ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তুমি আমার পাশে বন্ধু হে

তুমি আমার পাশে বন্ধু হে
×

আমিরুল ইসলাম [৭ এপ্রিল, ১৯৬৪–১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬]

ধ্রুব এষ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ বই পড়ে।
মানুষ বই পড়ত।
মানুষ একদিন বইতে পড়বে যে মানুষ এক কালে বই পড়ত। সেই এক কাল ছিল বটে। বই পড়ত এবং বই পড়ত মানুষ। দল বেঁধে বই পড়ত পোলাপান। দস্যু বনহুর সিরিজ, দস্যু রানী সিরিজ, সেবা প্রকাশনীর বই, রাশিয়ার প্রগতি প্রকাশনের বই, উদয়ন পত্রিকা, আর দেশের একমাত্র কিশোর সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’—এই ছিল রসদ। আমরা কম্পিটিশন দিয়ে পড়তাম। শুধু ‘কিশোর বাংলা’র কথা লিখি এখানে। কিশোর বাংলায় আমাদের দেশের সেরা কিশোর সাহিত্যিকরা লিখতেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘দীপু নাম্বার টু’ প্রথম ‘কিশোর বাংলা’য় ছাপা হয়েছিল। ইমদাদুল হক মিলনের ‘চিতা রহস্য’, আলী ইমামের ‘অপারেশন কাঁকনপুর’, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিনের ‘পকেটমারের পাল্লায়’—ছাপা হয়েছিল। কিশোর বাংলা ’৮৪ (১৯৮৪) সালে বন্ধ হয়ে যায়। সেই বছরই কি আমীরুল ইসলামের উপন্যাস ‘অচিন জাদুকর’ ছাপা হয়েছিল ‘কিশোর বাংলা’ ঈদ সংখ্যায়? নাকি তার আগের বছর? পড়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। এর আগে এই লেখকের ছড়া গল্প ‘কিশোর বাংলা’ ও অন্যান্য পত্রিকায় পড়েছি। ফারুক নেওয়াজ, লুৎফর রহমান রিটন, সাইফুল আলম, আবু হাসান শাহরিয়ার, আশরাফুল আলম পিনটু, নসরত শাহ, আহমাদ উল্লাহ, আমীরুল ইসলাম তখনকার তরুণ এই লেখকদের লেখা ভালো লাগত আমাদের। ৮৫ সালে আমি পদার্পণ করি ঢাকায়। চারুকলায় ভর্তি হই। ৮৬ সালে প্রথম অমর একুশে বইমেলা দেখি। বাংলা একাডেমি চত্বরে তখন বইমেলা হতো। ভিড়ভাট্টা এত হতো না। মানুষের স্মৃতি যে বয়সে মশকরাপ্রবণ হয়ে ওঠে, সেই বয়স আমার হয়ে গেছে অতএব ভুল হতেই পারে, তবুও যতদূর মনে করতে পারি ৮৬-র সেই বইমেলায় সর্বমোট ১২৮টা বই প্রকাশিত হয়েছিল, ৪২টা বইয়ের প্রচ্ছদ কাজী হাসান হাবিব করেছিলেন—এটা নিয়ে মেলার মাঠে খুব আলোচনা ছিল। রোজ মেলায় যাই, ঘুরি ফিরি, সম্ভবত ‘অনিন্দ্য’ প্রকাশনার একটা এক ইউনিটের স্টল ছিল—সেই স্টলে একদিন পোস্টার দেখলাম, আমীরুল ইসলামের ছোটদের গল্পগ্রন্থ ‘আমি সাতটা’ প্রকাশিত হচ্ছে।
আমীরুল ইসলাম পরিচিত নাম। ‘আমি সাতটা’ চমকপ্রদ নাম।
‘এই বইটা কবে আসবে?’
‘কাল পাবেন।’
সেই কাল আর হয় না।
রোজ যাই।—কাল পাবেন।
দুই দিন চার দিন ছয় দিন আট দিন। মেলা এদিকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। একদিন আর ওই স্টলের দিকে যাই নাই। স্টলের লোক আমাকে দেখে ডাকলেন, ‘ভাই আপনার বই তো আসছে।’
বই দেখলাম। কালো রঙের প্রচ্ছদ। লুৎফর রহমান রিটন (রিটন রহমান নামে?) করেছেন। বই কিনলাম।
‘লেখকের অটোগ্রাফ নিবেন? লেখক আছেন।’
কোথায়? স্টলের সামনে। ষণ্ডা-গুন্ডা টাইপ এক যুবা। কথা বলছেন আরও দুই যুবার সঙ্গে। আমীরুল ইসলাম ইনি?
আমি সব সময়ই জড়োসড়ো টাইপ। গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।
‘আপনি আমীরুল ইসলাম?’
‘হ মিয়া। তুমি কেঠা?’
‘আমার নাম ধ্রুব।’
‘ধ্রুব। কী করো মিয়া?’
‘চারুকলায় পড়ি।’
‘ও আর্টিস্ট। বাড়ি কই?’
‘সুনামগঞ্জ। সিলেট।’
‘বই কিনছো কেলা? বই পড়ো?’
‘পড়ি। আপনার গল্প কিশোর বাংলায় পড়ছি। অচিন জাদুকর উপন্যাস পড়ছি।’
‘কও কি মিয়া? আর কার কার লেখা পড়ছো?’
‘সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আর্কাদি গাইদার—।’
‘আর্কাদি গাইদারের লেখা পড়ছো তুমি? বাড়ি কই কইলা? সুনামগঞ্জ। আর্কাদি গাইদারের কোন বই তুমি পড়ছো?’
‘তিমুর ও তার দলবল’, ‘ইশকুল’, ‘একটি নীল পেয়ালার জন্য?’

