প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে
অলংকরণ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সে আর আসে না
নির্মলেন্দু গুণ
আদরকাতর দেহ কাঁপিতেছে
যেন ফলবতী বেতসের লতা।
কখন আসবে তার পরমপুরুষ
কখন সে আলিঙ্গনে
হবে সমর্পিতা।
দিন যায় রাত আসে, রাত যায়...,
শ্লথ হয়ে আসে কটিবন্ধ...
বকুলের মালা সুগন্ধ ছড়ায়
ভোরের বাতাসে...
সে আর আসে না।
১২ এপ্রিল ২০২৩
অনেকদিন পর, অনুভূতির মাকে নিয়ে লেখা
টোকন ঠাকুর
সব মেঘেই বৃষ্টি হয় না। সব কথাই গন্তব্যে পৌঁছায় না। সব ভাবই কবিতা হয়ে নামে না। বৃষ্টি না হওয়া মেঘগুলো কোথায় যায়, কার কাছে যায়? কথারাও জমে জমে মনোজাগতিক কুয়াশার আড়ালে দূরের পাহাড় হয়ে আছে? অলিখিত কবিতারা ছাপাখানায় যায় না, হাওয়ায় মিশে থাকে। তুমি শূন্যতা পড়তে পারো কিনা, তা আমার জানা নেই। যদিও, পুরো একটি পাণ্ডুলিপি আমি রেখে যাচ্ছি হাওয়ার ভিতরে। পাণ্ডুলিপির মধ্যে কত শব্দ, বাক্য, দাঁড়ি, কমা সেমিকোলন; পাণ্ডুলিপির মধ্যে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম-মনস্কাম ঘাপটি মেরে আছে। পাণ্ডুলিপির মধ্যে একটা ছোট্ট নদী, হয়তো নদীর পার ঘেঁষে রেললাইন। আমি বসে আছি, তুমি হয়তো দাঁড়িয়ে, শীতকাল সাক্ষী থাকল শুধু। আসল কথা হচ্ছে, আমি বলেও কেউ নেই, তুমি বলেও কেউ থাকে না! অযথায় মিথ্যে একটা আমির সামনে মিথ্যে একটা তুমি দাঁড়িয়ে থাকো, অনুভূতির মা। সব কবিতা কাগজে ছাপা হয় না। সব কবিতা পাঠকের স্পর্শ পায় না। মাঠের পরে মাঠ পেরিয়ে গল্প অনেক দূরে চলে যায়, সূর্যাস্তমাখা মেঘের মধ্যে তোমাকে দেখতে পাই, ছুতে পারি না... বাচ্চাকে আমি কীভাবে সামলে রাখব, অনুভূতির মা?
গীতিকাব্য
শিহাব সরকার
ঘড়ির কাঁটা খুলে পড়েছে কাল
আজ সৈকতে যাব, নিশ্চিত প্রবাল
আছে চারদিকে ছড়ানো–
খুঁজে যাব অন্ধকারে
আলোতে খুব দ্বন্দ্ব-কলহ বাড়ে।
মাথার ভিতরে অরণ্য-পাহাড়ের গীত
ছুটি মঞ্জুর, বোঝে না এখনি চূড়ান্ত শীত
নেমে যাবে; ছিন্ন করোনি টেলিফোন তার?
