ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অপ্রকাশিত চিঠি

মুর্তজা বশীরকে হামিদুর রাহমান

মুর্তজা বশীরকে হামিদুর রাহমান
×

অনুবাদ ও গ্রন্থনা: নিজাম বিশ্বাস

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬০ সালের ৮ ডিসেম্বর। করাচি গার্ডেন রোডের গভর্নমেন্ট হোস্টেলের এক ফ্ল্যাট থেকে লেখা এ চিঠি আমাদের সামনে উন্মুক্ত করে এক শিল্পীর অন্তর্জগৎ। যেখানে ব্যক্তিগত জীবন, শিল্পচর্চা ও জীবিকার টানাপোড়েন একসূত্রে গাঁথা। প্রেরক শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার ও প্রখ্যাত চিত্রকর হামিদুর রাহমান। প্রাপক তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহশিল্পী মুর্তজা বশীর। দুজনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ।

করাচিতে সদ্য-স্থাপিত জীবনের বৃত্তান্ত এখানে যেমন উঠে এসেছে, তেমনি এসেছে শিল্পীসত্তার সংগ্রাম ও সম্ভাবনার ইঙ্গিত। একটি মুরাল সম্পন্ন করা, নতুন কাজের সন্ধান, প্রতিকৃতি আঁকার ব্যস্ততা; সবকিছুর ভেতরেই ধরা পড়ে এক তরুণ শিল্পীর আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস। পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, বন্ধুর প্রতি নির্ভরতা এবং অর্থসংকটের সরল স্বীকারোক্তি চিঠিটিকে করে তুলেছে মানবিক।

চিঠিটি শুধু দুই বন্ধুর পারস্পরিক যোগাযোগ নয়; বরং এটি তৎকালীন পাকিস্তানি শিল্প-পরিবেশ, শিল্পীদের চলাফেরা এবং ঢাকায়-করাচির মধ্যে সৃজনশীল যোগাযোগের এক মূল্যবান দলিল। ব্যক্তিগত উচ্চারণের ভেতর দিয়ে এখানে ধরা পড়ে সময়ের স্পন্দন। এ শব্দসম্ভার এক শিল্পীজীবন নির্মাণ পর্বের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
মূল চিঠি ইংরেজিতে লেখা। এখানে তার অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

 

হামিদুর রাহমান
প্রযত্নে: সাঈদ আহমেদ
ফ্ল্যাট নং ২২, গভর্নমেন্ট হোস্টেল
গার্ডেন রোড
৮ ডিসেম্বর, ’৬০
করাচি

প্রিয় বশীর,
তোমার জন্য হঠাৎ মন আনচান করে উঠল। তুমি জানো, ঢাকায় আমি কী করেছি, আর এখন আমি করাচিতে আমার স্ত্রীর সঙ্গে। আমরা সাঈদকে১ একটি রুমে সরিয়ে দিয়ে  তার ফ্ল্যাটে উঠে গেছি। এখন বলো, ব্যাপারটা কেমন লাগছে?

আহা, আমি জানি তুমি নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে নানা খারাপ কিছু ভাবছ! দয়া করে বিষয়টি সহজভাবে নাও, বন্ধু। আমি তোমাকে আশ্বস্ত করতে পারি, কিছুই হারায়নি, কারণ হারানোর মতো কিছুই ছিল না!

আমার স্ত্রী খুবই সাধারণ এক বাঙালি। বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা তেমন নেই। আমি তার সঙ্গে ভালোই আছি।

গত ১১ নভেম্বর করাচিতে পৌঁছেছি। পুরোনো সম্পর্কগুলো ঠিকভাবে আবার গড়ে তুলতে কিছু সময় লাগবে। এর মধ্যে আমি একটি দেয়ালচিত্র (মুরাল) করেছি। ১২ ফুট × ৪ ফুট, আলি অটোমোবিল-এর জন্য, ন্যাশনাল ফেয়ারে।

এই মুহূর্তে একজন ইংরেজ ব্যক্তির সরাসরি প্রতিকৃতি আঁকছি। তিনি এখানে বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাকে বলে ‘বিগ শট’। আমি পুরোনো ১১ নম্বর বোনাস রোডে একটি ছোট ক্লাস নেওয়াও শুরু করেছি (সপ্তাহে দু’দিন)।

এয়ারপোর্টের রোটান্ডায় একটি মুরালের কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছি। এখন তুমি কেমন আছো, জানিও। 

সম্প্রতি তুমি তোমার কিছু কাজ বিক্রি করতে পেরেছ শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। দারুণ খবর! আমি নিশ্চিত, তোমার পরিপক্বতার সঙ্গে সঙ্গে তোমার আর্থিক অবস্থাও উন্নত হবে, এবং সে পথে তুমি খুব ভালোই এগোচ্ছো।

এখন কি তুমি কোনো ছবি আঁকছ? যদি আঁকো, তাহলে তোমার চিত্রভাবনা সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত জানিও।

এই ক’দিন কি তুমি খুব বেশি মদ খাচ্ছ? পারলে তোমার হুইস্কির ব্র্যান্ডটা একটু ভালো কিছুর দিকে বদলাও।

জাহাঙ্গীর২ কি এখন পিন্ডিতে আছে? এ সময়ে সে কি তোমার সঙ্গে ভালো ও বন্ধুসুলভ আচরণ করেছে? সে আমাকে বলেছিল, এখন থেকে সে তোমার প্রতি আর অমায়িক থাকবে না। সে কখন লাহোরে ফিরে আসবে, তা আমাকে জানিও। আমি তাকে আলাদা করে লিখতে চাই।

তুমি নিশ্চয়ই মি. কাইউমকে চেনো, পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের তথ্য সচিব। তিনি আমার P.T. নামের তেলচিত্রটি কিনেছেন (মনে আছে তো, হাতের মধ্যে দাড়িওয়ালা যে ছবিটি), যা জাতীয় প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল। এ বিষয়ে আমি তাকে ইতিমধ্যে তিনটি চিঠি লিখেছি। কিন্তু টাকার ব্যাপারে আমি বুঝতে পারছি না কেন তিনি আমাকে কোনো জবাব দিলেন না। তুমি কি (আমার প্রিয় পুরোনো বন্ধু বশীর) দয়া করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিস্টার কাইউমের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে বলবে যে আমার খুব জরুরিভাবে টাকার প্রয়োজন?

চিত্রটির দাম ৫০০ টাকা, এবং তাকে অনুরোধ করবে যেন অনুগ্রহ করে একটি টি.এম.ও. অবিলম্বে আমাদের হোস্টেলে পাঠায়। দয়া করে আমার জন্য এটা করো।
সাঈদ তার ছোটগল্পে খুব ভালো করছে। সে হয়তো তোমাকে লিখবে না, কিন্তু প্রতিদিন তোমাকে মনে করে।
তোমার জন্য আমার আন্তরিক শুভকামনা রইল। 

ইতি,
তোমার
হামিদ

পারিবারিক ছবিতে শিল্পী হামিদুর রাহমান (উপর থেকে সর্ব ডানে)। সংগ্রহ: নিজাম বিশ্বাস
টীকা 
১. সাঈদ আহমদ(১৯৩১–২০১০), নাট্যকার; হামিদুর রাহমানের অনুজ। 
২, সৈয়দ জাহাঙ্গীর (১৯৩৫–২০১৮), বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী।

আরও পড়ুন

×