ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাঢ়বঙ্গের সৌন্দর্যে

রাঢ়বঙ্গের সৌন্দর্যে
×

মোজাফ্ফর হোসেন

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসূত্রে আমার দুটো অর্জনের কথা বলতে পারি। এক. বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের সার্টিফিকেট প্রাপ্তি। দুই. হাসান আজিজুল হকের সান্নিধ্য। যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করলে সনদ পেতাম। এখন আর সেটা আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। কিন্তু অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলে ব্যক্তি হাসান আজিজুল হককে পেতাম না। প্রথম বর্ষের শেষ দিকে ‘বাংলা গদ্যে দর্শনচর্চার সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ‘শাশ্বতিকী’ পত্রিকায় রিপ্রিন্ট করার জন্য অনুমতি নিতে হাসান আজিজুল হকের বিহাসের বাড়িতে যাই। তিনি যে বাংলা সাহিত্যের এত শক্তিমান গল্পকার, সেটা আজকের মতো করে তখন জানা ছিল না। স্যারের কাছে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁকে একটু একটু করে আবিষ্কার করি। বলে রাখি, ততদিনে নিজেও গল্পলেখা শুরু করেছি। ফলে আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হলেও আমার সাহিত্যের আসল দীক্ষাটা হয়েছে ক্লাসরুমের বাইরে বিহাসের সেই বাড়িতে। 
তিনি দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। কোনোদিন হয়তো কথা বলতেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দর্শন নিয়ে। তিনি কথাসাহিত্যিক ছিলেন। হয়তো বলতেন মানিক-বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর কিংবা ফকনার-হেমিংওয়ে-মার্কেসকে নিয়ে। তিনি দেশভাগের যে মর্মন্তুদ ইতিহাস, তাঁর প্রত্যক্ষ শিকার ছিলেন। ফলে বলতেন ইতিহাস ও বিচ্ছেদের গল্পটাও। বাংলাদেশে প্রগতিচর্চার স্বরূপ, মৌলবাদের আস্ফালন, অসুস্থ গণতন্ত্র– যাপিত বাস্তবতা হিসেবে সেসব কথাও আসত। সে সময় পড়তাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমি নিজেই তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। সে সময় আমার পাঠ্য ছিল চিন্তক হাসান আজিজুল হক। তাঁর বিপুল ও বহুমুখী প্রবন্ধসাহিত্যে ডুবে আছি। 
সেই ডুব থেকে আর ওঠা হয়নি। এক ডুব থেকে আরেক ডুবে হয়তো আবিষ্কার করেছি অন্য হাসানকে। তখন পড়েছি তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘মা-মেয়ের সংসার’ ও ‘বিধবাদের কথা’। গল্পের ভেতরে দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে আরেক জগৎ। অখণ্ড বঙ্গের প্রান্তিক মানুষ, দাঙ্গা, খরা, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, রাঢ়বঙ্গের প্রকৃতি ও বরেন্দ্রভূমির মানুষের কথা। হাসান আজিজুল হক নিজেই দেশভাগের প্রটাগনিস্ট। ফলে তাঁর ছোটগল্পে সেই বেদনার সুরটাও অনুধাবন করেছি। সবই তখন আমার জন্য অনুধাবনের বিষয়। একটু একটু করে যেন নিজের ভূমি, ভূখণ্ডের ইতিহাস, জলবায়ু ও লেখার কালিটা চিনে নিচ্ছি। তিনি মার্কসবাদী চেতনার লেখক ছিলেন। ফলে শ্রেণিচেতনার বিষয়টিও গোচরে আসছে, ভাবাচ্ছে। 
তাঁর ছোটগল্প পড়তে পড়তে গল্পের সামগ্রিক চেহারাটাও চেনার চেষ্টা করেছি। গল্পটি জাতির ইতিহাস ধারণ করবে নাকি ব্যক্তির হাহাকার? এমন জিজ্ঞাসাসূত্রে তিনি বলেছেন: ‘মানুষ গল্প দিয়েই তার পৃথিবী রচনা করেছে। গল্প দিয়েই তার পৃথিবী ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। বালির প্রাসাদের মতোই জীবনের গল্প তৈরি করেছে এবং ভেঙেছে। এর মধ্যে হঠাৎ শ-দুই আড়াইশো বছর আগে সাহিত্য-বৃক্ষের একটা তেজস্বী শাখা বেরিয়ে এলো। তার পাতাগুলি সুচিক্কণ, সবুজ; শাখা কমনীয় অথচ ভঙ্গুর নয়। আমরা এরকমভাবে লিখিত সাহিত্যের ভিতর থেকে এই যে শাখাটির উদ্গম লক্ষ করি তাকেই ছোটগল্প বলতে চেয়েছি। তাহলে প্রতিদিন সহস্র গল্প নির্মিত হচ্ছে যার কেউ অল্পপ্রাণ, কেউ ধাতবকঠিন, কেউ প্রাচীন শিলার মতো অক্ষয় ও মৃত্যুহীন। এই সামান্য দুশো-আড়াইশো বছরের মধ্যে এরকম যে শাখাটি জন্ম নিয়েছে তাকেই কি ছোটগল্প বলতে হবে?’ 
