আর আছে বুড়ি শাশুড়ি। ছেলে তালা দিয়ে গেছে শুনলে আরও পাঁচটা তালা নিজে দিয়ে যাবে!
জায়নামাজ থেকে ওঠে। সকাল হয়েছে। বাইরে রোদ গনগন করছে। ভেতর থেকে নয়নকে ডাকে পারুল। দরজার ওপাশ থেকে নয়ন সব শোনে, কিছু বোঝে, কিছু সে বোঝে না। তাকে এখন দৌড়ে স্টেশনে যেতে হবে। জয়প্রকাশ কাকাকে বলতে হবে কিছুতেই যেন ট্রেনে না ওঠে ওরা– মা বলে দিয়েছে–। জয়প্রকাশ বুদ্ধিমান মানুষ, পারুলের এই বার্তা কোনোভাবে তার কানে পৌঁছালেই হবে। নয়ন এবার বুঝে ফেলে সবটা। পরিস্থিতি যেন মুহূর্তেই ওর বোধ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দেয়। নয়ন দৌড় দেয়। স্টেশন অনেকটা পথ দূরে। পায়ে হাঁটার পথ না। নয়ন বুঝতে পারে এখন আর কারও সহযোগিতাও সে নিতে পারবে না। মা বলেছে, কাউকে কিছু বলা যাবে না। জয়প্রকাশ ছাড়া কোনো কাকপক্ষীও যেন টের না পায়! তাকে পৌঁছাতেই হবে, একা। নয়ন দৌড়াতে থাকে মূল পথটা এড়িয়ে। কিছুটা দৌড়ানোর পর স্যান্ডেলটা খুলে ফেলে। আরও জোরে দৌড়াতে হবে তাকে। জয়প্রকাশ কাকার মেয়ে জানভি আর নয়ন এক ক্লাসেই পড়ে। জানভির কথা ওর মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। জানভিরা চলে যাচ্ছে, মার কথাটা জয়কাকাকে বললে, ওরা আর যাবে না, এইটুকু সে ভালো করে বোঝে।
৪.
ট্রেনে উঠে বসেছে মানুষগুলো, ঘুমন্ত শিশুরা মায়ের কোলে। ট্রেন কেন ছাড়ে না? পরস্পরকে এ ছাড়া কোনো প্রশ্ন করে না? কোথায় গিয়ে উঠবে আপাতত এ প্রশ্নটা ওদের ভাবায় না। মানুষগুলো বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে এখানে ব্যবসা করতে আসে। সৈয়দপুর তখন বাণিজ্যিক শহর। অনেকে এটাকেই দেশ বানিয়ে পরিবারসহ থেকে যায়। আজ তাদের কোনো মতে জান নিয়ে পালাতে হচ্ছে। তবে যুদ্ধ শেষ হলে আবার ফিরবে, এ রকম প্রস্তুতি নিয়েই যাচ্ছে।
ট্রেন ছাড়ে না কেন? সবার মনে আর কোনো চিন্তা কাজ করছে না। নয়ন ট্রেনের লাইন ধরে দৌড়াতে থাকে। দেখতে পায় দূরে দাঁড়িয়ে আছে, দূর থেকে লম্বা ট্রেনটাকে একটা বগির মতো মনে হয়।
নয়নের পা রক্তাক্ত, ওপর থেকে অবশ হয়ে গেছে। তবু দৌড়াতে হবে। আরেকটু দৌড়ালেই পৌঁছে যাবে ট্রেনের কাছে।
গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ট্রেন চলা শুরু করেছে। নয়নও পৌঁছে গেছে। একপাশে বাবা এবং চেনা আরও দুয়েকজনকে দেখে নয়ন অন্যপাশে সরে যায়। পায়ে হাঁটা গতিতে চলতে থাকা ট্রেনের কাকে কী বলবে, কীভাবে বলবে বুঝতে না পেরে ভিড়ের মধ্যে কৌশলে ট্রেনের শেষ বগিতে উঠে পড়ে সে। গতি ততক্ষণে সামান্য বাড়ে। নয়ন ট্রেনে বসে পড়ে হাঁপাতে থাকে। একটু জিরিয়ে নেয় এই ছোট্ট ছেলেটা।
শরীরের রক্ত চলাচলের মতো ট্রেনটি মানুষগুলোর শিরা-উপশিরা ধরে চলতে থাকে। হার্টবিটের মতো শব্দ করে করে ট্রেনটি চলে। ট্রেন আর মানুষগুলোর হৃৎপিণ্ড মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ধীরে চলে ট্রেন। আরও জোরে কেন চলে না? সকলে মনে মনে জোর ধাক্কা লাগায় ট্রেনের চাকায়।
শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত জেগে বসে থেকে ক্লান্ত মায়েরাও। এই একটা দিন শুধু– প্রার্থনা করছে ভগবানের কাছে। একটা দিন যেন এই ট্রেন আর কোথাও না থামে। কিছুতেই না থামে। এরপর পৃথিবীর সমস্ত ট্রেন থেমে যাক। থেমে যাক চিরতরে। কিন্তু এই একটা ট্রেন এই একটা দিন যেন চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু ট্রেন যে থামাতে হবে, এখনই– নয়ন এবার খুঁজতে থাকে জয়প্রকাশ কাকাকে। ওর চোখ জানভিকে খোঁজে। ট্রেনের গতি সামান্য বাড়ে। মানুষগুলো একটু একটু করে নিশ্চিন্ত হতে থাকে। যারা যত্ন করে তাদের ট্রেনে তুলে দিয়েছে, তাদেরকে এরা ভগবানের দূত মনে করতে শুরু করে।
নয়ন এগোতে থাকে আর আল্লাহকে ডাকতে থাকে। মা শিখিয়ে দিয়েছে, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বলিমিন’ পড়তে পড়তে যাবি। পুরোটা পড়তে পড়তে এখন শুধু ‘লা ইলাহা ... লা ইলাহা’ বলে যাচ্ছে বিড়বিড় করে। হয়তো কাজও হলো তাতে। জয়প্রকাশকে খুঁজে পাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রেনটি থেমে গেল। গোলাহাটের কাছাকাছি এসে কালভার্ট-337 মাঝে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। একসঙ্গে সবগুলো মানুষ নড়েচড়ে বসে। মুহূর্তেই তাদের মনের মধ্যে টর্নেডো বইতে শুরু করে। মায়েদের চোখেমুখে অচেনা অজানা আতঙ্ক দেখে শিশুরা ভয়ে গুটিয়ে যায় কোলের মধ্যে।
কাউকে কি তোলা হবে? তাদেরই মতো হিন্দু বা মাড়োয়ারি কোনো পরিবারকে? বাবারা ভাবে।
নষ্ট হয়ে গেল ট্রেন? মায়েরা ভাবে।
তারা কি তবে পৌঁছে গেল? শিশুরা ভাবে।
যাক, ট্রেন থেমে গেছে। নয়ন নিশ্চিন্ত হয়। জয়প্রকাশ কাকাতে এতক্ষণে দেখে। কাছে কোথাও জানভিকে দেখে না। সে জানে না নারী-পুরুষ আলাদা বগিতে রাখা হয়েছে। সে জানে না, ট্রেন ছাড়ার আগমুহূর্তে ফুলের মতো দেখতে জানভিকে তুলে দেওয়া হয়েছে মিলিটারির গাড়িতে। নয়ন জয়প্রকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
কাকা, মা পাঠিয়েছে। নয়ন বলে। জয়প্রকাশ শোনেন কিনা বোঝা যায় না। তিনি ট্রেনের ছিদ্র দিয়ে বাইরের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করেন। বাইরে খোলা মাঠে তখন অপেক্ষা করছে রাজাকার ইজাহার আহমেদ, বিহারি নেতা কাইয়ুম খান ও বিপুলসংখ্যক বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্য।
সহসা বগির দরজা খুলে যায়। জয়প্রকাশ আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে নিজের আসনে বসে থাকেন। নয়নকে বুকে টেনে নিয়ে অব্যক্ত স্বরে বলেন, এলিই যখন এত দেরি করি এলি কেন?
ওরা ভেতরে প্রবেশ করে, একে একে অনেকে। কারও কারও হাতে বড় বড় ছোরা আর ড্যাগার। মকছেদ আলী তখন ট্রেনের বিপরীত দিকে মুখ করে সিগারেট ধরায়।
[নোট: ১৯৭১ সালের ১৩ জুন। পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন খরচাখাতায় ৪৩৭ জন নিরীহ হিন্দু মাড়োয়ারিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়]
- বিষয় :
- অপারেশন