নজরুলের বহুরঙা সৃষ্টিজগৎ
এমদাদুল হক মিলটন
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা সংগীতে কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি বৈচিত্র্যময়, বিস্ময়কর ও অনন্য। সুরকার ও গীতিকার হিসেবে তিনি বাংলা গানের ভুবনকে দিয়েছেন বিপুল ও বহুমাত্রিক ঐশ্বর্য। প্রেম, প্রকৃতি, বিদ্রোহ, সাম্য, দেশাত্মবোধ, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় অনুভব—জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গ তাঁর গানের বাণী ও সুরে একাকার হয়েছে।
নতুন ১৭টি রাগ, ১১টি তাল-ছন্দ এবং বিচিত্র সুরের ব্যবহারে তিনি গানের বাণীকে করেছেন সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু নজরুলের গানের এই বিপুল ভান্ডারে প্রবেশ করতে গিয়ে সাধারণ পাঠক, শ্রোতা কিংবা শিক্ষার্থীর সামনে প্রায়ই একটি বড় বাধা তৈরি হয়—গানের বাণীর অন্তর্নিহিত অর্থ ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ অনুধাবনের জটিলতা। গানের ভাব ও অর্থ বুঝতে এই জায়গায় একটি সহায়ক গ্রন্থের প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রয়োজন পূরণের প্রয়াসে এ এফ এম হায়াতুল্লাহ ও শাহীনুর রেজার প্রণীত ‘নজরুল সঙ্গীতের বাণীসম্পদ’ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
নজরুলের গান শুধু সুরে গাওয়ার বিষয় নয়, এর বাণীর ভাবও উপলব্ধি করা জরুরি—গ্রন্থটির মূল বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট। একজন গায়ক গানের বাণীর অর্থ ও ভাব সঠিকভাবে বুঝতে পারলে কণ্ঠে তাঁর যথাযথ আবেগ প্রকাশ করতে পারেন। তখন শ্রোতাও গানের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু নজরুলের গানের শব্দভান্ডার এতই বৈচিত্র্যময় যে অনেক সময় তার তাৎপর্য অনুধাবনে সমস্যা হয়। বিশেষ করে শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভজনের পাশাপাশি হামদ, নাত, মারফতি, মুর্শিদি ও মর্সিয়ায় ব্যবহৃত ধর্মীয় ও পৌরাণিক শব্দের সঙ্গে পরিচিতি না থাকলে গানের পূর্ণ রসাস্বাদন কঠিন হতে পারে। ‘নজরুল সঙ্গীতের বাণীসম্পদ’ মূলত সেই বোঝাপড়ার পথ সহজ করতে চেয়েছে।
নজরুলের বিপুল সংগীতভান্ডার থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ গান এ বইয়ে স্থান পেয়েছে। নির্বাচিত গানগুলোর তালিকাতেই নজরুলের সৃষ্টির বৈচিত্র্য স্পষ্ট। ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’, ‘আমার গানের মালা আমি করব কারে দান’, ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ বেণুকার সুর’—এসব গানের পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতিনির্ভর গান ‘আবার শ্রাবণ এলো ফিরে তেমনি ময়ূর ডাকে’, ‘আয় বনফুল ডাকিছে মলয়’, ‘এলো ঐ বনান্তে পাগল বসন্ত’ ও ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে’।
প্রেম ও বিরহের অনুভূতিও রয়েছে নির্বাচনে। ‘এসো প্রিয়, মন রাঙায়ে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙায়ে’, ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এ নয়ন পানে’, ‘নদীর স্রোতে মালার কুসুম ভাসিয়ে দিলাম, প্রিয়’ ও ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না’ তার উদাহরণ। আবার ‘ঝিলের জলে কে ভাসাল নীল শালুকের ভেলা’, ‘রুম্ ঝুম্ রুম্ ঝুম্ কে বাজায় জল-ঝুমঝুমি’ কিংবা ‘সই, পলাশ-বনে রং ছড়াল কে’তে রয়েছে প্রকৃতি ও কল্পনার উপস্থিতি।
নজরুলের ধর্মীয় গানেও রয়েছে বিস্তৃত বৈচিত্র্য। ‘আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’, ‘কলমা শাহাদতে আছে খোদার জ্যোতি’, ‘খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী-বিশ্ব-দুলালী নবী নন্দিনী’, ‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি’ এবং ‘হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ’—ইসলামি ভাবধারার বিভিন্ন প্রকাশ এখানে রয়েছে।
অন্যদিকে ‘থির হয়ে তুই ব’স দেখি মা খানিক আমার আঁখির আগে’, ‘ওরে নীল যমুনার জল! বল্ রে মোরে বল্’, ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে আসলে প্রাতে পুষ্প-চোর’ ও ‘সঙ্ঘ শরণ তীর্থযাত্রা-পথে এসো মোরা যাই’ নজরুলের সনাতন ধর্মীয় ভাবনার পরিচয় বহন করে। ‘মোরা এক বৃত্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ গানটি তাঁর সাম্য ও সম্প্রীতির ভাবনাকে সামনে আনে। পাশাপাশি ‘জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত’ এবং ‘দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য, হে উদার নাথ’ নির্বাচনের বিষয়বৈচিত্র্যকে আরও বিস্তৃত করেছে। ২১৬ পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে নজরুলের স্বকণ্ঠে গাওয়া গানের কথা, নজরুলের গানের স্বরলিপিকার, নজরুলের নিজের স্বরলিপি করা গানের তালিকা, নজরুলের গানের ব্যবহৃত রাগ, কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী, নজরুল গ্রন্থপঞ্জির তালিকা। ‘নজরুল সঙ্গীতের বাণীসম্পদ’ গানের সুর শেখানোর চেয়ে গানের কথা ও ভাব বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব বহন করে। নজরুল সংগীতের শিক্ষার্থী, প্রশিক্ষণার্থী, শিক্ষক ও অনুরাগীদের জন্য তাই বইটি একটি প্রয়োজনীয় সহায়ক পাঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
- বিষয় :
- গল্প