ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক
×

আরিফুল ইসলাম রাফি 

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রাণ তিস্তা নদী; এক সময়ের প্রমত্তা আজ কেবল ভাঙনের প্রতীক। একদিকে পানিশূন্যতা, অন্যদিকে অব্যাহত ক্ষয়, মাঝখানে সরকারের প্রতিশ্রুতি আর অপেক্ষার অনন্ত ধারা। দশকের পর দশক ধরে তিস্তা যেন এক ‘অসাধ্য স্বপ্ন’। চুক্তি হবে, প্রকল্প হবে, উন্নয়ন হবে– এ কথাগুলো বারবার শোনা গেছে। বাস্তবে নদীর বুক শুকিয়ে গেছে; পারের মানুষ গৃহহীন হয়েছে, কৃষি হয়েছে নিঃশেষ।
আজ যখন তিস্তা মহাপরিকল্পনার দাবিতে উত্তরবঙ্গ উত্তাল তখন প্রশ্ন উঠছে– কেন এ প্রকল্প এখনও বাস্তবায়িত হয়নি? কাদের স্বার্থে এটি বারবার বিলম্বিত হচ্ছে? নদীপারের মানুষ কি শুধু প্রতিশ্রুতির শিকার হয়েই বেঁচে থাকবে?
১৯৯৮ সালে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মিত হওয়ার পর তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অংশে তিস্তায় পানিপ্রবাহ প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত ছেড়ে দেওয়া পানিতে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙন। এই অস্থিতিশীল প্রবাহ তিস্তাপারের মানুষকে একদিকে পানির অভাবে ফসলহীন করেছে, অন্যদিকে ভাঙনে করেছে জমিহীন। দুই বিপর্যয়ই এখন তাদের জীবনের অংশ।
তিস্তা পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আলোচনার ইতিহাস প্রায় চার দশকের পুরোনো। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যে স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছিল। চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়। তাঁর দাবি ছিল, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে তিস্তার পানি অপরিহার্য। তাই বাংলাদেশের অংশ বাড়ালে রাজ্যের কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পর থেকে তিস্তা চুক্তি বারবার আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে, কিন্তু কখনও বাস্তবায়নের স্তরে পৌঁছায়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, ‘রাজ্য সরকারের সম্মতি ছাড়া এটি সম্ভব নয়।’ অর্থাৎ একটি আন্তর্জাতিক নদী চুক্তি আটকে আছে প্রাদেশিক রাজনীতির জালে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাত লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা তৈরি হবে; কৃষিজ উৎপাদন বাড়বে উল্লেখযোগ্য হারে; নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে পাঁচ লাখ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পাবে; নদী হবে নৌপরিবহনের একটি নতুন করিডোর। যদি আমরা এই নদীকে রক্ষা করতে না পারি, তবে হারাব উত্তরবঙ্গের কৃষি, মানুষের ঘর, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি– শুধু উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়; মানবিক দায়বদ্ধতারও প্রতীক হিসেবে। যে নদীর তীরে আজ মানুষ মশাল জ্বালিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে, তাদের হাতে একদিন পুনরুজ্জীবনের আলো পৌঁছাক– এটাই জাতির প্রত্যাশা।

আরিফুল ইসলাম রাফি: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×