যোগাযোগ উন্নত হলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে
এ এইচ এম বজলুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কথাসাহিত্যিক ও যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত ইকরাম কবীরের রাষ্ট্র ও দল হিসেবে কমিউনিকেশনকে মূল্য দিন (সমকাল, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) লেখাটি আমাদের রাষ্ট্রচর্চার এমন এক জায়গায় আলো ফেলেছে, যেটা আমরা প্রায়ই ‘দ্বিতীয় সারির বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যাই। উন্নয়ন, বাজেট, আইন, প্রকল্প, নীতিমালা নিয়ে রাষ্ট্র যতটা দৃশ্যমান, মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথন ততটা দৃশ্যমান নয়। অথচ রাষ্ট্রকে প্রতিদিন টিকিয়ে রাখে কেবল সিদ্ধান্ত নয়; সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক তৈরির সবচেয়ে ধারাবাহিক হাতিয়ার হলো যোগাযোগ।
লেখকের মূল বক্তব্য তাই জোরালো– কমিউনিকেশন মানে শুধু তথ্য দেওয়া নয়। এটি আস্থা তৈরি, ভুল বোঝাবুঝি কমানো, নাগরিকের মনস্তত্ত্ব বোঝা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষকে অনুভব করানো– রাষ্ট্র তাকে শুনছে। এই ‘শুনছে’ শব্দটাই এখানে কেন্দ্রবিন্দু। কারণ মানুষ যখন নিজেকে শোনা হয়নি বলে মনে করে, তখন সঠিক বার্তাও সন্দেহের চোখে দেখে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লেখাটি সমস্যাকে কেবল ‘সরকার ব্যর্থ’ বলে দায় চাপিয়ে শেষ করেনি। বরং আমাদের সামাজিক অভ্যাসের কথা কথা বলেছে। আমরা বহুদিন ধরে কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি। প্রশ্নকে অনেকে এখনও বেয়াদবি মনে করে। ফলে রাষ্ট্রের ভাষাও অনেক সময় হয়ে ওঠে ওপর থেকে নিচে নামা ভাষা। নাগরিক সেখানে অংশীদার নয়; দর্শক। এই দূরত্ব থেকেই অবিশ্বাস, গুজব, ক্ষোভ জন্ম নেয়। এখানে লেখকের পর্যবেক্ষণ বাস্তব ও প্রয়োজনীয়।
তবে দৈনিক পত্রিকায় আলোচনার জন্য লেখাটিকে আরও ‘ব্যবহারযোগ্য’ করতে গেলে কিছু জায়গায় আরও স্পষ্ট কাঠামো ও সতর্কতার কথা যোগ করা যায়।
একমুখিতা সবসময় দোষ নয়। সমস্যা হলো একমুখী হয়ে থাকা। সংকটে মানুষ তথ্য চায়। তার চেয়েও বেশি চায় দায়িত্বশীল উপস্থিতি। সহজ ভাষা মানে শুধু সহজ শব্দ নয়, সহজ ফরম্যাটও। সামাজিক মাধ্যম সংলাপের জায়গা, একই সঙ্গে ভুল তথ্যেরও দ্রুত মহাসড়ক। রাজনৈতিক ভাষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু নাগরিককে শত্রু বানানো চলবে না। কৌশলগত যোগাযোগ দরকার, কিন্তু তা যেন প্রোপাগান্ডা না হয়। মানবিক যোগাযোগকে ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা হিসেবে ভাবতে হবে। স্টোরিটেলিং চাই, তবে ‘সৎ’ স্টোরিটেলিং।
তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দরকার সহজ ভাষা ও সহজ ফরম্যাটে। কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন তথ্য ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও দায়িত্ব নির্ধারণে। শেষ কথা হলো, ইকরাম কবীরের লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়– রাষ্ট্র কেবল আইন, বাজেট আর প্রকল্প দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সম্পর্ক, আস্থা, এবং প্রতিদিনের কথা বলা-শোনার সংস্কৃতি দিয়ে। যোগাযোগ উন্নত হলে শুধু ভুল বোঝাবুঝি কমবে না, গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো শোনা এবং উত্তর দেওয়া। উন্নয়ন তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন মানুষ অনুভব করে– রাষ্ট্র তার সঙ্গে কথা বলছে, তাকে শুনছে এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই এগোচ্ছে।
এ এইচ এম বজলুর রহমান: উন্নয়নকর্মী
- বিষয় :
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
