ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি

জীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি
×

১৪ আগস্ট ২০২৪, নিটোর ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ড ২, তখন সেখানে যে ৫৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন গুলিবিদ্ধ - ছবি:: মেহেদী হাসান

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ০০:৩৯ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ১৬:৪০

ইয়াশ। ছেলেটি চট্টগ্রামে আহত হয়েছিল। পায়ে গুলি লেগেছিল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় ভুলবশত তার পায়ে গজ রেখে দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের এই ত্রুটির ফলে ইয়াশের পুরো শরীর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়– মুখেরও প্যারালাইসিস হয়। অথচ তার পরিবার খুবই হতদরিদ্র।

আছে আরও দুটি শিশুর গল্প। একজনের বয়স ১৫, অন্যজনের ছয়-সাত বছর। ছেলে দুটির শরীরে এখনও রয়ে গেছে অসংখ্য ছররা গুলির প্যালেট। গরিব পরিবারের সন্তান তারা। নিয়মিত চিকিৎসাও পাচ্ছে না।

ঢাকায় একটি রেস্টুরেন্টের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছিলেন এক যুবক। কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন। গুলিটি তাঁর গলার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। পরিবারের কেউ জানতেও পারেননি বেশ কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত। তাঁর জীবন আর আগের মতো হয়নি।

মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার এক প্রাইভেটকার চালক। আন্দোলন মানে কী– তা তেমন বোঝেন না। ৫ আগস্ট দুপুরে কাজ থেকে ফেরার পথে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে দুই চোখ হারান তিনি।

এমন অসংখ্য মানুষ নাম না-জানা, ক্যামেরাবন্দি না হওয়া, ভাইরাল না হওয়া– যারা জীবন ও অঙ্গহানি ঘটিয়েছেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে।

নীরব কান্নার পাশে মানবিক দায়
নিম্নবিত্ত আহতদের অবস্থান ক্রমেই করুণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই হাসপাতালে পড়ে আছেন পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায়। এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কিছু মানবহিতৈষী। মানবিক দায়বদ্ধতা এবং আহতদের করুণ অবস্থা দেখে এ কাজে এগিয়ে আসেন তারা। আহতদের কাছে ছুটে গিয়ে, খুঁজে বের করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার। এমনই একজন কানিজ ফাতেমা মিথিলা। বর্তমানে তিনি ‘লড়াকু ২৪’-এর সংগঠক এবং ‘অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী।

তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমার জীবন সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। ইতিহাসের অংশ হওয়ার আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি অপরাধবোধও কুরে কুরে খাচ্ছিল আমাকে। আবু সাঈদের মতো বুক চিতিয়ে গুলি খাওয়ার সাহস আমার ছিল না। অথচ কত মানুষ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মিছিল করেছে! কত প্রাণ হারিয়ে গেছে, কত মানুষ আহত হয়েছে– তা সত্ত্বেও মিছিলের দৈর্ঘ্য দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। নিজেকে ছোট মনে হতে লাগল।’ এ অপরাধবোধই তাঁকে টেনে নেয় ৭ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ৪-৫টি ওয়ার্ডে আহতদের রাখা হয়, তিল ধারণের স্থান নেই। গুরুতর সব জখম নিয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় আহতরা পড়ে আছেন। এসব দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন– এই দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

পরিবার, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে নিয়ে ৯ আগস্ট থেকে রাজধানীর চারটি হাসপাতাল (শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান–নিটোর) ঘুরে ৯৭ জন আহতের তালিকা তৈরি করেন তারা। শুরু হয় চিকিৎসা সহায়তা ও অর্থ সংগ্রহের কাজ।

মিথিলা বলেন, ‘হাসপাতালে আমাদের মতো তখন আরও অনেক স্বেচ্ছাসেবী ছুটে যাচ্ছেন, কাজ করছেন। আমাদের ধারণা ছিল, সর্বোচ্চ এক থেকে দুই মাস হয়তো আমাদের এই কাজ করতে হতে পারে। এরপর আমরা যে যার স্বাভাবিক জীবনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ফিরে যাব। এক বছর হয়ে এলেও আমাদের আর আগের জীবনে ফেরা হয়নি। সেটি হয়তো আর কোনোদিন হবেও না।’

দিন দিন স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা কমতে কমতে চারজনে এসে দাঁড়ায়– সবাই নারী। তাদের একজন প্রবাসী, বাকিরা দেশের মাটিতে সরাসরি কাজ করছেন। সেপ্টেম্বরে তারা সিদ্ধান্ত নেন, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে সংবাদ সম্মেলন করবেন। লেখক ও নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদের নেতৃত্বে ‘দৃক’-এর একদল নারীর সহায়তায় ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত হয় ‘লড়াকু ২৪-এর সহযোদ্ধারা’-এর প্রথম সংবাদ সম্মেলন। সেখানে তারা পেশ করেন ১৫ দফা দাবি– শহীদ ও আহতদের তালিকা প্রকাশ, গুরুতর আহতদের বিদেশে চিকিৎসা, হাসপাতালগুলোয় মনিটরিং সেল গঠন ইত্যাদি। এসব দাবির কিছু কিছু বাস্তবায়িত হলেও বহু দাবি এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করে ‘লড়াকু ২৪’। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন’। কানিজ ফাতেমা মিথিলা এখন এই ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী। গত ছয় মাসে অন্তত ৪০ জন আহত ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসন করেছেন তারা। আরও ১০ জন নিয়ে প্রথম ধাপের ৫০ জন আহতের পুনর্বাসনের কাজ চলমান রয়েছে।

এক বছর পরও হাহাকার
আহতদের দুর্ভোগ এখনও কমেনি। চিকিৎসা সেবা নিয়ে সরকারের ব্যবস্থাপনার অভাব, শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য, সরকারি তালিকায় বিভ্রান্তি, অনুদান বণ্টনের অসাম্যসহ একাধিক ত্রুটির মুখে পড়েছেন আহতরা।

মিথিলা বলেন, ‘আহতদের অনেকেই এখনও তাদের প্রাপ্য অধিকার বুঝে পাননি। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অনুদান সবার কাছে পৌঁছায়নি। সরকার নির্ধারিত ক্যাটেগরি নিয়েও অসংখ্য অনিয়মে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার মাসিক ভাতা, পুনর্বাসন সহায়তা দিতে যাচ্ছে। তা এখনও শুরু হয়নি। এক বছর পেরিয়ে গেলেও আহতদের এখনও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে মূলধারার মিডিয়াও তাদের দুর্ভোগ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেনি।’

জুলাই আহতদের পুনর্বাসনে এখনও যে সংগ্রাম চলমান, তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিছু সাহসী মানুষ। ‘লড়াকু ২৪’ বা ‘অপরাজিত ২৪’-এর মতো সংগঠন এক নীরব বিদ্রোহের নাম– আবেগ আর দায়িত্ববোধের মোহনায় গড়ে ওঠা এক বিকল্প পরিসর।

এ প্রসঙ্গে কানিজ ফাতেমা মিথিলা বলেন, ‘এক বছর আগে যে কাজটি স্বেচ্ছাসেবীরা একটি সাময়িক কাজ মনে করে শুরু করেছিলেন, তারা আজ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছেন জুলাই আহত যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে। এটিই এখন আমাদের মূল কাজ। এ বাস্তবতা কেবল আমার একার নয়, জুলাই আহতদের জন্য কাজ করা সব স্বেচ্ছাসেবকের।’

আরও পড়ুন

×