ছেঁড়ো জাল, ভুলে যাওয়া চাই বিজলি জঙ্ঘার
দূরে মাদলের শব্দ দিনরাত, যারা বোঝে
ছুটেছে শ্বেতপদ্মের খোঁজে।
ভালোবাসা ফিরে এলে পথগুলো থইথই
ঝালরে-নকশায় ভেসে যায় কত গন্দোলা
চারদিকে চর্যাকান্না, যুবক ভুলেছে হইচই
ভোর থেকে শুরু বজ্র-বিদ্যুতে মনদোলা।
ঘাট থেকে সিঁড়ি বেয়ে ঢলানির দরজা
ভিতরে ঘুঙুর, শিউলির ঘ্রাণ আসে
হীরা পান্না হবে, তুমি আজ ধরো যা
লন্ঠনে চিনিনি, ঘোমটা খসেছে প্রাতরাশে।
এটা খারাপ পাড়া, নেচে নেচে ক্লান্ত নারী।
শহরের ভিতরে গুপ্ত শহরে
যেতে চেয়েছি কতবার, ছেড়েছি বাড়ি
নৌকা বেয়ে যাই, ছাইপাঁশ গিলি নীল নহরে।
আশপাশে ঘোরে অশরীরী, তারা না করে
নর্তকীর ভিতরে সাঁতরাই অথই সাগরে।
তার কারণে
শামীম আজাদ
তোমারই কারণে রে মজুফ,
শরতের চিল আকাশের আসর ছেড়ে
আমারই চোখের ভেতর জলে চিকচিক করে।
চার্চ-চঞ্চুতে শীত ও শ্যাওলা জমলে,
কী এক বিষণ্ণতা আমার গা বেয়ে ওঠে
শরীরের গিঁটে গিঁটে, গরম স্যুপের বাটিতে
বিচ্ছেদের বেদনা নতুন হয়ে পুনরায় নড়েচড়ে
ঠান্ডা রাজাইয়ের মতো আমারেই জড়াইয়া ধরে।
বৃ্ষ্টিবালা দিনে আর রাত্রিমাখা রাতে
এ দু’খানা চোখের থানে
পুরোনো কত গল্প, আড্ডা, খোশ-কথা,
ঝালমুড়ি, রবীন্দ্রনাথ, কত ট্রেন চলে!
এ কিন্তু নতুন নয়
চূড়ান্ত গরমের কালেও, তুমি চলে গেলে
এইসব... কী সব... পরাবাস্তব কতকিছু পানে
চলে শামীমের নিজস্ব পর্দাঘেরা কেবিনে ও মনে।
তোমার কারণেই রে মাতাল
ক্লান্ত পরিশ্রান্ত এ দুটি চোখ, অবনত মুখ
এখনও পৃথিবীর সব শূন্যতা, পতন ও পরাজয় মানে।
পথভোলা মেঘের সঙ্গে সংলাপ
মাসুদ খান
বনের ভেতর বয়ে যায় মৃদু মেঘ
পথভোলা মেঘ, বয়স তোমার কত?
মেঘ বলে, আছি আটকে আটতিরিশে
বনে বনে ঘুরি ভবঘুরেদের মতো।
তুমি-আমি যেন সমানবয়সী হই–
মৌসুমি মেঘ, এটাই তোমার চাওয়া।
কিন্তু তুমি যে বয়সে অনেক ছোট
সম্ভব কি, সমানবয়সী হওয়া?
নভোযানে আমি উড়ব বছরখানেক
মেঘ তো বাড়বে মেঘের মতোই দ্রুত
আমার বয়স বাড়বে এক বছর
দুজনেই হবো সত্তরে উপনীত।
অনন্তকালে তুচ্ছ এ-দুটি কণা
আটকে রয়েছে বয়সের কারাগারে
মহাকাল, তুমি উদ্ধার করে দাও
এই কাল থেকে নাও গো কালান্তরে।
একটি বিচ্ছেদী গান
আফরোজা সোমা
ফুল তোলা রুমালেতে
লিখে রাখো নাম,
লিখে রাখো, ‘ভালোবাসা’।
শহরজুড়ে ভালোবাসা,
শহর ভরা প্রেম;
প্রাণে নিয়ে ঘুরছো তুমি
মধু মধু প্রেম!
ফুল তোলা রুমালেতে
দুইটি সবুজ পাতার মাঝে
একটি গোলাপ ফুল।
তার উপরে লেখা আছে:
‘গাছের পাতা নড়েচড়ে
তোমার কথা মনে পড়ে’!
তোমার কথা মনে পড়ে
শহর ভরা প্রেমে,
তোমার কথা মনে পড়ে
বিজনে ও ভিড়ে।
ফুল তোলা রুমালেতে
লেখা আছে আকুলতা:
‘ভুলো না আমায়’।
ভুলে তবু যায় পাখি,
রেডিওতে বাজে দূরে বিজয় বিচ্ছেদ:
‘বুকের ব্যথা মুখে বলা চলে না,
তুমি জানো না রে প্রিয়’...
