হিরোশিমা স্মৃতির শকওয়েভ
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৭ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | ১৭:৫৪
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, জাপানের হিরোশিমা শহর তখনও ঘুম ভাঙাতে ব্যস্ত। ঠিক সকাল ৮টা ১৫ মিনিট, শান্ত সকালের রোদভেজা শহরটিকে চিরতরে বদলে দিল একটি তীব্র আলোকচ্ছটা। এনোলা গে নামের একটি মার্কিন বোমারু বিমানের ফেলে যাওয়া ‘লিটল বয়’ বোমাটি নিমেষে মুছে দেয় ৭০ হাজার মানুষের জীবন, ছারখার করে দেয় একটি জনপদ, বদলে দেয় বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র। গত জুন মাসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে স্টেফেন ওয়াকারের ‘শকওয়েভ: কাউন্টডাউন টু হিরোশিমা’ গ্রন্থ থেকে আহরিত একাংশ প্রকাশিত হয়; যা আমাদের নিয়ে যায় সেই দিনের একেবারে ভেতরে–বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার থেকে শুরু করে বোমা প্রস্তুতির মুহূর্ত, শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের তীব্রতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী বিবেকের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়া বিমান ক্রুদের অনুভবে।
গোপন প্রস্তুতি
১৯৪৫ সালের ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জাপানকে পোটসডাম ঘোষণায় চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন– হয় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করো, নতুবা ‘তাৎক্ষণিক ও সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ মুখোমুখি হও। তবে ওই ঘোষণায় ধ্বংসের মাধ্যমটি উল্লেখ করা হয়নি। জাপানও আত্মসমর্পণ করেনি। এর ৯ দিন পর ৪ আগস্ট জাপানের দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি টিনিয়ান দ্বীপে ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপ নামে পরিচিত একটি ইউনিটের ক্রুদের গোপন ব্রিফিংয়ের জন্য ডাকা হয়। ক্রুরাও জানতেন না তাদের চূড়ান্ত মিশন কেমন হবে। অথচ তারা প্রায় এক বছর ধরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। প্রথমে ইউটাহতে, পরে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি টিনিয়ানে। তারা বারবার অনুশীলনী বোমা ফেলতেন, আর খাড়া বাঁক নিয়ে উড়ে চলে যেতেন। ব্রিফিংয়ে ক্রু দলের প্রধান ২৯ বছর বয়সী পাইলট কর্নেল পল টিবেটস গোপন রহস্যের একাংশ উন্মোচন করে জানান, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তারা একটি জাপানি শহরকে ধ্বংস করবে একটিমাত্র বোমা দিয়ে–একটি বোমা, যা ইতিহাসে আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি; আর আশায় ছিল, এতে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, বোমাটি ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোতে পরীক্ষা করা হয়েছে। লক্ষ্যস্থল তিনটি শহরের যেকোনো একটি হতে পারে, এই ক্রমে– হিরোশিমা, কোকুরা (বর্তমানে কিতাকিউশু নামে পরিচিত), অথবা নাগাসাকি। কোন শহরে বোমা ফেলা হবে, তা নির্ধারণ করবে আবহাওয়া। ওয়াশিংটনের স্পষ্ট নির্দেশ– বোমা ফেলতে হলে আকাশ পরিষ্কার হতে হবে।
যেভাবে বোমা হামলা
এই বোমার ডাকনাম ছিল ‘লিটল বয়’। তাকে নিয়ে বিমান রওয়ানা হলো। ক্রুদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল–আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় বোমাটি সক্রিয় করা। কারণ বি-২৯ বিমানটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। যে কারণে তারা বোমা আগে সক্রিয় করার ঝুঁকি নিতে চাননি। উড়ন্ত অবস্থায় কাজটা ছিল জটিল ও বিপজ্জনক। একপর্যায়ে বোমার ব্রিচ প্লাগে চারটি কর্ডাইট (এক ধরনের বারুদ) ঢোকাতে হয়েছিল।