‘সত্যজিৎ রায়ের কোন কোন বই পড়ছো?’
‘ফেলুদা, শঙ্কু, ফটিকচাঁদ, এক ডজন গপ্পো...।’
‘সুনীলের?’
‘সবুজ দ্বীপের রাজা।’
ভাইভা দিচ্ছি নাকি রে বাবা?
‘দেশি কার কার লেখা পড়ছো কও তো?’
‘শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, আলী ইমাম, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, বুলবন ওসমান। বুলবুন ওসমানের সব বই পড়ছি।’
‘হাবীবুর রহমানের লেখা পড়ো নাই?’
‘পড়ছি। ‘বনে বাদাড়ে’, ‘ল্যাজ দিয়ে চেনা’, ‘পুতুলের মিউজিয়াম।’
আমার জন্য সে খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। তখন তো আর বুঝতে পারি নাই—যাহা ঘটিবার তাহা ঘটিয়া গিয়াছে—আমার জীবনের অধিকাংশ সময় আমি কাটাব যে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তাদের একজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেছে এভাবে।
৪০ বছর কাটিয়ে দিলাম। ১৯৮৬-২০২৬। ছেদ পড়ে গেল? ১১ সেপ্টেম্বর?
আমীরুল ইসলাম। জন্ম : ৭ এপ্রিল ১৯৬৪। মৃত্যু : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। আমীরুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার এই ইহজনমে আর দেখা হবে না। আর কোন জনম আছে তবে?
হুমায়ূন স্যার নাই, কাজীদা নাই, বুলবুল ভাই নাই, আমীরুল ভাই নাই—আমার আর কে থাকল তবে? কিছু থাকল?
সমান্তরাল জগৎ তত্ত্ব নিয়ে গল্পগাছা প্রচুর লেখা হয়েছে এবং হবে। সেরকম কিছু যদি ঘটত। এই জগতে আজ ঘুমিয়ে পড়ে কাল সকালে আমি যদি আর কোনো জগতে ঘুম থেকে উঠতাম! কিন্তু আমার ঘুমই ধরছে না। আমি বসে আছি। আমীরুল ভাই আমার সঙ্গে বসে আছে। কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস, হার্টে অস্বস্তি, দৃষ্টিশক্তি গেছে।
‘আমীরুল ভাই, আপনি অন্ধ হয়ে গেলেন!’
‘তোমারে দেখতেছি মিয়া।’
আমীরুল ভাই! 

আরও পড়ুন

×