এরকম একটি প্রশ্ন দিয়ে তখন তিনি সাহিত্যের তুলনামূলক নবীন ফরম হিসেবে ছোটগল্পের যাত্রা ও গন্তব্যটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। 
নতুন লেখকদের লেখার ভূগোল কী হতে পারে, কোন বিষয়ে গল্প লিখতে পারেন একালের লেখকরা। এ সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘প্রত্যেক লেখকের উচিত তার নিজের বাস্তবতা নিয়ে লেখা, নিজের দেখা জগৎ নিয়ে লেখা। দেখো আমি যা লিখেছি সবই আমার দেখা বাস্তবতা। ঢাকায় আমি থাকিনি। যেভাবে ঢাকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ তাতে আমি খুব বড় করে নাগরিক সমস্যা নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারবো না। তাতে দুয়েকটি গল্প লেখা সম্ভব; আমি লিখেছি। যারা দীর্ঘদিন ঢাকায় আছেন, ঢাকার পরিবর্তনটা চোখের সামনে ঘটেছে, তাদের উচিত এই সময়ে নাগরিক সমস্যা নিয়ে লেখা। এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশের ভালো সাহিত্য মানেই গ্রামনির্ভর সাহিত্য। মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর তিন বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকারভাবে গ্রাম ও প্রান্তিক জীবন নিয়ে লিখেছেন। তারা অসম্ভব ভালো লিখেছেন, বুঝেছ? তারা তাদের সময় নিয়ে লিখেছেন বলেই সেটি দাঁড়িয়ে গেছে। আজকের লেখকদের দাঁড়াতে হলে তাদের সময় নিয়ে লিখতে হবে।’ 
পড়তে পড়তে বুঝেছি, হাসান আজিজুল হকের গল্পের প্রটাগনিস্ট হলো তাঁর ভূগোল, অ্যান্টাগনিস্ট হলো তাঁর সময়। সময়টা যেন বারবার তাঁকে বিদ্ধ করেছে। তাঁকে মানে তাঁর জেনারেশনকে। খালি বিচ্ছেদ আর বিভাজন। খালি সংগ্রাম আর হাহাকার। ‘মা মেয়ের সংসার’,  ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘খাঁচা’– কোথাও শান্তি নেই। সময় নিষ্ঠুর খেলা খেলে যাচ্ছে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে। একদিকে রাঢ়বঙ্গ, অন্যদিকে বরেন্দ্রভূমি। কোথাও জীবনের উচ্ছ্বাস নেই। 
কেন নেই সেটা বুঝতে অনেকখানি সহযোগিতা করেছে হাসান আজিজুল হকের স্মৃতিকথাসমগ্র। রাজশাহী থাকতেই পড়ে ফেলেছি আত্মস্মৃতি ও স্মৃতিকহনমূলক গ্রন্থ ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ (২০০৯) এবং ‘উঁকি দিয়ে দিগন্ত’ (২০১১)। ‘এই পুরাতন আখরগুলি’ ও ‘দুয়ার হতে দূরে’ তখনও প্রকাশিত হয়নি। আত্মস্মৃতিতে তিনি লিখেছেন, ‘হতচ্ছাড়া গাঁ আমাদের। দেখতে একটুও ভালো না। সব কিছুর টানাটানি, না কি আছে ছাই এই গাঁয়ে? ভালো কুলগাছ, পেয়ারাগাছ, জামগাছ নেই। একটু সবুজ খুঁজে পাওয়া যে কি মুশকিল এখানে? সব ধুলোয় ভরা। খাবার কি জোটে কপালে? আমরা তাই ভাত খাই আর ডাল খাই। ডাল খাই আর ভাত খাই।... আর কিছু পাওয়া যায় না। মোটা ভাত, মোটা খাওয়া একটা ফল পাই না যে চুষি, একটা ফুল পাই না যে তার রং দেখে খানিকটা সময় কাটাই, গন্ধ শুকি। এমন খালি আমাদের দেশ। আর আকাশ যেন স্কেলের গায়ে পেন্সিল ঘষা। ধুলো আর ধোয়া লেপা।’
রাঢ়বঙ্গের এমন সৌন্দর্যবঞ্চিত গাঁ আর হাহাকারের ভেতর বেড়ে ওঠা হাসান আজিজুল হক থিতু হয়েছেন বরেন্দ্রভূমির রূঢ় রুক্ষ ভূমিতে। এখানে তিনি মজুরদের পাশাপাশি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীদের জীবনসংগ্রাম দেখেছেন। তাঁর গল্প উপন্যাসে তিনি তাঁর এই যাপিত জীবনের বাইরে কিছু লেখেননি। ফলে ব্যক্তি হাসান আজিজুল হক এবং লেখক হাসান আজিজুল হক– দুটো সত্তা সাহিত্যের মৌল ভিত ও গন্তব্যটা চিনিয়ে দিয়েছে।   