কোন শহরে ফেলা হবে বোমাটি? শিগগিরই সেই উত্তর আসে সামনে থাকা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ বিমানের কাছ থেকে। কোডবার্তায় তারা জানায়, প্রধান লক্ষ্যস্থলের ওপর আবহাওয়া পরিষ্কার। অর্থাৎ এটি হিরোশিমা।
ঠিক সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে বোমারু ফেরেবি বোমা ফেললেন। এর ১৫ সেকেন্ড তিনি একটি সুইচ টিপলেন। বিপদসংকেত বেজে উঠল। বোমাটি পড়তে পড়তে ৪৩ সেকেন্ড সময় নেয় বিস্ফোরণের জন্য। এনোলা গে হঠাৎ ডান দিকে তীক্ষ্ণভাবে বাঁক নেয়, যাতে শকওয়েভের ধাক্কা এড়ানো যায়। তখন সবাই গুনছিলেন সেকেন্ড, কেউ কেউ দম বন্ধ করে রেখেছিলেন। তারপর–একটি ঝলক। এক বিশাল ফ্ল্যাশ। পুরো প্লেনটি সাদা আলোয় প্লাবিত। কিছু সেকেন্ড পর একাধিক ধাক্কা।
কয়েক সেকেন্ডে মৃত্যুপুরী
বব ক্যারন চিৎকার করে সবাইকে সতর্ক করেন। জানালা দিয়ে ফন কার্ক দেখলেন শহরটি এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ভেতর যেন। সহ-উড়োজাহাজ দ্য গ্রেট আর্টিস্ট থেকে অ্যালবারি বলেন, ‘মেঘটার ভেতরে পৃথিবীর সব রং যেন মিশে ছিল।’
অস্কিলোস্কোপে ধরা পড়ে বিস্ফোরণের তীব্রতা–১৩ হাজার ৫০০ টন টিএনটির সমান। অ্যাগনিউ, যিনি গোপনে একটি ক্যামেরা এনেছিলেন, দৃশ্যধারণ শুরু করেন। অফিসিয়াল ক্যামেরা ব্যর্থ হলে, তাঁর গোপন ফুটেজই হয়ে ওঠে একমাত্র চাক্ষুষ প্রমাণ।
সহপাইলট বব ক্যারন লেখেন, ‘যদি আমি একশ বছরও বেঁচে থাকি, এই কয়েক মিনিট কোনোদিন ভুলতে পারব না।’ টিবেটস বলেন, ‘তোমরা মাত্রই ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেললে।’ ফিরে এসে এনোলা গে-র দল বীরোচিত সংবর্ধনা পায়। জেনারেলদের ভিড়, করতালি, মেডেল–তবুও অনেকের মনে তখন একটাই প্রশ্ন–আমরা এটা কী করলাম?
বিবেকের দহন ও অপরাধবোধ
এ অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই পরবর্তীকালে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ যুদ্ধ-পরবর্তী বছরগুলোয় বিষণ্নতার শিকার হন। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট শুমার্ড পরে স্বীকার করেছিলেন, পোড়া শিশুদের ছবি দেখে তাঁর অপরাধবোধ হয়েছিল। জেপসন একবার বলেছিলেন, ‘বোমাটি হয়তো শহর ধ্বংস না করেও প্রদর্শন করা যেত।’ এর তিন দিন পর নাগাসাকিতে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে আরেকটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। একইরকম ভয়াবহ পরিণতি হয়েছিল।
তিন সপ্তাহ পর টিবেটসের নেতৃত্বে একটি দল গোপনে যান জাপানে, নাগাসাকিতে। ফন কার্ক বলেন, ‘একটা মাত্র বোমা ফেলে এত ধ্বংস কীভাবে সম্ভব, তা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।’ অ্যালবারি জানান, মানুষজনকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল না। ধ্বংসস্তূপের মাঝে তিনি একটা দেয়ালে মানব ছায়ার মতো কিছু দেখতে পান। কেউ হয়তো হেঁটে যাচ্ছিলেন, আর তখনই বোমা বিস্ফোরিত হয়। শরীরের কোনো চিহ্ন ছিল না। হাজার হাজার ডিগ্রি তাপদাহে দেহটা বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল। পরে একটি হাসপাতালে তিনি দেখেছিলেন মৃত ও মৃতপ্রায় মানুষদের। তিনি আরও বলেন, ‘এরকম যেন আর কখনও না হয়।’
বিশ্ব যখন আবারও পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত, পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখানো চলছে চারদিকে, তখন ৮০ বছর পরেও হিরোশিমা বলে যায়–একটি বোমা কেবল একটি শহর ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে বিবেক, মানবতা, আর ভবিষ্যৎ।