অন্ধসময়ে
সেঁজুতি বড়ুয়া
সেরকমই সম্পর্কের সরু গলি পেরিয়ে পারস্পরিক ছায়া হারিয়ে আমরা যেন দিকভ্রান্ত দু’টো রাস্তা! ঘুমকাতর প্রেমিকস্বভাবী তুমি আর নিদ না নামা আমার রাতের বন্দোবস্তে দু’এক পঙক্তি শরত-জলের বৃষ্টিবিষাদ তখন শিউরে উঠেছিল!
কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়? কত প্রতিশ্রুতিহীন ভাঙা স্বপ্ন সামান্য আগে বা সামান্য পরে ঠিকঠাক জড়িয়ে না নিলে শুকনো বাতাস তছনছ করে! কে যেন রাতজাগা স্বরে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, ‘দেখো, আকাশে স্বপ্নে বিভোর চাঁদ! বিস্ময়কর অন্ধসময়ে যেন চিরকালের অগ্নুৎপাত!’
ভারী ট্যাটু আর অসুখী শরীরে তুমি তখন কী আশা করেছিলে? কলাবৃত্তে হাত ভার হয়ে এলে ঝরা পাতাটি আরও দূরে স্নানঘরে উড়ে যাবে? মনে পড়ে, নরম গালিচা দেখে তুমি বরাবরই হতে চেয়েছিলে, আগ্রাসী কাঠবেড়ালি! অথচ এরপরই, না-চেনার ভঙ্গিতে এমন তীব্র তাকালে, দূরের আকাশ যেন নীল বিচ্ছেদ-রেখা!
আমি অন্ধ ছিলাম বলে এইরকম অপেক্ষার ফুল, পাতা সমস্ত ভোগান্তি ফেলে নিশ্চিন্তে তোমার পাশাপাশি হাঁটতে চেয়েছিলাম, আর তুমি সেটিকে ভাবলে, স্নায়বিক বিকার! বিস্ফোরণে, আগুন জ্বালালে মহানন্দে…
নস্টালজিয়া
রাজু আলীম
শরীর আমার দুরন্ত এক ঝড়ের মতো উড়ছে
ভালোবাসার বৃষ্টিগুলো চোখের মধ্যে পুড়ছে।
স্যুপের বাটি উল্টে গেল! উড়ে এলো কাক
দুঃখের মধ্যে নেচে উঠল, প্রেমের মৌচাক।
মেঘহীন শান্ত আকাশ নিয়ে দুপুর এলো একা
অপেক্ষার সময় দীর্ঘ, নাই তোমার দেখা।
সকালগুলো দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা ডেকে আনে
সুখের হরিণ দুপুরবেলা, শুনছে না আর কানে।
জলের হাতি বুকের মধ্যে আনল এক খেলা
রাতের বাতাস পালিয়ে গেল জমল নাগ মেলা।
আগুন থেকে মানুষগুলো গিলছে কালো ধোঁয়া
প্রেমের হাটে ছেলে-খেলা, মেয়ের হাতে মোয়া।
প্রেম-অপ্রেম
নভেরা হোসেন
বহুদিন ধরে পরিচয়
একবার যখন মন খারাপ ছিল ভীষণ তখনি খুব শীল পড়লো
পাশের বাসার টিনের চাল সাদা বরফে ঢেকে গেলো
দেখাও হলো নীল মনিপুরী শাড়ি পরে
এর পর অনেক দিন কাটলো কথা যে বন্ধ ছিল তেমন নয়,
মনে পড়তো খুব গভীরভাবে কিন্তু দেখা-সাক্ষাৎ কদাচিৎ–
কেমন যেন একা হয়ে পড়লে, নিজের মধ্যে ডুবে থাকা
আবার দেখা, এবার দীর্ঘ সময় নিয়ে নিয়মিত কথা,
হয়তো ভাবছো ঝুম বৃষ্টিতে ভিজছো, একটু পরেই ঘন শীত
অসংখ্য কালো গোলাপ বিছানায় ছড়ানো
নদীতে জল ফুঁসছে–
কোথাও একটানা সানাই বেজে চলেছে–করুণ রাগ
বন্ধুরা সব বললো এবারেও তুমি ডুববে
