লেখকের সার্থকতা কোথায়
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আনোয়ারা সৈয়দ হক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার পেলাম। অবশ্য আমার প্রায় সত্তর বছরের সাহিত্যিক জীবন। সেই জীবনের শুরুতে আমি সাহিত্যে পুরস্কার পেয়ে বড় আশ্চর্য বোধ করেছিলাম। প্রথম বইটিই সেই পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটিয়েছিল। সেটি ছিল নিছক শিশুতোষ রচনা। একটি শিশুর ছেলেবেলার জীবনসংগ্রাম নিয়ে লেখা। বইটি পুরস্কার পাওয়ার বহুদিন পর একদিন একজন সাংবাদিক আমার ঢাকার ভাড়া বাসায় ইন্টারভিউ নিতে উপস্থিত। জানতে এসেছেন আমি বইটি অস্ট্রেলিয়ার একজন কথাসাহিত্যিকের বই পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছি কিনা। মনে আছে তাঁর কথা শুনে সেদিন আমার মুখের চোয়াল ঝুলে পড়েছিল। কোথায় অস্ট্রেলিয়া আর কোথায় সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ! মজার কথা হলো, আমার বহু পাঠক আছেন, যারা এখন বয়োবৃদ্ধ। তারা আমার এই একটি বই-ই তাদের ছেলেবেলায় পড়েছিলেন, এবং তখনই আমাকে ‘বড়’ লেখক বলে ঠাওরে উঠেছিলেন। কিন্তু এরপর আমার লেখা আর কোনো বই পড়ে উঠতে পারেননি! এখনও তাদের সঙ্গে দেখা হলে বলেন– “আহা, আপনার সেই বইখানা, আহা, এখনও আমার মনে আছে!”
তাতে কিছু আসে যায় না। একজন লেখকের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো তাঁর কিছু পাঠক থাকতে হবে। যারা তাঁকে চেনেন বই পড়ার মাধ্যমে। আমার বহু পাঠক আছেন যারা শুধু ‘দৈনিক জনকণ্ঠে’ মান্ধাতা আমলে বেরোনো কিছু হাবিজাবি কলাম পড়েছেন। ব্যস, সেখানেই আমার সাহিত্য পড়া তাদের সারা। তবু তারা আমাকে চেনেন এবং খুব বড় লেখক বলে মনে করেন! আমার একজন পাঠক আছেন, যিনি রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা হলেই চিৎকার করে বলেন, “পূর্ণিমায় নখের আঁচড়! আহা কী একখানা গল্প লিখেছেন আপা, একেবারে তাজ্জব হয়ে যাই!” ব্যস, ওইখানেই তাঁর আমার সাহিত্য পড়ার শেষ। এ নিয়ে চৌদ্দবার আমি তাঁর চিৎকার শুনেছি। আমি এতেই খুশি। একজন অন্ধ মানুষ তো হাতির সবকিছু একসঙ্গে দেখতে পায় না। তবু যেটুকু দেখে তাতেই বোধহয় হাতির তুষ্টি!
সাহিত্য পুরস্কার জীবনে অনেক পেয়েছি, হয়তো ভবিষ্যতেও পাব যদি বেঁচে থাকি। তবে এবারের পুরস্কার যে বইটির জন্য পেয়েছি, সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আমার প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা একটি ছোট উপন্যাস, নাম ‘সময় বহিয়া গেল’। বইটি লেখার সময় আমার মনোজগতে রক্তক্ষরণ হয়েছে। অতীত আমাকে বারংবার পীড়িত করেছে, তবু লিখেছি। কারণ এইসব অভিজ্ঞতা মানুষকে জীবন ভালোবাসতে শেখায়, মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শেখায়। মানুষের জীবন যে মহামূল্যবান একটি ঈশ্বরপ্রাপ্তি– এটি ভাবতে শেখায়।
হায়, সেই জীবন আমরা কীভাবেই-না প্রতিদিন অপচয় করে চলেছি!
ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার আমার এই বইটিকে যথাযথ মূল্যায়ন করেছে দেখে আমি খুশি। তবে না করলেও কিছু বলার থাকত না। কারণ লেখক যখন লেখেন, পুরস্কারের কথা মনে রেখে লেখেন না। আমার ধারণায় পৃথিবীর কোনো লেখকই পুরস্কারের কথা মনে রেখে কোনো সাহিত্য রচনা করেন না। সাহিত্য হচ্ছে একজন লেখকের মনন, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ঊর্মিল বহিঃপ্রকাশ, মনের তরঙ্গিত চিন্তাভাবনার ঢেউখেলানো অভিব্যক্তি, অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে তাকে মনের মতো করে গড়ে তোলা। যেসব লেখক বলেন, ‘আমি লিখি শুধু আমার নিজের জন্য’, তারা ঠিক বলেন না। আসলে আমরা লিখি অপরের জন্য। অপরের সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনা সম্পৃক্ত করার চেষ্টায়। এটি করতে না পারলে আমাদের ভেতরে বড় অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এর কারণ আমরা সামাজিক জীব। রবীন্দ্রনাথের বউঠান বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যেন কোনোদিন পত্রিকায় ছাপার জন্য লেখা না পাঠান। সব লেখা হবে শুধু বউঠান এবং রবির মধ্যে। তারা দুজনই শুধু হবেন লেখক, পাঠক, সমালোচক। কিন্তু কিশোর রবি তাঁর বউঠানের কথা শোনেননি। তিনি পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিলেন ছাপা হওয়ার জন্য। সেই বয়সেই রবি বুঝেছিলেন, পাঠকের হৃদয়ের সঙ্গে তাঁর লেখার বিনিময় হতে হবে। শুধু বউদির সঙ্গে ঘরের চার দেয়ালের হাতের লেখার খাতায় আবদ্ধ থাকলে চলবে না।
জীবনানন্দ দাশ কবি অভিধা থেকে খারিজ হওয়ার ভয়ে জীবনে প্রকাশ্যে গদ্য লিখতে চাননি। কিন্তু মনের আবেগ প্রকাশ করতে হলে গদ্য যে কতখানি প্রয়োজন সেই উপলব্ধি তাঁর জীবদ্দশায় হয়েছিল। এ কারণে তাঁর নিজ হাতে লেখা গদ্য রচনাগুলো ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখেছিলেন! কেন? এই আশায় যে, অন্তত তাঁর মৃত্যুর পর কোনোদিন এগুলো প্রকাশিত হবে, যদি তিনি এটা না চাইতেন, তাহলে তো পাণ্ডুলিপি তৈরিই করতেন না। এলোমেলো লিখে ছিঁড়ে ফেলে দিতেন। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ এবং বুদ্ধদেব বসু অসীম সাহসী পুরুষ যারা গদ্য ও পদ্য দু’হাতে লিখে গেছেন। গদ্য লেখার পর কবি থাকবেন কি থাকবেন না সেই তোয়াক্কা না করে।
ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তি আমাকে লেখক হিসেবে আত্মবিশ্বাসকে উজ্জীবিত করেছে, আমাকে আবার নতুন লেখার জন্য কলম ধরতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে আমি তাদের সবিশেষ ধন্যবাদ জানাই। কারণ নতুন লেখার মধ্য দিয়ে পাঠকের সঙ্গে কিছু অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়ার ভেতরেই একজন লেখকের জীবনের সার্থকতার অনেকখানি নির্ভর করে।
- বিষয় :
- গল্প