কালের যাত্রা ২০২৬
নতুন বছরের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা
অর্থনীতি
ফারুক মঈনউদ্দীন
ফারুক মঈনউদ্দীন
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
একজন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়ার জন্য এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন। যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার জন্য তিনি সবাইকে কেবল একটাই প্রশ্ন করছিলেন, ‘দুই আর দুই যোগ করলে কত হয়?’ প্রথম প্রার্থী ছিলেন এক সাংবাদিক। তাঁর জবাব ছিল ২২। দ্বিতীয় প্রার্থী ছিলেন এক প্রকৌশলী, তিনি অঙ্ক কষে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে এটা হবে ৩.৯৯৯ এবং ৪.০০১-এর মাঝামাঝি একটা সংখ্যা। পরের প্রার্থী ছিলেন এক আইনজীবী। তিনি তাঁর জবাবে বলেন, এটা রাজস্ব বোর্ডের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় প্রমাণিত হয়েছিল যে দুই আর দুইয়ে চার হয়। সর্বশেষ প্রার্থী ছিলেন একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তাঁকেও একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়। অ্যাকাউন্ট্যান্ট উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে আবার চেয়ারে এসে বসে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে গলার স্বর নামিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কত চান?’ বলা বাহুল্য, চাকরিটা তিনিই পেয়েছিলেন।
আগস্ট ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি আবিষ্কার করেছে যে বিগত বছরগুলোতে জনগণের সামনে অর্থনীতির ফাঁপানো অবস্থা তুলে ধরে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্য দেশের জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে বহু কারসাজি করা হয়েছিল। কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তথ্য-উপাত্তে কারসাজির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে এই পরিকল্পনামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান বিভ্রাট প্রকট হয়। এ সময় মূল্যস্ফীতিসহ সূচকের বহু তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও বাড়তে থাকে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য। বিশ্বব্যাংক বলছে, শুধু ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেই সাড়ে ৩ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো হয়েছিল। এ সময় মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার কমিয়ে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো হতো। যেমন ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছিল ৬.৩ শতাংশ, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর আগস্ট ২০২৪ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত হিসাবে সেই হার নেমে এসেছে ৫.৭৮ শতাংশে। পরিসংখ্যানের এই অবস্থাই ওপরের গল্পটাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজনৈতিক অর্থনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল দেশের পরিসংখ্যান বিভাগ, যা পরিচালিত হতো শীর্ষ পর্যায় থেকে। ফলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি দেখানো হতো, কিন্তু সামষ্টিক তথ্যের সঙ্গে যার কোনো মিল ছিল না। মূলত রাজনৈতিক কারণে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনে সরবরাহ করা হতো বিকৃত পরিসংখ্যান।
এসব কারণে বিগত সরকারের সময়ের অলীক পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বকে তাক লাগানো বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রগতিকে কোনো কোনো বিদেশি মিডিয়ায় বলা হতো ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ (আপাতবিরোধী হলেও সত্য)। এসব উপাত্তের কারসাজির কারণেই সরকারি হিসাবে প্রকাশ করা খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রকৃত হার কখনোই আমলে নেয়নি বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। সরকারের এ রকম দাবি সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যানগত কর্মদক্ষতা মানদণ্ড বিচারে বিশ্বব্যাংকের ২০১৪ সালের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশের স্কোর ছিল একশর মধ্যে ৮০। তারপর থেকে এই স্কোর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৮ সালে এটা দ্রুত কমে ৬২-তে নেমে যায়। ২০২০ সালে হয়ে যায় ৬০। সে সময় পদ্ধতিগত সূচকে আরও বড় পতনের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। এ সময় ২০১৪ সালের ৭০ স্কোর থেকে ২০২০ সালে অর্ধেকের বেশি কমে ৩০-এ নেমে আসে এই মান। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যগত পার্থক্য ক্রমাগত বেড়েই চলছিল। ২০১৮ সালে প্রবৃদ্ধির হারের পার্থক্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু মন্ত্রী দাবি করেন, এ হার হবে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে বড়জোর ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এডিবির পক্ষ থেকেও সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া মূল্যস্ফীতিসহ সব হিসাবে ওলটপালট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের ২০২৫ সাল কেটেছে অর্থনৈতিক, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায়। দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখা অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত হয় ২০২৪ সালের পর। তাই ২০২৫ ছিল সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টার একটি বছর। নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ, কঠোর কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার পর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা লক্ষণ খুব দূরবর্তী হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল বলার সময় আসেনি এখনও, যা ২০২৬ সালেও নিশ্চিত হবে না। তাই বহু বছর ধরে অর্থনীতি তথা আর্থিক খাতে সৃষ্ট হওয়া দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সারাতে ২০২৬-এর সরকারকে শুরু থেকেই পূর্ণোদ্যমে কাজে নামতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের ধারাবাহিকতা, কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অবস্থার উন্নয়নে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে প্রধান বাধা সরকারি সেবার মান, বিদ্যুৎ, গ্যাস তথা জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সেবার অপ্রতুলতা, দুর্নীতি এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর অদৃশ্য অসহযোগিতা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহযোগিতার আশ্বাসের ওপর ভর করে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রকৃত বিনিয়োগে নামার পর বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নিম্ন পর্যায়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার আসার পর সেসব প্রতিশ্রুতি বহাল থাকবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে বিদেশিদের। কারণ আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের নৈতিক অবস্থান খুব উঁচু মানের নয়। তা ছাড়া বিনিয়োগ করার পর সরকারি নীতি পরিবর্তন করলে দেশি-বিদেশি যে কোনো বিনিয়োগই বাধাগ্রস্ত হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট স্টেটমেন্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, বিদেশি সংস্থাগুলোর ওপর অন্যায্য করের বোঝা এবং অর্থায়নের সীমিত উৎস বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগসহ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রধান বাধা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও রয়ে গেছে বহু বাধা। এমনকি ২০২৪ সালে গঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কারের কাজ শুরু করলেও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণমূলক দৃশ্যপটের অধিকাংশই অপরিবর্তিত রয়েছে। এই পর্যবেক্ষণের কথা মাথায় রেখে ২০২৬ সালের সরকারকে প্রথম থেকেই কাজ করতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে বিদেশিদের অবিশ্বাস ও অনাস্থা দূর করা যায়। দেশে ক্যাশলেস লেনদেন চালু হওয়া নিয়ে বহুদিন ধরে অনেক উচ্চমার্গের কথাবার্তা চালু থাকলেও এ বিষয়ে কোনো সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বহু সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেও (ব্যাংকিং ছাড়া) অর্থনীতি বিষয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তার একটি হওয়া উচিত ছিল ক্যাশলেস লেনদেন চালু করার জন্য নগদ লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা (প্রাথমিকভাবে পাঁচ লক্ষ টাকা) বেঁধে দেওয়া। অর্থাৎ পাঁচ লাখ টাকার ওপর যে কোনো লেনদেন অবশ্যই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করতে হবে। এই ব্যবস্থা চালু করতে পারলে কালো টাকার দৌরাত্ম্য এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমে যাবে। ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। এই নতুন সরকারের কাছে ২০২৬ সালের মধ্যে এ রকম একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ আশা করা যায়। বিগত সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে নিয়ন্ত্রণহীন অবনতি শুরু হয়েছিল, তার কোনো পরিবর্তন পরের বছরের শেষেও পরিলক্ষিত হয়নি। ২০২৬ সালে এই অবস্থা চলমান থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেড় বছর ধরে দেখা যাচ্ছে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মহাসড়ক ও ফুটপাতে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই কমেনি, কেবল পরিবর্তন হয়েছে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। ফলে পণ্যমূল্য ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর হ্রাস পায়নি বাড়তি চাপ। নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি দায়িত্ব হবে এই বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া এবং দ্রুততম সময়ে দৃঢ় হাতে আইনশৃঙ্খলার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা, যাতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বাধাগ্রস্ত না হয় এবং সেবা ও পণ্যের উৎপাদন খরচ ও দাম সহনীয় মাত্রায় নেমে আসে।
২০২৬ সালের নতুন সরকারকে আর্থিক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। কর জিডিপি হার উন্নয়নের জন্য রাজস্ব খাতে সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে প্রথম থেকেই। দীর্ঘ দেড় দশকের অনিয়ম ও সুশাসন ঘাটতি সংশোধনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়, কারণ রোগকে দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখলে তার নিরাময়ও হয় সময়সাপেক্ষ। তাই ২০২৬ সালের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান আশা করে না কেউ, কিন্তু এই বছর নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এই অবশ্যকরণীয় কাজগুলো শুরু করবেন বলে আশা করা যায়, কারণ অতীত থেকেই শিক্ষা নিতে হবে নতুন সরকারকে।
লেখক : ব্যাংকার, সাহিত্যিক
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- কালের যাত্রা
- নতুন বছর