কিন্তু সকাল হতেই ঝকঝকে রোদ, অর্নেলো ভেনোনি গেয়ে চলেছে
সব কিছু বদলে গেলো
আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, রাস্তায় সারি সারি লাশ
নৌকায় শত শত মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে,
হঠাৎই চোখের সামনে হাজার বছরের পুরানো সভ্যতা
মহেঞ্জোদারের ভূমিতে ছোট ছোট মাটির পাত্র, ভাঙা আয়নায় প্রতিচ্ছবি
আবার কথা বলতে শুরু করলে
এখান থেকে যাত্রা করে সোজা বিষখালী নদী
একটানা ঝিঁঝির শব্দ, আকাশে কালো ধোঁয়া
ওয়ারস শহরের ঘেটো থেকে চিৎকার ভেসে আসছে
মৃত্যু এখানে প্রাত্যহিকতা, সবুজ পাতায় রক্তের দাগ
তোমরা এখনো কথা বলে চলেছো,
অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে পরস্পরের মুখ
দূরে ট্রেন থামলো
ঐ যে দূরে গ্রাম দেখা যায়
অনুভব আহমেদ
মর্মমূলে ক্লান্ত নদীর সংঘাত,
বাজতে থাকে জলের সাথে আপন মনের টঙ্কার
ঐ দূরে যে গ্রাম দেখা যায় প্রেমের মতো সবুজ
সেও বুঝি ভিনদেশি সেই লোকের মতোই অবুঝ
বিয়ের বাজে বাদ্য কোথায়? নাচছে কারা ধামাইল?
বউটি বসে ভাবছে কেন সুদূরে পালাই?
সেই প্রেমিকের বুকের পাটা ভাবছি কত বড়
যার প্রেমিকা বউটি সেজে অন্য কারও হলো।
সারা বাড়ি রং মেখেছে বউটি উঠল চিতায়
ভিনদেশি লোকটা যখন নিরোর বাঁশি বাজায়
প্রেমিক তখন উচ্চগ্রামে কবিতাতে ফোঁপায়
ঐ যে দূরে গ্রাম দেখা যায় প্রেমের মতো সবুজ
একলা পেয়ে অন্ধকারে ভয় দেখাল ত্রিভুজ।
প্রাপক
নিজাম বিশ্বাস
প্রাপকের ঠিকানায় লিখলাম ডাকনাম,
যে নামে তোমাকে আমি, শুধু আমি ডাকি,
ডাকপিয়ন ভেবেছে তাই চিঠি বেওয়ারিশ–
আজকাল চিঠি আসে আকাশের ঠিকানায়,
তবু আমি পায়রার পায়ে বেঁধে দেই চিরকুট
পাখি ফিরে না, আফিমে নেশা কমে গেছে,
নাকি ভুল পায়রার ঝাঁকে বেঁধেছে সে নীড়!
এ বিরহ তোমাকে কি জানায়নি মেঘ–
যক্ষের এ পরান সখি তুমিহীনে আর নাহি রয়
গন্তব্য
মাহী ফ্লোরা
এই সকাল বুড়ো হয়ে গেছে। পৃথিবী বয়সী যার কপালের ভাঁজ। নুয়ে পড়ছে আলোর ভার, বেদনার।
কত কী প্রাপ্তি কত কী নেশা, ছুটতে থাকা রেসের উট, খাচ্ছে হোঁচট ছিঁড়ে যাচ্ছে অব্যবহৃত পথের জীর্ণ জাল, আরও বুড়ো হয়ে যাচ্ছে রোজ আমাদের সকাল। তুমি শুনছো না। আমি বলছি বলেই আমার অনুভূতি আজ ক্ষয়ে যাওয়া প্রবাল! তোমার সব ‘না’ বলা অপ্রকাশিত সমুদ্র তলদেশ! কোনো ডুবুরির হাতে সারাদিন রাত তুলে দিতে দিতে ধারাপাতে বিচ্ছেদ। কত কী বিভেদ। কোনো ফিরে আসা নেই। এই সকাল বুড়ো হচ্ছে রোজ। নিখুঁত আর সহজ হিসেবে তুমি চলে গেছো, একা আমার গন্তব্যই আজ নিখোঁজ।
- বিষয় :
- কবিতা