ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্য লেখকের ভুবনে

আশ্চর্য খুঁজে ফেরা কবি এক

আশ্চর্য খুঁজে ফেরা কবি এক
×

প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল

ইরাজ আহমেদ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কবিতার ভিতরে আশ্চর্যকে খুঁজেছিলেন তিনি? হ্যাঁ, জীবনের সমস্ত অকাব্যিক উপাদানের ভিতরে, স্বাতীর সঙ্গে সকালবেলা রেস্তোরাঁর টেবিলে, পাগল কোনো গলির অন্তরালে, অসুখের ভিতরে স্থিতি হারানো জীবনের কাছে খুঁজেছিলেন সেই আশ্চর্যকে, যা এক জন্ম কবিদের উৎক্ষিপ্ত করে রাখে? চারদিকে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনের আশ্চর্যকে কবিতায় রূপান্তরিত করতে চেয়ে কবি আবুল হাসান সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ‘তুমি রুগ্ন ব্যথিত কুসুম’ কবিতায় লিখলেন, 
বাইরে তুমি বিকশিত হয়ো না কুসুম, রুগ্ন ব্যথিত কুসুম!
তার চেয়ে গভীর গভীরতর আড়ালে লুকিয়ে যাও!
কবিতাটি উল্টেপাল্টে পুনরায় পাঠ করতে গিয়ে মনে হলো, বৃষ্টি ভেজা প্যারিসের রাস্তায় কবি বোদল্যেরকে হেঁটে যেতে দেখছি। সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি, ফুরিয়ে আসা ষাটের দশকে গুলিস্তানের রেক্স রেস্তোরাঁর টেবিলে একা বসে আছেন আবুল হাসান। কাগজের ওপর একটু ঝুঁকে বসে আছে কবির রুগ্‌ণ আত্মা। কোনো এক দুপুরবেলা সেখানেও বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ছে পথে। প্যারিস থেকে ঢাকার দূরত্ব কত? দশ হাজার কিলোমিটারের বেশিই হয়তো হবে। তবু কোথায় গিয়ে যেন পৃথক বৃষ্টি এক হয়ে যায়, দুটি আত্মার ভিতরকার অসম্পূর্ণ যাতনা মিশে গিয়ে কবিতায় তুলে ধরে অন্য এক ব্যথিত বিস্তার। কিন্তু এখন যে বৃষ্টি নামছে, যে রোদ উঠছে; হেমন্তের দিকে যেতে চাইছে দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার সেখানে কোথায় আছেন কবি আবুল হাসান? তাঁকে কোথায় খুঁজব আমরা? রেক্স রেস্তোরাঁর ভিড়ে সন্ধ্যাবেলা? নাকি তাঁকে পাওয়া যাবে ঢাকা স্টেডিয়ামের খোলা গ্যালারিতে, যেখানে কবির আত্মার ভিতরে শীত রাত্রির শিশির জমে জমে পরিণত হচ্ছে ব্যথিত কুসুমে? উচ্ছন্নে যাওয়া এই শহরের পথে পথে তবু আজও বেঁচে থাকে আবুল হাসানের খোঁজ। তাঁর চারিত্রিক মগ্নতার ভিতরে, কবিতায় প্রেম অথবা নিঃসঙ্গতার তীব্র অনুভূতির অন্তর্লোকে কড়া নাড়লেই সামনে এসে দাঁড়ান সেই কবি, যার শরীর থেকে তখনও শস্যের আভা ঝরে পড়ছে, বিবর্ণ ঘাস ঝরে পড়ছে, ঝরে পড়ছে নির্যাতিত আলো। সেই আলো কেমন কবির আত্মার কাছে? আবুল হাসান কি আলো খুঁজেছিলেন তাঁর সংক্ষিপ্ত কবি জীবনে? আলোই তাহলে সেই আশ্চর্য, যার সন্ধান করেছেন তিনি!
