ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

লেন্সের ফাঁকে বন্যপ্রাণের গল্প

লেন্সের ফাঁকে বন্যপ্রাণের গল্প
×

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে তোলা এই ছবিটি ‘ফোকাস অব সারভাইভাল’ প্রতিযোগিতায় সেরা দশে স্থান পেয়েছে; (ইনসেটে) সজীব কুমার সিংহ

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১৯:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যস্ততম কর্মজীবনের আড়ালে নীরবে বয়ে চলছিল সজীব কুমার সিংহের আরেকটি সমান্তরাল জীবন। ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন শহুরে কোলাহল শুরু হতে বাকি, তিনি ছুটে যেতেন গভীর অরণ্যে। পাখির কলকাকলি আর সরীসৃপের নিঃশব্দ চলাফেরা তাঁকে টানত এক অমোঘ আকর্ষণে। শৈশবের সেই শখই একসময় তাকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে। তবে তাঁর আকাঙ্ক্ষা আরও কিছুটা বেশি। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য এবং বন্যপ্রাণের অবিনশ্বর মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি করার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং সচেতনতা বাড়াতে নিজের অবদান রেখে যেতে চান সজীব কুমার সিংহ।

রাশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন টার্টেল’ প্রতিযোগিতায় ছবিটি ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হয়

সাপের লড়াই
কভিড-১৯ মহামারির সময় সজীবের জীবনে এক বড় মোড় আসে। তখন ঢাকা শহরের প্রকৃতি যেন এক নতুন রূপে জেগে ওঠে। ওই সময়েই জন্ম নেয় সজীবের জীবনের অন্যতম আলোচিত ছবিটি। রমনা কালীমন্দিরের পুকুরে নিয়মিত ডাহুকের ছবি তুলতে যেতেন। সেখানে তিনি খেয়াল করেন, ঢোঁড়া সাপগুলো পুকুরের তেলাপিয়া মাছ শিকার করছে। মাছ মুখে নিয়ে এক সাপ যখন কিনারে উঠে আসছে, তখন আরও কয়েকটি সাপ ছুটে এসে সেই শিকার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। দিনের পর দিন তিনি ওই দৃশ্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর একদিন হঠাৎ করেই ঘটে যায় সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।

একটি সাপ মুখে তেলাপিয়া নিয়ে উঠতেই আরেকটি সাপ এসে মাছটি কামড়ে ধরে। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় দুই সাপের তীব্র লড়াই ও টানাটানি। পুরো ঘটনাটি স্থায়ী ছিল মাত্র দুই-তিন সেকেন্ড! ছোট লেন্সের সীমাবদ্ধতার কারণে সজীবকে অনেক সামনে গিয়ে বসতে হয়েছিল। সাহস আর ধৈর্যই তাঁকে এনে দেয় জীবনের অন্যতম সেরা একটি ফ্রেম। ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, অনেকে ওয়াটারমার্ক মুছে নিজের নামে ছবিটি প্রচার করতে শুরু করে। ছবিটি শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যায়। রাশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন টার্টেল’ প্রতিযোগিতায় ছবিটি ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত ‘স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন’-এ স্থান করে নেয়।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে তোলা এই ছবিটি ‘ফোকাস অব সারভাইভাল’ প্রতিযোগিতায় সেরা দশে স্থান পেয়েছে

একটি কাঠঠোকরার গল্প
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এক বিকেলে তিনি দেখতে পান বিরল ‘ইয়েলো-নেপড গ্রেটার উডপেকার’ বা বড় হলদেঘাড় কাঠঠোকরা একটি শুকনো গাছে গর্ত তৈরি করছে। প্রথমে বুঝতে পারেননি পাখিটি আসলে বাসা বানাচ্ছে। পরে এক গাইড বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পারেন ঘটনাটি। ভোরে বাড়ি থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে প্রতিদিন পৌঁছে যেতেন বনের ওই নির্দিষ্ট স্থানে। প্রথম দিন দেখলেন পাখিটি শুধু গর্ত তৈরি করছে। দ্বিতীয় দিনও শুধুই অপেক্ষা। তৃতীয় দিনে তিনি খুঁজে পেলেন সেই চরম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। কাঠঠোকরাটি ঠোঁটে করে বাসার ভেতরের ময়লা বের করে আনছে, যেন অনাগত নতুন অতিথির জন্য পরম মমতায় ঘর পরিষ্কার করছে। সেই দৃশ্য তাঁকে ভেতর থেকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু একটি ছবি তুলছেন না, বরং একটি নতুন জীবনের প্রস্তুতির সাক্ষী হচ্ছেন। সজীবের কাছে এটি নিজের তোলা সবচেয়ে আবেগের ছবি।

ঢাকায় ফিরে ছবিটি এডিট করে আন্তর্জাতিক ‘ফোকাস অব সারভাইভাল’ প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে দেন। সজীব বলেন, ‘কোনো প্রত্যাশাই ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন পর আয়োজকদের মেইল আসে। ছবির আনএডিটেডের ফাইল চায়। পরে জানতে পারি, সারা বিশ্বের ২৫ হাজারের বেশি ছবির মধ্য থেকে এই ছবিটি সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছে! বিরল এবং প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এই কাঠঠোকরার জীবনচক্র অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরার কারণেই ছবিটি আন্তর্জাতিক বিচারকদের নজর কেড়েছিল।’ যদিও ব্যক্তিগত খরচের কারণে বিদেশে গিয়ে ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি, তবুও তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেন। এটিই ছিল তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

আরও পড়ুন

×