হাজারো প্রাণীর আশ্রয়কেন্দ্র
কালুয়া’স হোমস
নিজের তৈরি আশ্রয়কেন্দ্র ‘কালুয়াস হোমস’-এ মোহাম্মদ নাঈম ইবনে ইসলাম আদি
মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:০১ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
যান্ত্রিক ঢাকা শহর। ইট-পাথরের এই কংক্রিটের জঙ্গলে যেখানে মানুষের জীবনেরই নিরাপত্তা নেই, সেখানে রাস্তার অবলা প্রাণীদের কথা কে ভাবে? প্রতিদিন কত শত কুকুর-বিড়াল গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে কিংবা মানুষের নিষ্ঠুরতায় নীরবে প্রাণ হারায়, তার কোনো হিসাব নেই। তবে এই নিষ্ঠুরতার শহরেই এমন মানুষও আছেন, যিনি নিজের সফল ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করেছেন পথের ধুলোমাখা এই প্রাণীদের জন্য। তিনি মোহাম্মদ নাঈম ইবনে ইসলাম আদি– ইন্টারনেট ও পশুপ্রেমীদের কাছে যিনি সমধিক পরিচিত ‘আদি দ্য গুরু’ নামে।
ছোটবেলা থেকে প্রাণীর প্রতি এক সহজাত মমতা কাজ করত আদির ভেতর। তবে জীবনের বাঁক বদলে যায় ২০১৭ সালে। শীতের এক রাতে এক ক্ষুধার্ত, শীতার্ত কালো বিড়ালছানাকে উদ্ধার করেন তিনি। নাম দেন ‘কালুয়া’। কালুয়া ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। ১১ মাসের মধ্যে সে ৬ কেজির একটি স্বাস্থ্যবান, আদুরে বিড়ালে পরিণত হয়। আদির ব্যাচেলর জীবনের একাকিত্বের একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে কালুয়া। বছর না ঘুরতেই ছাদ থেকে পড়ে মেরুদণ্ড ভেঙে যায় তার। মারা যায় কালুয়া। এই মৃত্যু আদির বুকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই শোক তাঁকে থামিয়ে দেয়নি; বরং জন্ম দেয় এক ইস্পাতকঠিন সংকল্পের–প্রিয় কালুয়ার স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করতেই ২০১৭ সালে জন্ম নেয় প্রাণীদের আশ্রয়কেন্দ্র–কালুয়া’স হোমস।
প্রথমদিকে আদির এই উদ্যোগ ছিল শুধু বিড়ালদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র। কিছুদিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আসে দুটি কুকুরছানা। আদি জানান, তাঁর নিজের হাতে উদ্ধার করা প্রথম কুকুরের নাম ‘পুটুস’। আদি খবর পান লালমাটিয়ার ১৮টি কুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সেখানে একটি কুকুরছানা অন্যদিকে থাকায় সে বেঁচে গেছে। আদি নিজেই পুটুসকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন আশ্রয়কেন্দ্রে। পুটুসকে উদ্ধারের পর থেকে একের পর এক উদ্ধার করা কুকুর-বিড়ালে ভরে ওঠে আশ্রয়কেন্দ্র। পুটুস বছর দুয়েক আগে মারা যায়। উদ্ধার করা প্রথম তিন কুকুরছানার মধ্যে শুধু পিন্টু এখনও বেঁচে আছে।

আশ্রয়কেন্দ্রের প্রতিটি প্রাণীর রয়েছে একেকটি গল্প। যেমন ‘সুন্দরী’ নামের বিড়ালটি। কেউ একজন সুন্দরীর একটি চোখ উপড়ে ফেলেছিল। উদ্ধার হওয়ার পর থেকে সুন্দরী ছিল আদির ছায়াসঙ্গী। কেন্দ্রে সাপ বা ইঁদুর ঢুকলে সুন্দরীই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুন্দরী মহারানী কুকুরদেরও শাসন করত।
আরেকটি বিড়ালের নাম ছিল ‘স্বর্ণ’। এটি ছিল দুটি বিদেশি জাতের মিক্স ব্রিড। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এই বিড়ালছানাকে এক ব্রিডার বিনা চিকিৎসায় আলাদা করে রেখেছিল। সেখান থেকে তাকে নিয়ে আসেন আদি। পরে ভাগ্যক্রমে স্বর্ণ বেঁচে যায়। এরপর থেকে বছর দুয়েক আগে মৃত্যুর আগপর্যন্ত আদির পাশেই ছিল স্বর্ণ। আদি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে বিড়ালদের সঙ্গেও কুকুরগুলোর অদ্ভুত এক সখ্য গড়ে উঠেছে। অনেক কুকুরছানা বিড়ালের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে।

ঢাকার বছিলার মামদপুরে প্রায় সাড়ে ১৭ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই আশ্রয়কেন্দ্রে এখন একসঙ্গে প্রায় ১৫০টি কুকুর এবং দুই শতাধিক বিড়াল থাকতে পারে। গত সাড়ে আট বছরে আদি ও তাঁর উদ্যোগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ হাজার প্রাণীকে নতুন জীবন দিয়েছে। শুধু কুকুর-বিড়াল নয়; খরগোশ, ঘোড়া, শিয়াল, সাপ, বানর, এমনকি বনবিড়ালও পরম মমতায় আশ্রয় পেয়েছে এখানে। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে খবর পেলেই আদি ছুটে যান। উদ্ধার, চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক উপায়ে বন্ধ্যাকরণ শেষে তাদের পুনরায় নিজেদের পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর নিত্যদিনের কাজ।
তবে এই যাত্রা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে গিয়ে আইটি সেক্টরের সফল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন আদি। একসময় যে আইটি ফার্ম থেকে মাসে প্রায় ১৭ লাখ টাকার টার্নওভার আসত, তা শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। শুধু আর্থিক নয়, সামাজিকভাবেও প্রচণ্ড নিগ্রহের শিকার হয়েছেন তিনি।
এত কিছুর পরও দমে যাননি আদি। বর্তমানে কালুয়া’স হোমস এক ভয়ানক অস্তিত্ব সংকটের মুখে। শেল্টারটি চালাতে প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় সাত লাখ টাকা। অথচ অনুদান আসে মাত্র দেড় লাখ টাকার মতো। বাকি বিশাল অঙ্কের ঘাটতি মেটাতে আদি তাঁর আতর ও আগরবাতির ছোট স্টার্টআপের আয়ের ৫০ শতাংশ ঢেলে দেন। তারপরও বর্তমানে তাঁর কাঁধে জমেছে প্রায় ২১ লাখ টাকার ঋণ। সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে, কারণ আগামী জুনে বর্তমান জায়গার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেল্টারটি অন্যত্র সরিয়ে নতুন করে অবকাঠামো গড়তে প্রয়োজন অন্তত ১৫ লাখ টাকা।
একটি সভ্য সমাজ কতটা মানবিক, তা পরিমাপ করা যায় অবলা প্রাণীদের প্রতি তাদের আচরণ দেখে। কালুয়ার মৃত্যু যে ভালোবাসার বীজ বুনেছিল, তা আজ হাজারো প্রাণীর বেঁচে থাকার কারণ। তবে আদির এই লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানটুকুও আজ মানবিকতারই ডাক। সহানুভূতি আর ভালোবাসা ছাড়া এই পৃথিবী কেবলই একটি কংক্রিটের ভাগাড়।