তাই হয়তো মধ্য সত্তরে লিখলেন,
সব রৌদ্র ফিরে যায় না লুকিয়ে থাকে
                          পথের পাশে
কাচের মতো গোল গেলাসে 
                           জলের ছায়ায়।
যেসব রৌদ্র ফিরে যায় না তা-ই কি আবুল হাসানের কাছে নির্যাতিত আলো হয়ে ধরা দিয়েছিল একদিন? মনের মধ্যে উত্তরটা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি হাইকোর্টের সামনে একটা সবুজ রঙের বাসে উঠে যাচ্ছেন আবুল হাসান। চোখে-মুখে তাঁর অসুখের ম্লান ছায়া। মনে পড়ল ১৯৭৪ সালে তিনি যখন বাসে উঠছেন তারও ১০৭ বছর আগে মৃত্যুর শীতল অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিলেন ফরাসি কবি চার্লস বোদল্যের। বিদায় নেওয়ার আগে লিখেছিলেন,
এই জীবন এক হাসপাতাল, যেখানে প্রত্যেক রোগী বিছানা বদলাতে চায়...
আর আবুল হাসান? তিনি ‘পৃথক পালঙ্ক’ গ্রন্থে ‘মৃত্যু, হাসপাতালে হীরক জয়ন্তী’ কবিতায় লিখলেন,
সারারাত হীরক জয়ন্তী নয়, সারারাত শুধু সৃষ্টি হলো!
মৃত্যু আর আশার আতশজালা ভেদ করে 
অরেঞ্জ স্কোয়াশের মতো ফেনা ওঠা আশপাশে বৃক্ষদল: 
মনে হলো এক একটি সবুজভুক সিংহের বাহিনী!
খেতে আসে হাসপাতালের লম্বা নাকে ভরা অকসিজেন!
মৃত্যুর হীরক জয়ন্তী উদযাপনের ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছেন আবুল হাসান। নবাবপুরের কাছাকাছি এসে কবিতায় আকস্মিকের খেলার মতো ছিটকে নেমে পড়লেন পথে। এবার গন্তব্য কোথায়, রথখোলার মোড় অথবা সুইপার কলোনি? গুরুমূর্তির দোকানে মদের পাত্রের ঠোঁটে শেষ মদিরার চিহ্ন! তখন ১৯৭৫ সালের অক্টোবর চলছে। কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয়ে গেছে। তাহলে তার তো রোগশয্যা থেকে উঠে কোথাও যাবার কথা নয়! নভেম্বর শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর জীবনের হাত ছেড়ে দেবেন তিনি। পিজি হাসপাতালের বিছানায় গভীর মৃত্যুর নীল কুয়াশা তার জন্য অপেক্ষা করছে। বোদল্যেরকে সমুদ্রপারের টিউলিপ আর নীল ডালিয়ার দেশ তীব্র টানে বেঁধে ফেলেছিল। শেষবার এক অনন্ত পারাবার অতিক্রম করে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন সেই অসম্ভবের দেশে। আর মাত্র কুড়ি বছর বয়সের আগেই র‌্যাঁবো কবিতাকে চিরকালের মতো পরিত্যাগ করে সমুদ্রযাত্রায় যাওয়ার কথা লিখেছিলেন:
আমি ইউরোপ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। সমুদ্রের হাওয়া আমার ফুসফুসকে জ্বালিয়ে দিক।
আবুল হাসান তাদের অনেক বছর পর কবিতা লিখতে এসে উচ্চারণ করলেন, 
অসুখ আমার অমৃতের একগুচ্ছ অহংকার
আত্মার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ক্ষুধিত জানোয়ারের 
রোমশ বলশালী শরীরের দুটি সূর্যসমান রক্তচক্ষু!