তিনি শুধু নিজের লেখালেখি না, পাঠ থেকেও আমাকে এবং আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। হাসান আজিজুল হকের কাছ থেকে আমি বিশ্বসাহিত্যের চারজন লেখককে খুব ভালো করে চিনেছি। উইলিয়াস ফকনার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং হুয়ান রুলফো। তিনি তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি থেকে শুরু করে কাফকা, কামু এবং পামুকসহ আরও অনেকের কথা বলতেন। কিন্তু  উল্লিখিত চারজনকে আমি এখনও তাঁর লেন্স দিয়ে দেখি। তিনি নিজে হেমিংওয়ের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। একমাত্র হেমিংওয়ের গল্প তিনি অনুবাদ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। 

একবার আমাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হেমিংওয়ের ছোটগল্প নিয়ে তিনি বলেন: ‘হেমিংওয়ের ডায়লগ খুব শার্প বটে। ডায়লগের সংক্ষিপ্ততা, দৃঢ়তা, সেটিই আমার বেশি ভালো লাগে। আর মাঝে মধ্যে খুব ব্যঞ্জনাময় বাক্য থাকে। বর্ণনাগুলোও মারাত্মক। হেমিংওয়ে ইউরোপের বিনষ্টিটা দেখেছিলেন। তাঁর লেখার মধ্যেই আছে, তারা যখন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছেন, দেখা যাচ্ছে শহর ফাঁকা পড়ে আছে। বাড়ির দেয়ালগুলো সব ফুটো ফুটো হয়ে পড়ে আছে। শরতে গাছের পাতাগুলো ঝরছে। ঠান্ডায় মরা পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের বাস্তবতা আরও নিষ্ঠুরভাবে হেমিংওয়ের গল্পে আছে।’
হুয়ান রুলফোর নাম প্রথম শুনি হাসান আজিজুল হকের কাছ থেকে। একদিন রুলফো নিয়ে বললেন, “রুলফোর একটা গল্প আছে, ‘কোনো কুকুর ডাকে না’, খুবই সাংঘাতিক! ছেলেকে কাঁধে করে নিয়ে যায় বাবা, কাঁধে কেটে বসে যায়...। পুরো রাস্তায় তার সঙ্গে কথা বলে, আশ্বাস দেয়। শেষে তো মারায় যায়। তারপর ছেলেকে তো কাঁধ থেকে নামানো যায় না, পা দুটো শক্ত করে আটকে গেছে। তারপর নামিয়ে দেওয়ার পরে কুকুর আর ডাকে না! তারপর ‘ভোরবেলায়’ গল্পটা সাংঘাতিক। রুলফোর সব গল্পই ভালো। আর ‘পেদ্রো পারামো’ এতো ছোট, উপন্যাস বলা যায় কি জানি না। তবে দারুণ। বাড়ি যখন গেল, সব মরে ভূত হয়ে আছে। মৃতদের গ্রামে সে তার অতীত খুঁজছে। অসামান্য লেখা।”
হাসান আজিজুল হকের কাছ থেকে শোনার পরপরই রুলফো পড়া শুরু করি। অসামান্য অভিজ্ঞতা। মার্কেস পড়ার ক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হকের উসকানি আছে। তিনি লিখেছিলেন ‘মহাদেশের কথক: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। শেষ দিকে তিনি ইউরোপীয় সাহিত্যের চেয়ে আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার সাহিত্য গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করতেন। লিখেছেন: ‘যে কোনো শিল্পমাধ্যম একবার দাঁড়িয়ে গেলে সেটা একটা শরীরী অস্তিত্বের ব্যাপার হিসেবে দেখা দেয়, তাকে বিচারের তত্ত্বগুলোও প্রায় শারীরিকভাবেই জায়গাজুড়ে থাকে, কোনোমতেই নড়তে চায় না। এই জন্যে ইয়োরোপীয় উপন্যাস পড়া আমাদের প্রত্যাশা ও অভ্যাস যখন লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের কাছে ধাক্কা খায়, তখন এক ধরনের বিমূঢ়তায় পেয়ে বসে আমাদের। উপন্যাস বলে বহু কষ্টে ও যত্নে তাকে চিনতে হয়েছে, হোর্হে আমাদো বা আলেহে কার্পোন্তিয়েরের উপন্যাস তা থেকে এতই দূরে যে, এই নতুন রচনাকে উপন্যাস বলে মানতে গেলে উপন্যাস সম্পর্কে ধারণাটাই আগাগোড়া বদলে ফেলতে হয়। শিল্পবিপ্লবের ফলে সমাজে যে ব্যক্তির জন্ম হচ্ছিল, উনিশ শতকে সেই ব্যক্তি ধূসর ও লেপা-মোছা যৌথজীবন থেকে শক্ত পায়ে হেঁটে বসে আলাদা হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল, সেই আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি পশ্চিমী উপন্যাসে প্রচণ্ড দাপট দেখিয়েছে। একশো-দেড়শো বছর ধরে ইয়োরোপে গড়ে উঠেছে ব্যক্তিমুখ্য উপন্যাস। তাকে বিচার করার উপযুক্ত নন্দনতত্ত্বও ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে উঠেছে। আমাদের মহা ক্ষতি এই যে, গত দুশো বছর ধরে আমাদের কাছে মাত্রই ইয়োরোপের জানালা খোলা ছিল, ডালপালা ওই মুখেই বেড়েছে। আমেরিকানদের কথা আমি এখন ভাবছি না। লাতিন আমেরিকার উপন্যাস এ জন্যেই আমাদের কাছে এমন অসম্ভব নতুন লাগে।’   
জীবনকে দেখার নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাঁর কিশোর উপন্যাস ‘লাল ঘোড়া আমি’। উপন্যাসটা এত বেশি জীবনঘনিষ্ঠ যে কতটা কিশোর উপযোগী সে প্রশ্নও জেগেছে। হাসানের অন্য কোনো লেখায় শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ঘটেনি তা কিন্তু নয়। বিখ্যাত ‘শকুন’ গল্পটির কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। কয়েকটি কৌতূহলী কিশোরের একটি শকুন-কেন্দ্রিক সন্ধ্যা ও রাত্রি যাপনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় পুরা গল্প। শেষ অবধি সেখান থেকে যে সত্য বের হয়ে আসে, সে সত্যের নাগাল শিশু-কিশোররা পায় না। শেষতক, গল্পটি হয়ে ওঠে সিরিয়াস বড়োদের গল্প। ‘সারাদুপুর’ গল্পটি কাঁকন নামক নিঃসঙ্গ এক কিশোরের আত্মোপলব্ধির গল্প। কাঁকন তার চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হতে থাকে। সে অনুভব করে– ‘শীতে গাছের পাতাগুলোকে বিশ্রী দেখচ্ছে, পথের ওপর ছায়া ভয়ানক ঠান্ডা আর ঘাসের ভেতর রাস্তার রং দুধের মতো সাদা। ঘাস এখনও হলদে হয়নি– হবে হবে করছে। এই সব আধ-মরা ঘাসের ওপর শিশির আধাআধি শুকিয়েছে এতটা বেলা হয়েছে। রোদ কেবল এই সময়টায় একবার চড়াৎ করে উঠেছে, খেজুর গাছে ঘুঘু ডাকছে, অমনি মন কেমন করে উঠলো কাঁকনের। সব মরে যাচ্ছে গো– কাঁকন এই কথাটা শোনাবার মতো লোক খুঁজে পেল না।’ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠে তার হাহাকার, হতাশা ও জীবন সম্পর্কে কৌতূহল। এই গল্পগুলো শিশুকিশোররা পড়তে পারে। হাসান আজিজুল হক কিশোরদের কিশোর হিসেবে ভাবতে চাননি। ওই বয়সে তাঁর যে জীবন ছিল, সেই জীবনটা চেনাতে চেয়েছেন।
হাসান আজিজুল হক তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সময় ও সমাজকে দেখার দৃষ্টিটা তৈরি করে দিয়েছেন। সাহিত্য কি নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে তাঁর হৃদয়ের ক্ষতটা দেখাতে পারে? কতটা সমীচিন সেটা? লেখালেখির শুরুর দিকে এই জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি ছিল আমার জন্য। 

আরও পড়ুন

×