ব্রাজিলের আঙুর ফল জাবুতিকাবা

জাবুতিকাবা গাছ
জায়েদ ফরিদ
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:১০ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:১৬
আঙুর না হলেও ‘ব্রাজিলের আঙুর’ নামে এই ফল সমধিক পরিচিত, যার প্রচলিত আঞ্চলিক নাম জাবুতিকাবা। এর পর্তুগিজ আদি শব্দের অর্থ ‘ডালপালায় কালো ফল’। ব্রাজিলের আদিবাসী ‘টুপি’দের ভাষায় ‘জাবুতি’ অর্থ কচ্ছপ আর ‘কাবা’ মানে জায়গা, অর্থাৎ দুটো মিলে অর্থ দাঁড়াল ‘কচ্ছপের জায়গা’। ডাঙার কচ্ছপ ফল ফুল পাতা সবজি খায়। কচ্ছপদের একটি প্রিয় ফল গাছের নিচে পড়ে থাকা এই জাবুতিকাবা। খাদ্যের সন্ধানে বৃক্ষতলে তাদের নিত্য আনাগোনার কারণেই এই নাম তৈরি হয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ইত্যাদি দেশের আদিবাসী হলেও এখন বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই গাছ, এমনকি এশিয়াতেও।
এতকাল পরে এত সুন্দর একটি রসালো স্বাদু ফলের বিশ্ব পরিচয়ে বিলম্বের কিছু কারণ রয়েছে। এই গাছে দশ-পনেরো বছর পরে ফল ধরে, যদি তা বীজ থেকে জন্মে কিন্তু কলম করে নিলে তাতে তিন বছরেই ফল ধরতে পারে। এই কলম করার সহজ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ার কারণে হাল আমলে আমরা একে নানা দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। এখন এর নানা আবাদি জাত বা কাল্টিভার (Cultivar) তৈরি হয়েছে, যার ভেতর ৫ রকম বেশ নাম করা। সবচেয়ে বেশি কৃতকার্যতা পাওয়া গেছে ‘সাবারা’ কাল্টিভারে। এমনিতে সনাতন জাবুতিকাবা গাছে ফল ধরে বছরে দুবার কিন্তু ‘সাবারা’ আবাদিতে ফল ধরে বছরে ৪ বার। এর ফল আকারে একটু ছোটো, ২ সেন্টিমিটারের মতো ব্যস। তবে অন্যান্য ভ্যারাইটি থেকে খেতে মিষ্টি, খোসা শক্ত নয় এবং ফলনও প্রচুর। আগে ব্রাজিলের রাস্তার পাশে জাবুতিকাবার ফল বছরে দুবার মাত্র অল্প কয়েকদিনের জন্য বিক্রি হতো। এর তাজা ফল গাছ থেকে তোলার তিন দিন পর থেকেই ফারমেন্টেড হতে শুরু করে। এ-সব কারণে এতকাল ধরে সারা বিশ্বের মানুষ তেমন একটা দেখার সুযোগ পায়নি। এখন প্রায় সারা বছর ধরেই এই ফল পাওয়া যায়। ফল সংরক্ষণ পদ্ধতি, যাতায়াত ব্যবস্থা সবই উন্নত হওয়ার কারণে বর্তমানে কিছুটা রপ্তানিযোগ্য হয়েছে এই ফল।
জাবুতিকাবার বৈজ্ঞানিক নাম প্লিনিয়া কলিফ্লোরা–Plinia cauliflora। সরাসরি কাণ্ড থেকে ফুল-ফল জন্মে বলে এর দ্বিপদী নামের দ্বিতীয়াংশ কলিফ্লোরা, যার অর্থ কাণ্ড থেকে উৎপন্ন, কাণ্ডজ। অধিকাংশ আবাদি গাছ বেশি লম্বা হয় না, ১০-১৫ ফুটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে ব্রাজিলের কিছু পুরোনো গাছ হয়তো ৪০ ফুটও হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই গাছ একশ বছর আগে লাগানো হয়েছে, যা ইতোমধ্যে ওখানকার পরিবেশানুগ হয়ে পড়েছে।
জাবুতিকাবা গাছে প্রচুর ডালপালা হয়, বিশেষ করে কাল্টিভারগুলোতে। এর টকমিষ্টি স্বাদু ফল শুধু সরাসরি মুখে খাওয়ার জন্য নয়, এর থেকে তৈরি হয় জ্যাম-জেলি এবং কড়া স্বাদের কয়েক ধরনের মদ। ঔষধি গুণের জন্য এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় টনসিলের পীড়ায়, তারপরে পেটের অসুখে এবং হাঁপানি রোগে। ইদানীং ক্যান্সার গবেষণার জন্য এর ফলের রস পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। প্রকৃতিতে এত নিচু কাণ্ডে ফল হওয়ার পেছনে উদ্ভিদের বংশরক্ষার কোনো ইঙ্গিত আছে বলে মনে হয়। এর ফল হয়তো সহজে একটি প্রাণী খেতে পারবে, তখন ফলের বীজ পাকস্থলি বাহিত হয়ে চলে যাবে অনেক দূরে। দূরত্বের দিক বিবেচনা করলে বায়ু-বিসরণের চেয়ে এই পদ্ধতি অধিক ফলপ্রসূ। বালিমাটিতে এই গাছ বেশ ভালো জন্মাতে পারে, তাই সমুদ্রসৈকতের বালুর ভেতরেও একে লাগানো সম্ভব, যদিও অতিরিক্ত লবণাক্ততা এর ফলনের জন্যে ক্ষতিকর।
- বিষয় :
- আঙুর