তিনি কোথাও যাবেন না বলেই অসুখের কাছে ফিরে এসেছিলেন। সবুজ বিকল বাস তাঁকে নবাবপুর মোড় থেকে আবার ফিরিয়ে এনেছিল হাসপাতালে। হয়তো তখনও নিজস্ব মগ্ন অবগাহনের, আত্মানুসন্ধানের কিছুটা বাকি থেকে গিয়েছিল।

আর সেই হাসপাতালের ছাদের বিষণ্ন, মৃত্যুমুখর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন এই একবিংশ শতাব্দীতেও কবিতা লিখছেন বাংলা ভাষার কোনো কোনো কবি। 
পিজি হাসপাতালের সামনের রাস্তায় এখনও মানুষের কলরোল। বাজছে যানবাহনের উৎকট হর্ন। ট্র্যাফিক জটে স্থবির হয়ে আছে একটা শহর। মেট্রো স্টেশনের সেতুতে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের দিকে তাকাই। এখানেই একটি কেবিনে ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর শুয়ে ছিলেন আবুল হাসান। নাকে অক্সিজেনের নল ঢোকানো। চলে যাচ্ছেন কবি। চলে যেতে সমূহ ইচ্ছুক তিনি। কী ভাবছিলেন তখন আবুল হাসান? ভিক্টর য়্যুগো বোদল্যেরের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘‘আপনি কবিতায় সৃষ্টি করতে পেরেছেন এক নতুন শিহরণ’’। কবি আবুল হাসান কি শিহরণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলা কবিতায়? ষাটের দশকে বাংলা কবিতার নতুন জমিন তৈরি করেছিলেন তিনি। মাত্র তিনটি কবিতার বই, একটি কাব্যনাটক, কয়েকটি গল্প...তারপর গভীর যতিচিহ্ন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে নেমে আসে অমোঘ মৃত্যু। মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে রেখেছিলেন তিনি। র‌্যাঁবোর মতো ‘নরকে এক ঋতু’ লিখে না ফেললেও ‘ভ্রমণ যাত্রা’ কবিতায় লিখেছেন, 
আমি কাঠ কাটতে গিয়ে কেটে ফেলেছিলাম আমার জন্মের আঙুল/ঝর্ণার জলের কাছে গিয়ে মনে পড়েছিল শহরে পানির কষ্ট!
এখন কবিতার শব্দের এই ভিড় থেকে নিজেকে আড়াল করতে মনে হয় আবুল হাসানের কবিতাকে নিছক মৃত্যুচিন্তা অথবা বিষাদাক্রান্ত জীবনের গল্প বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এই একই কবিতার অন্য জায়গায় তিনি লিখছেন,
অন্ধকারে আমি আলোর বদলে খুঁজেছিলাম আকাশের উদাসীনতা
মধুর বদলে আমি মানুষের জন্য কিনতে চেয়েছিলাম মৌমাছির সংগঠনক্ষমতা। 
কবিতার গঠন, গূঢ়ার্থ পলকেই পাল্টে যায়। আবুল হাসানের কবিতার সমাজেতিহাস এবং ব্যক্তি রাজনৈতিক চেতনার ইতিহাস এখানে এসে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে। শব্দের ভিতরকার সত্য প্রকাশ করছে অন্য এক কবিকে– যেখানে গণমানুষের প্রাপ্তি এবং ব্যর্থতাকে তিনি কবিতার শরীরে গেঁথে দিচ্ছেন নিজের আত্মকেন্দ্রিক বেদনাকে গৌণ হিসেবে প্রদর্শনের জন্য। কবি-ব্যক্তির অবস্থানের বিশ্লেষণ তিনি এভাবেই নিজের কবিতায় ব্যবহার করেছেন বারংবার। মাঝে মাঝে মনে হয়, আবুল হাসানের কবিতা এক স্বপ্নের ভিতরে নিয়ে চলেছে আমাকে। যেখানে অভাবিতকে পলকেই বিশ্বাস করা যায়। মনে করা সম্ভব হয়, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পড়ে যাওয়ার সমস্ত ভয়ের অনুভূতিকে উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছি। মনে হয়, এই বিশ্বাসযোগ্যতা আর আশ্চর্য হওয়ার অনুভূতিকে আবুল হাসান দখল করে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর ভিতরে কবিতা ছিল, কোনো ভান ছিল না। মারাত্মকভাবে সত্যকে উচ্চারণ করেছেন, নিরুপায়ভাবে সৎ হয়ে থেকেছেন কবিতার সততার কাছে। পিজি হাসপাতালের করিডোর তখনও আমার অচেনা। লম্বা টানা পথ, সারি সারি কেবিন সেখানে। ভোরবেলা আবুল হাসান বুকে হাত রেখে বলছেন, ‘বুকে বড় কষ্ট হচ্ছে।’ তিনি তো লিখেই গেছেন,
বনভূমিকে বলো বনভূমি, অইখানে একটি মানুষ 
লম্বালম্বি শুয়ে আছে অসুস্থ মানুষ
হেমন্তে হলুদ পাতা যে রকম ঝরে যায়,
ও এখন সে রকম ঝরে যাবে, ওর চুল, ওর চোখ
ওর নখ অমল আঙুল সব ঝরে যাবে,
বনভূমিকে বলো, বনভূমি ওইখানে একটি মানুষ
লম্বালম্বি শুয়ে আছে, অসুস্থ মানুষ। 
নিজের অসুস্থতার পাশে আবুল হাসান তাঁর গোটা জীবনের কাব্য রচনায় ধরে রাখতে চেয়েছেন এক আশ্চর্যের বোধ, যা তাঁকে কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় আলাদা করে রেখেছে এখনও। খুব সহজ ভাষায় কবিতায় বলতে চেয়েছেন তাৎক্ষণিক উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা। তা-ই কবিতা হয়ে উঠেছে অজান্তেই। ম্যাজিকটা সেখানেই। আলুবাজার ওভারব্রিজের নিচে ঘোড়াদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অলৌকিক দৃশ্য বলে মনে হয় এখন। মনে হয়, আবুল হাসান হেঁটে গিয়েছিলেন এই পথে। তখনও কি ঘোড়াগুলো পা ঠুকছিল অস্থিরতার ঘোরে? আমরা অনেক কিছুই চোখে দেখতে পাই না। কিন্তু অনেক না-দেখাও আমাদের মনকে পরিশুদ্ধ করে চলে অজান্তে। ক্ষতের ওপর প্রলেপ লাগায়। অদৃশ্যে ঘটে চলে বলে সবকিছু বুঝতে পারি না। শুধু টের পাই, হেমন্ত আসছে। হেমন্তে ছড়ানো অস্পষ্ট আলোর মতো আবুল হাসান দাঁড়িয়ে আছেন এক হাজার দুয়ারি ঘর হয়ে; যেখানে অসংখ্য খোলা দরজা ভেদ করে বাংলা কবিতা ঢুকে পড়ছে, আবার বেরিয়েও যাচ্ছে অলক্ষ্যে। 

আরও পড়ুন

×